এক দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব, অন্য দিকে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জামায়াতে ইসলামী। এই দুয়ের মাঝখানে এখন একটি নাম—মুফতি আব্দুল মালেক।
সম্প্রতি এক ধর্মীয় আলোচনার বয়ানে তিনি বলেছেন, যারা জামায়াতে যোগদান করবে তারা পথভ্রষ্ট। অর্থাৎ এবার শুধু কোনো নীতি বা কর্মসূচির আলোচনা নয়, জামায়াতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ধর্মীয় ভাষায় মূল্যায়ন করেছেন। এর আগে নির্বাচনের আগে আরেকটি বক্তব্যে তিনি দলটির নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও দলটিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, একটি দল ইসলামের নাম ব্যবহার করলেও বাস্তবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ন্যায্য প্রমাণ নেই। এ ধরনের দ্বৈত আচরণকে ধর্মীয় পরিভাষায় তিনি মুনাফেকি বা ধোঁকাবাজি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এখন জনমনে প্রশ্ন আসছে, বায়তুল মোকাররমের ইমামতির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকেও তিনি কেন বারবার জামায়াতের রাজনীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলছেন? উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে অবাক করার মতো তথ্য। প্রচলিত আছে, একসময় এই আব্দুল মালেক জামায়াতের সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে বাস্তবতা হলো, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সময় দেওবন্দি আলেমদের তাত্ত্বিক লেখালেখি ব্যাপকভাবে লুফে নেয় জামায়াত শিবিরের তরুণ কর্মীরা। বিশেষ করে তাঁর সম্পাদিত মাসিক আল কাওসার পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ছিলেন শিবিরের শিক্ষার্থীরা। তরুণ বয়সে মুফতি আব্দুল মালেকের গভীর জ্ঞান ও হাদিস শাস্ত্রের পাণ্ডিত্যের কারণে তাঁদের লোকজন মনে করতেন জামায়াত ঘরানার পাঠকেরা।
দেওবন্দি ধারা ও জামায়াত বিরোধিতা
মুফতি আব্দুল মালেক দেওবন্দি তথা কওমি ধারার আলেম। এই ধারার আলেমদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যুদ আবুল আ’লা মওদুদী চিন্তাধারার তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘদিনের। দেওবন্দি আলেমদের মূল আপত্তি হলো, মওদুদী সাহাবিদের সমালোচনা করেছেন এবং ইসলামকে একটি আধ্যাত্মিক ধর্মের চেয়েও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন, যা তাদের মতে আকিদাগত বিচ্যুতি বা গোমরাহি।
বিশ্লেষকদের মতে জাতীয় মসজিদের খতিবের পদটি কোনো সাধারণ দলীয় মঞ্চ নয়; এটি দেশের সব মুসলিম নাগরিকদের একটি নিরপেক্ষ ধর্মীয় মিম্বর। সেখানে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে পথভ্রষ্টতার ফতোয়া দেওয়া খতিবের পদের নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে তাঁর এই ধরনের বক্তব্য সরকারের তৈলমর্দন কিংবা সুবিধাপ্রাপ্তির মাধ্যম কি না, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্যান্য ইসলামপন্থীদের ছেড়ে খতিবের বারবার শুধু জামায়াতকে নিশানা করা বর্তমান সরকারকে সন্তুষ্ট করার কোনো তোষণ নীতি কি না, নাকি এটি কেবল আকিদাগত দ্বন্দ্বে কওমি তরুণদের দলবদল রোধ করার সামাজিক চেষ্টা—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মুফতি আব্দুল মালেক হলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক নিযুক্ত জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের বর্তমান খতিব। ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদনক্রমে তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মুফতি আব্দুল মালেক দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ইসলামিক স্টাডিজ ও হাদিস শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ঢাকার জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর পাকিস্তানের জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া করাচি থেকে ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি (তাখাসসুস) অর্জন করেন। এরপর সৌদি আরবের বিশিষ্ট আলেম শেখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর অধীনেও হাদিস শাস্ত্রে গবেষণা করেন।
তিনি বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক স্কলার (আলেম)। দেশের অন্যতম শীর্ষ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকার মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শিক্ষা সচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি হাদিস শাস্ত্রের বিশ্বস্ততা ও সঠিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমাদৃত। তার তত্ত্বাবধানে ২০০৫ সাল থেকে মাসিক ‘আল-কাউসার’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে, যা ইসলামি ঘরানায় বেশ জনপ্রিয়।
খতিব আব্দুল মালেক কুমিল্লা জেলার লাকসামের একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
-কানিজ ফাতেমা সোমা