Article

আমিষের অধিকার রক্ষা হোক

October 4, 2026

34 views

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য প্রধান ও প্রথম চাহিদা। দেশ সহ সারা বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যের জোগান দেওয়াটা এখন বেশ চ্যালেঞ্জিং বিষয়।  এর পরও সুস্থ্য-সবল দেহ গঠনে এবং দেশ ও জাতিকে উন্নত করতে  প্রাণিজ আমিষের কোনো বিকল্প নেই। সাংবিধানিকভাবেও জনগণের পুষ্টিস্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পুষ্টিস্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের মূলে রয়েছে প্রোটিনের চাহিদা। যা দেশের নাগরিকের সুস্থতার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকেও উজ্জীবিত করে তুলতে সাহায্য করে। একজন সুস্থ্য মানুষই কেবল পারে শুদ্ধ-সুন্দর, সমৃদ্ধ ও সৃজনশীল চিন্তা করতে পারে।

বেনসন অ্যান্ড হেজেস বলেছেন, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও প্রোটিন সমৃদ্ধ সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। তাই ক্ষুধা ও অপুষ্টির ছায়াতলে থাকা বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এবারের প্রোটিন দিবসের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ-

“প্রতিদিন প্রোটিন খাই
শক্তি ও পুষ্টি পাই”।   

পুষ্টিবিদরা আমিষকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি প্রাণিজ আমিষ, অপরটি উদ্ভিজ্জ আমিষ। আমিষের উৎসকে দুই ভাগে ভাগ করা হলেও বাংলাদেশের মানুষ প্রাণিজ আমিষের চেয়ে অধিক পরিমাণে উদ্ভিজ্জ আমিষ গ্রহণ করে থাকে। এর অন্যতম কারণ উদ্ভিজ্জ আমিষের সহজলভ্যতা ও উদ্ভিজ্জ আমিষের ক্ষতিকর প্রভাব না থাকা।

দেহের কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা উদ্ভিদ হতে প্রাপ্ত সেসবের গুনগত মান অনেক উন্নত ও স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন।  কিন্তু উদ্ভিজ্জ আমিষের তুলনায় প্রাণিজ আমিষের পরিমাণ বেশি। খাবারযোগ্য যে কোন প্রাণীর মাংস থেকে আমিষ গ্রহণ করা যায়।

শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে প্রাণিজ প্রোটিনের অবদান অনস্বীকার্য। নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের প্রতুলতা রয়েছে বেশ। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে গরুর, ছাগলের, হাঁস-মুরগী ও মাছের খামার প্রত্যক্ষ করা যায়। পূর্বেই এর উপস্থিতি থাকলেও, তা শুধু নিজ পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য  ব্যবহৃত হত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিটি গ্রামে গড়ে উঠা “একটি বাড়ি, একটি খামার” প্রকল্প প্রতিটি গ্রামের দৃশ্য পাল্টে দিয়েছে। উক্ত প্রকল্প যেমনি ভাবে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে তেমনি ভাবে আর্থিক দিক থেকেও স্বাবলম্বী করে তুলছে সমানুপাতে।

এর পরও কিছু সংখ্যক জনগোষ্ঠীর অসচেতনতা ও শহুরে অতি ব্যয়ের জীবনযাপনে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। অনেকের মাঝে প্রাণিজ আমিষের উৎসের ব্যাপারে অজ্ঞতা এদিক থেকে একটি বড় সমস্যা।

অন্যদিকে উদ্ভিজ আমিষকে বলা হয় গরীবের আমিষ। প্রতি ১০০ গ্রাম উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে আমিষের পরিমান কিছুটা এরকমঃ ডালে- ১৮-২৪ গ্রাম; শিমের বীচি- ২৪ গ্রাম; মটরশুটিতে- ৭ গ্রাম; বাদাম ও তৈলবীজে-  (১৮–৪০) গ্রাম; চালে- (৭ -৯) গ্রাম; আটায়- ১৩ গ্রাম; ভুট্টায়- ১২ গ্রাম; ছোলায়- ১৭.১ গ্রাম। অন্যদিকে চালের প্রোটিনে মেথিয়োনিন বেশি।

ডালের প্রোটিনে লাইসিন বেশি। চাল ও ডাল মিশিয়ে খেলে দুটোই একত্রে পাওয়া যায় এবং খিচুড়ির গুনগত মান বাড়ে এবং প্রাণিজ প্রোটিনের সমান হয়। তেমনি আটা,  দুধ, চিনি, বা সুজি, দুধ, চিনি বা গুড় কিংবা শিমের বীচির গুড়ো, গুড়, গমের আটা বা ছাতু, গুড় আটা মিশিয়ে খেলে প্রোটিনের মান বৃদ্ধি পায়। প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে শিশু, গর্ভবতী মা ও স্তনদানকারী মায়েদের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন দু তিন প্রকার মিশিয়ে খাওয়া উচিত।

সঠিক ও নিরাপদ প্রোটিন আমাদের অধিকার। প্রোটিন সমভাবে বণ্টন করতে হবে। শরীরে পানির পরে সবচেয়ে দরকার প্রোটিন; কিন্তু আমরা অনেক সময় আন্তর্জাতিক মানের প্রোটিন সাপ্লাই দিতে পারছি না। প্রোটিনের অধিকার আদায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের খাদ্যের মাঝে বৈচিত্র্য আনতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবে...’। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের নানা পুষ্টি সমস্যা ছিল। মানুষের ওজন কম ছিল, স্বাস্থ্য কম ছিল, খর্বাকৃতির ছিল। এখন তা কমে এসেছে।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সাধারণত প্রাণিজ আমিষের দাম একটু জনগণের হাতের নাগালে থাকে, কিন্তু উদ্ভিজ্জ আমিষের দাম একটু বেশি হয়ে থাকে। সেদিক থেকে আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতে প্রেক্ষাপট খানিকটা ভিন্ন। এখানে প্রাণিজ আমিষের দাম এতোটাই বেশি যে দেশের জনগণের একাংশ উদ্ভিজ্জ আমিষের উপরেই পুরোপুরি নির্ভরশীল। কাজেই, হাতের নাগালের মধ্যে রেখে উদ্ভিজ্জ আমিষের উৎপাদন, সহজলভ্যতা, গুণগত মান উন্নয়ন, নির্ভরশীলতা ইত্যাদি তরান্বিত করার দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত।

প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস মাছ থেকে পাওয়া যায় ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগ প্রতিরোধসহ মেধা বিকাশ ও দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। এছাড়া মাছে রয়েছে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড ও ট্রাইগ্লিসারাইড; যা হাড় ও দাঁত গঠন, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমানোসহ হার্ট অ্যাটাক ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি  প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া গর্ভে থাকা শিশুর চোখ ও মস্তিষ্ক গঠনেও মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এ ঘোষিত ‘ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান’ অর্জনে টেকসই প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কোন বিকল্প নেই। নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পুরণে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ সংরক্ষণ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জাত উন্নয়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রচেষ্টা প্রশংসার যোগ্য।বর্তমানে দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন নিকট অতীতের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদনকে আরও সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে নীতি সহায়তা ও নিত্য নতুন প্রযুক্তি দিয়ে খামারিদের সহায়তা করতে পারলে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন বিশ্বে মাইলফলক তৈরি করতে সক্ষম।

প্রোটিন ছাড়া কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব কল্পনাতীত। প্রোটিনকে সকল প্রাণের প্রধান উপাদান হিসেবেও গণ্য করা হয়। আমাদের শরীরের প্রধান প্রধান কাজগুলো করার জন্য প্রোটিনের উপস্থিতির প্রয়োজন। আমাদের ত্বক, চুল, আঙুল, হাড়, রক্ত ইত্যাদির জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন। মূলত দেহের নানা অংশকে একত্রে ধরে রাখে প্রোটিন। আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্যও প্রোটিন প্রয়োজন। এছাড়া দেহের নানা অংশে পুষ্টি পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রোটিন দরকার।

সুষম খাদ্যের ছয়টি উপাদানের মধ্যে আমিষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। একটি মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় নূন্যতম ১০ শতাংশ আমিষ থাকা আবশ্যক। পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির মাথাপিছু দৈনিক ৫০ থেকে ৭০ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের খাদ্যের মাধ্যমে দেহের ক্ষয়পূরণ, বুদ্ধিসাধন, শক্তি উৎপাদনসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয়ে থাকে। প্রাণিজ এবং উদ্ভিজ্জ উভয় প্রকার প্রোটিনই আমাদের দেহের জন্য আবশ্যক।

বাংলাদেশে আমিষ খাবারের ভালো উৎস থাকা সত্ত্বেও গুণমান সম্পন্ন আমিষ গ্রহণের পরিমাণে ঘাটতি রয়েছে। অধিক জনগোষ্ঠীর এই দেশে আমিষ ঘাটতির নানাবিধ কারণ রয়েছে। আমিষ জাতীয় খাদ্যের দাম অধিক হওয়ার কারণে ব্যাপক জনগোষ্ঠী তাঁদের খাদ্য তালিকায় প্রোটিন জাতীয় খাদ্য অন্তর্ভূক্ত করতে পারেন না। ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে খাদ্যে আমিষ ঘাটতি থাকাটা অতি স্বাভাবিক একটি ঘটনা।  

অন্য সকল মানবাধিকারের মতো এবারের বিশ্ব প্রোটিন দিবসের মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শিশু-কিশোর-যুবক-মধ্যবয়স্ক-বৃদ্ধ  সকল বয়সের, সকল শ্রেণির মানুষের “রাইট টু প্রোটিন” অর্থাৎ প্রোটিন গ্রহণের অধিকার সংরক্ষিত হোক এবং বিশ্বব্যাপি একটি স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম গড়ে উঠুক। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। তাই সামনের এই প্রোটিন দিবসের অঙ্গিকারকে স্মরণ করে বলতে পারি-

“আমিষ যখন ঘরে ঘরে  

শিশুর বুদ্ধি সহজে বাড়ে”।

তথ্য সূত্রঃ

১. প্রাণিজ আমিষ টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত জীবন গঠন, ডা: শেখ আজিজুর রহমান ও ফয়সাল মেহেদী হাসান, কৃষি তথ্য সার্ভিস।

২. আমিষ, উইকিপিডিয়া।
৩. উদ্ভিজ আমিষ : প্রাণিজ মাংসের বিকল্প ব্যবহার, মোঃ আখতারুজ্জামান, কৃষি তথ্য সার্ভিস।
৪. উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ খাবার থেকে প্রোটিন, বিডি নিউজ ২৪ ডট কম।
৫. সুস্থ-সবল জাতি গঠনে পুষ্টি, মো. সামছুল আলম, বনিক বার্তা।
৬. প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই সমন্বিত উদ্যোগ, প্রোটিন সবার অধিকার' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক, দৈনিক সমকাল।

 #হাবিব_রহমান

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Borhan mahmud 3 days ago

    ভালো লিখেছেন। রিসোর্সফুল টপিক।

    • Habib Rahman 3 days ago

      ধন্যবাদ আপনাকে।