১
রাহেলা বেগম ইদানীং সবকিছুতে বিরক্ত হন। এই যেমন এখন বিরক্ত হয়ে আছেন স্বামী শফিক সাহেবের উপর। শফিক সাহেব সারাদিনে বহুবার তাকে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে এটা সেটা পাঠিয়ে বিরক্ত করেন।
ক্ষণে ক্ষণে এসব আসতে থাকায় তিনি কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না। স্বামীর পাঠানো বেশিরভাগ মেসেজে থাকে রান্নার রিলস, সন্তান পালন সংক্রান্ত আদেশ-উপদেশ এবং জান্নাতি স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত ভিডিও বা লেখা।
মাঝে মাঝে শফিক সাহেবকে তিনি ব্লক করে রাখেন। আবার সাংসারিক প্রয়োজনে তা উইথড্র করতে হয়।
যৌবনে তাঁরা দুজন মোটামুটি সুখী দম্পতি ছিলেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজেরা একত্রে খুব কম সময় কাটান। বরং সোশ্যাল মিডিয়া, পত্র-পত্রিকা, ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন অবসরে।
ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে গেছে, যার যার কাজে ব্যস্ত। রাহেলাও তাই নিজের মতো করে থাকেন। নিজের জীবনটা তার কাছে রস-কষ-হীন মনে হয়। কোনোকিছুতেই আজকাল তিনি আনন্দ পান না।
তবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে শফিক সাহেবের। তিনি অফিস থেকে ফেরার পর এক কাপ চা, মুড়ি-মাখা, বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস খেয়ে একা সময় কাটান। ফোন দেখেন, বই পড়েন অথবা শুয়ে থাকেন। এসময় যাই করেন না কেন বোঝা যায় তিনি মহানন্দে আছেন। রাহেলা বেগম রান্নাঘর থেকে তাঁর খুক খুক হাসির শব্দ শুনতে পান। শুনলে মনে হয় তিনি কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। রাহেলার বিরক্ত লাগে।
তিনি নিজে দিন দিন বোরিং হয়ে যাচ্ছেন তা বোঝেন। কিন্তু কিছু করার নেই।
রাহেলা বেগম তাই ঘরে গিয়ে স্বামীকে বলেন, মাছ-মাংস নেই, বাজার করতে হবে। শফিক সাহেব কিছুক্ষণের জন্য হাসিতে বিরতি দিয়ে বাজারে যান।
২
আপাতত স্বামীকে নিয়ে তার একটা পরিকল্পনা আছে। অবসরে সে বিষয়ে তিনি অনলাইনে খোঁজ খবর করছেন।
মোটামুটি নির্ভরযোগ্য একটা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছেন। এখন তাদের সাথে প্রাথমিক কথাবার্তা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে রাহেলা তাদের বলবেন, শফিক সাহেবের বাইরে থাকাকালীন সব ধরনের কার্যক্রম রিপোর্ট করতে।
দিনশেষে তাঁর হাসিখুশি থাকার কারণ তিনি জানতে চান।
দীর্ঘদিন প্রমোশন হয়নি এবং জুনিয়র এর অধীনে কাজ করছেন এমন একজন মানুষ যখন সারাক্ষণ হি হি হা হা করেন তখন বুঝতে হবে বড় কোন সমস্যা আছে। গোপনে কোথাও ফ্ল্যাট কিনে থাকতে পারেন তাকে না জানিয়ে। অবশ্য সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। শফিক সাহেবের দুর্নীতির ইতিহাস নেই।
আবার নারী-ঘটিত কিছুর সম্ভাবনা তিনি বাদ দিতে পারছেন না। এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এমনকি বাস্তবেও তিনি দেখেছেন বয়স্ক লোকেরা আজকাল অচেনা, অল্পচেনা তরুনীদের প্রতি আকৃষ্ট। থাক, রাহেলা বেগম বেশি চিন্তা করতে চান না। রিপোর্ট আসলেই বোঝা যাবে।
৩
অবশেষে রাহেলা বেগম পনের হাজার টাকা দিয়ে একমাসের জন্য গোয়েন্দা ভাড়া করেছেন। গোয়েন্দার কাজ হবে শফিক সাহেবের ওপর নজরদারি করা। এবং সপ্তাহ শেষে তার কাছে ডাকযোগে রিপোর্ট পাঠানো।
আজ রবিবার।
রাহেলা বেগম রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন। খাম খুলতেই চার-পাঁচটা ছবি ঘরের মেঝেতে পড়ে যায়। ছবিগুলো তুলে হাতে নেন তিনি। মনে মনে সচিত্র প্রতিবেদন দেখে খুশি হন। একটাতে দেখা যাচ্ছে বিশালদেহী শফিক সাহেব পার্কের বেঞ্চে বসে ছোট্ট হ্যান্ড ফ্যানের বাতাস খাচ্ছেন।
এরকম আরো দুই-তিনটা ছবি আছে। কোনোটাতে তিনি রাস্তায় বাদামওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে বাদাম খাচ্ছেন। আবার কোনোটাতে বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটছেন। সাথে ছাতা নেই।
একটা ছবিতে রাহেলা বেগমের চোখ আটকে যায়। দেখে মনে হচ্ছে ছবিটা টিএসসিতে তোলা। একদল অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েদের সাথে শফিক সাহেব হাসিমুখে কথা বলছেন।
ছবিগুলো বেডসাইড টেবিলে রেখে তিনি রিপোর্টটা খোলেন। রিপোর্টে বার-তারিখ সহ প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। একদম শেষের পাতায় কিছু ঘটনা হাইলাইট করা সংক্ষেপে।
পুরোটা তিনি পরে পড়বেন, আগে হাইলাইটসটা দেখতে চান। সেটা এরকম।
সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী
রবিবার
শফিক সাহেব অফিস থেকে ফেরার পথে বাদাম খেয়েছেন।
সোমবার
শফিক সাহেব ফেরার পথে পার্কে বেঞ্চে বসে থেকেছেন দেড় ঘণ্টা। এসময় তিনি হ্যান্ড-ফ্যানের বাতাস খেয়েছেন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। পরবর্তীতে দেখা গেছে তিনি আশেপাশের মানুষ ও ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছেন।
মঙ্গলবার
বাসা থেকে অফিস ও অফিস থেকে বাসা। এর বাইরে কোথাও যাননি।
বুধবার
বুধবার বৃষ্টির দিন ছিল। শফিক সাহেব শাটল বাসে ওঠেননি। কিছুদূর পর্যন্ত হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজে তিনি রিকশা নেন।
বৃহস্পতিবার
বৃহস্পতিবার শফিক সাহেব অফিস থেকে ফেরার পথে বাসার কাছে নেমে যান। এলাকার মামার দোকানে প্রচুর ঝাল দিয়ে ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ চটপটি খান। এবং নোংরা পানিতে ধোয়া কাপে চা খান।
শুক্রবার
সকালে কারওয়ান বাজারে যান। মাছ, মাংস, সবজি বেশি দামে কিনে আনেন। বিকেলে যান টিএসসি তে। পথে কয়েক দফা ফোনে কথা বলেন। তা থেকে মনে হয় মিটিং পূর্ব নির্ধারিত ছিল। টিএসসিতে অল্পবয়সী সাতজন ছেলে-মেয়ের সাথে মাঠে বসে কথা বলেন। তাদের মধ্যে দুইজন মেয়ে ও পাঁচজন ছেলে। এসময় তিনি হাসিখুশি ছিলেন। মেয়েদেরকেও তাঁর ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী মনে হয়।
শনিবার
এদিন সারাদিন বাসা থেকে বের হননি।
পাদটীকা: ছবির সাতজন ছেলে-মেয়ে এবং শফিক সাহেব একই ফেইসবুক গ্রুপের সদস্য। গ্রুপের নাম ‘ব্যর্থ প্রেমের গল্প ও কবিতা’। এখানে প্রত্যেকে অল্প-বিস্তর লেখালেখির সাথে জড়িত। গ্রুপে শফিক সাহেবের নিকনেইম ‘ছোট্ট পাখি’।
এপর্যন্ত পড়ে রাহেলা বেগম গ্রুপ ছবিটা হাতে নিয়ে আরেকবার ভালো করে দেখেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দুটো বিষয় ধরা পড়ে এবার।
এক, খুশিতে তার স্বামীর ফোলা ফোলা গাল দুটো চকচক করছে।
আর, দুই হলো মেয়ে দুটো খানিকটা লাস্যময়ী ভঙ্গিতে শফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে।
৪
গত একমাসের গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায় নি। তবে তার ভাড়াটে গোয়েন্দা পরের মাসের জন্য নতুন একটা সার্ভিসের অফার দিয়েছেন, ডিসকাউন্ট সহ।
মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় শফিক সাহেবের একমাসের সব ধরনের অনলাইন কার্যক্রমের খুঁটিনাটি তথ্যের রিপোর্ট পাবে সে।
রাহেলা বেগম বিরক্ত হয়ে না বলে দিয়েছেন। তার কাছে মনে হয় শফিক সাহেব তার চেয়েও বোরিং একজন মানুষ, যার জীবনে নিরাপদে ঘরে ফেরা ছাড়া আর কোন আনন্দ নেই।
৫
পরের মাসের প্রথম শনিবার। রাহেলা ধূসর-বাদামী জমিনে গাঢ় নীল পাড়ের সাম্বালপুরি ইক্কাত শাড়ি পরেছেন। চুলে খোঁপা করে একটা কাঁঠাল-চাঁপা ফুল গুঁজে দিয়েছেন। সাথে চোখে কাজল আর হালকা লিপস্টিক।
তার পরিকল্পনা হচ্ছে শফিক সাহেবকে অফিস ছুটির পর তুলে নেয়া। তারপর দুজনে মিলে কোথাও স্যুপ খেতে যাওয়া। স্যুপ খেলে খুশিতে শফিক সাহেবের ফোলা ফোলা গাল দুটো চকচক করে। দেখতে রাহেলা বেগমের খুব একটা খারাপ লাগে না।
পুনশ্চ: গল্প বিষয়ক পত্রিকা 'গল্পকার'-এর জুলাই-আগস্ট ২০২৬ সংখ্যায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে।