Novel

স্টেথোস্কোপে লেখা তুমি

November 7, 2026

Original Author আফরা আনাম

Translated by আফরা আনাম

10 views

✨ স্টেথোস্কোপে লেখা তুমি - পর্ব ৪ ✨

সেদিন ক্লাস থেকে বের হয়ে আমি আর বাসায় যাইনি। হাসপাতালের ছাদে গিয়ে একা বসেছিলাম অনেকক্ষণ।

আকাশটা কেমন মেঘলা ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশটাও আমার মতো কাঁদবে কাঁদবে করছে। বাতাসে একটা ঠান্ডা ভাব ছিল, তবুও বুকের ভেতরের গরমটা কমছিল না।

তার বলা কথাটা বারবার কানে বাজছিল...

"তুমি আমার কেউ না।"

আমি তো নিজেই বলেছিলাম কথাটা। তাও তার মুখ থেকে শুনে কেন এত কষ্ট লাগলো? কাল রাতে যে মানুষটা এত যত্ন করে ঘাড়ে মলম লাগিয়ে দিলো, আজ সেই মানুষটাই এত সহজে বলে দিলো আমি তার কেউ না।

ফোনটা হাতে নিলাম। তার আইডিটা আবার খুললাম। টাইপ করলাম, আবার কেটে দিলাম। কি লিখবো আমি?

"স্যার, আপনি এত নিষ্ঠুর কেন?"

না থাক। তিনি তো বলেই দিয়েছেন আমি তার কেউ না। তাকে মেসেজ দিয়ে আর নিজেকে ছোট করবো না।

তবুও মন মানছিল না। বারবার তার প্রোফাইলে ঢুকছিলাম। তার কোনো ছবি নেই, তবুও ওই ফাঁকা প্রোফাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগছিল। নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল। কেন আমি এত বেহায়া? যে মানুষটা আমাকে শুধু বকে, তার জন্য কেন আমার এত মায়া?

সন্ধ্যা হয়ে গেল। ভাইয়া কল দিলো।

ইয়াশ ভাইয়া: কই তুই? বাসায় আসবি না?

আমি: আসছি।

ইয়াশ ভাইয়া: তোর গলা এমন লাগছে কেন? কাঁদছিস?

আমি: না রে, ঠান্ডা লাগছে।

মিথ্যে বললাম। ভাইয়াকে তো আর বলা যায় না, তার স্যারই তার বোনকে কাঁদিয়েছে। ভাইয়া জানলে হয়তো তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে, তখন আরও লজ্জার ব্যাপার হবে।

বাসায় ফিরে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম। বই খুলে বসলাম, কিন্তু একটা লাইনও মাথায় ঢুকছিল না। খালি তার মুখটা ভাসছিল। রাগী চোখ, আবার সেই মলম লাগানোর সময় কাঁপা কাঁপা হাত। মানুষটা রাগ করলেও তার চোখে একটা অদ্ভুত মায়া থাকে, যেটা আমি ছাড়া হয়তো কেউ খেয়াল করে না।

পরের দিন ইচ্ছে করেই ক্লাসে গেলাম না। ভেবেছিলাম, আমি না গেলে হয়তো তিনি একটু হলেও খুঁজবেন। কিন্তু সারাদিন ফোনে একটা মেসেজও আসলো না। না ভাইয়ার কাছ থেকে, না তার কাছ থেকে।

সারাদিন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। খেতে ইচ্ছে করছিল না। আম্মু এসে বারবার জিজ্ঞেস করছিল কি হয়েছে। আমি শুধু বলেছি মাথা ব্যথা। মিথ্যে বলতে বলতে এখন ক্লান্ত লাগছে।

দুপুরে ভাইয়া বাসায় এসে বললো,

ইয়াশ ভাইয়া: কিরে, আজ ক্লাসে যাসনি কেন? স্যার তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।

আমার বুকটা ধক করে উঠলো।

আমি: কি জিজ্ঞেস করছিল?

ইয়াশ ভাইয়া: বললো, "তোমার বোন আজ আসেনি কেন? অসুস্থ নাকি?"

আমি: তুই কি বললি?

ইয়াশ ভাইয়া: বললাম, জানি না। তুই কি অসুস্থ?

আমি: হুম, একটু মাথা ব্যথা।

ভাইয়া চলে গেল। আমি বিছানায় শুয়ে হাসছিলাম। পাগলের মতো হাসছিলাম। যে মানুষটা বলে আমি তার কেউ না, সেই মানুষটাই আবার আমার খোঁজ নেয়! মানুষটা আসলে চায়টা কি? মুখে এক কথা, কাজে আরেক কথা।

রাতে আর থাকতে পারলাম না। অনেক সাহস করে তাকে একটা মেসেজ দিলাম।

আমি: স্যার, কাল ক্লাসে আসবো না ভাবছিলাম। কিন্তু আপনি খোঁজ নিয়েছেন শুনে মনে হলো আসা উচিত।

সিন হলো। কিন্তু রিপ্লাই আসলো না। ১ মিনিট... ৫ মিনিট... ৩০ মিনিট।

আমি ফোনটা রেখে দিলাম। হয়তো তিনি ব্যস্ত। হয়তো তিনি দেখেও দেখেননি। চোখ দিয়ে আবার পানি চলে আসছিল। ভাবছিলাম, থাক, আর কখনো মেসেজ দেবো না।

ঠিক রাত ১১:৪৭ এ ফোনটা ভাইব্রেট করলো। বুক কেঁপে উঠলো। হাত কাঁপছিল ফোনটা ধরতে।

স্যার: কাল ঠিক সময়ে ক্লাসে আসবে। লেট করলে ক্লাসে ঢুকতে দেবো না।

আমি: জি স্যার।

স্যার: আর শোনো।

আমি: জি?

স্যার: নিজের যত্ন নিও। ঘাড়ে ব্যথা থাকলে বলবে। কাল আবার মলম লাগিয়ে দেবো... মানে, ফার্মেসি থেকে নিয়ে নিও।

আমি মেসেজটা পড়ে ফোনটা বুকে চেপে ধরলাম। কিন্তু বুকের ভেতরটা হালকা হলো না, উল্টো আরও ভারী হয়ে গেল। মানুষটা কত সহজে "মলম লাগিয়ে দেবো" বলে আবার কেটে দিলো। যেন ভুল করে মনের কথাটা বলে ফেলেছে, আর এখন সেটাকে লুকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সে ইচ্ছে করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, এটা আমি এখন বুঝে গেছি। কিন্তু এই বোঝাটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের। যে মানুষটা আমার খোঁজ নেয়, আমার ব্যথার কথা মনে রাখে, সেই মানুষটাই দিনের শেষে বলে দেয় - আমি তার কেউ না। তাহলে আমি কি? শুধুই একটা দায়িত্ব? শুধুই একটা অপরাধবোধ মেটানোর মাধ্যম?

আমি জানি না আর কতদিন এভাবে পারবো। প্রতিদিন একটু একটু করে আশা করি, আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাই। তার একটা মেসেজে আমি বেঁচে উঠি, আবার তার একটা কথায় আমি মরে যাই। এভাবে কেউ ভালোবাসে? এভাবে কেউ ভালোবাসতে পারে?

সেদিন রাতে আমি আর কাঁদতে পারছিলাম না। চোখের পানিও যেন শেষ হয়ে গেছিল। শুধু বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো সারাজীবন তার কাছে শুধু "কেউ না" হয়েই থেকে যাবো। আর এই "কেউ না" শব্দটাই আমাকে সারাজীবন কাঁদাবে।

আমি তার কেউ না হয়েও, কেন তার জন্য এতটা কাঁদি? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমার কাছেও নেই। 💔

[চলবে...] ✨

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login