দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রাজীব।
তিন বছর পর এই প্রথম।
তাকে দেখে মীরার মনে হলো—এই মানুষটাকে সে কখনো ভুলে যায়নি।
ভুলতে চায়নি।
রাজীবের চুল এখন একটু বেশি বড়, মুখে দাড়ি গজিয়েছে।
কিন্তু চোখের ভাষাটা সেই একই।
ভেজা, ক্লান্ত, আর ভেতরে জমে থাকা কিছু না-বলা কথা।
মীরা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু গলায় আটকে গেল শব্দগুলো।
রাজীব নিজেই কথা বলল, ধীরে।
— "তুই কি একটু কথা বলবি?"
মীরা হালকা কেঁপে উঠল।
তারপর দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়াল।
রাজীব ঢুকল চুপচাপ।
ভেজা ছাতাটা নামিয়ে কোণে রাখল।
তার চোখ বারান্দার দিকেই ছুটল, যেখানে রাখা সেই পুরনো চেয়ারটা, আর একটা কাপ — বাষ্পহীন, ঠান্ডা চা।
রাজীব হাত বাড়িয়ে কাপটা ধরল।
— "এই চা কি এখনো শুধু আমার জন্যই বানাস?"
সুরটা মোলায়েম, অপরাধবোধে ভারী।
মীরা এবার চোখ তুলে তাকাল।
— "জানিস, আমি অনেক কিছুর জন্য তোকে দোষ দিইনি।
কিন্তু শুধু একটা কথার জন্য—তুই না বলেছিলি, 'তুই চাইলে থেকে যাব?'
আমি চাইনি বলেই তুই চলে গেছিস?"
রাজীব নিচু গলায় বলল,
— "আমি জানতাম তুই মুখে বলবি না… কিন্তু মন চাইত।
আর আমি… আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। ভেবেছিলাম তোর থেকে দূরে গিয়েই তোর জন্য ভালো কিছু করতে পারব।
কিন্তু দূরে গিয়ে বুঝলাম — তোর না থাকলে কিছুই আর ভালো লাগে না।"
মীরা হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসি ছিল কাঁটার মতো।
— "তুই ভাবছিলি আমার জন্য বিদেশে গিয়েছিস…
আর আমি ভাবছিলাম, তুই আমার থেকে পালিয়েছিস।
তোর চলে যাওয়া একটা দুপুর নিয়ে গেছে, রাজীব।
আজ আবার একটা দুপুর নিয়ে ফিরেছিস।
তবে কি এবার থাকবি?"
রাজীব তার দিকে এগিয়ে এলো, কাঁপা গলায় বলল,
— "তুই যদি এখনও চাস…"
মীরা কিছু বলল না।
কিন্তু ধীরে হাত বাড়িয়ে আবার কাপটা নিয়ে মুখে তুলল।
চা ঠান্ডা ছিল, কিন্তু এক চুমুকে ভেতরটা যেন উষ্ণ হয়ে উঠল।
ওরা দুজন চুপচাপ বসে থাকল।
বৃষ্টি পড়ছিল এখনো, নরম স্বরে।
যেন সেই বৃষ্টিও জানে — তারা একে অপরের অপেক্ষায় ছিল।
(চলবে...)