---
#আফরা#পর্ব২
✨ স্টেথোস্কোপে লেখা তুমি - পর্ব ২ ✨
স্যার বোর্ডে লেখা শুরু করলেন। একবারও আমার দিকে তাকালেন না।
অথচ আমি তো পুরো ক্লাসটা জুড়ে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। তাকালে হয়তো দেখতেন, আমার চোখে জমে থাকা অভিমানটা। কতটা কষ্ট নিয়ে আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি, সেটা হয়তো তিনি বুঝতেই পারলেন না।
স্যার পড়া বোঝাতে শুরু করলেন। তার গলার আওয়াজটা এত গম্ভীর, এত ভারী — পুরো ক্লাস চুপ করে শুনছে। আর আমিও সব অভিমান, সব কষ্ট এক সাইডে রেখে ক্লাসে মন দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
দীর্ঘ ১ ঘণ্টার ক্লাস করার পর ক্লাসটা অবশেষে শেষ হলো।
স্যার বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, হয়তো সে আমার চেহারাটাও মনে রাখেনি। অবশ্য মনে রাখার মতো কিছু নেইও। আমি তো সাধারণ একটা মেয়ে।
তারপরও বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠলো। কষ্ট লাগলো, ভীষণ কষ্ট।
আমি তার দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিলাম। এমন সময় সে ক্লাসের দরজার কাছে গিয়ে কী মনে করে যেন হঠাৎ আমার দিকে তাকালো। যেহেতু আমিও তাকিয়ে ছিলাম, তাই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সময়টা থেমে গেছে।
আমি সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিলাম। কারণ তার অগ্নি ধারণ করা চোখে তাকানোর সাহস আমার নেই। তার চোখে তাকালে আমার বুকটা কেমন ধুকপুক করে।
আমার ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন।
---
ইয়াফা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, _"কী হইছে আফরা, ক্রাশ খাইছিস নাকি?"_
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওকে বললাম, _"ক্রাশ না রে, তাকে ভালোবেসে ফেলছি।"_
*ইয়াফা:* মাত্র তো স্যারকে দেখলি, এর মধ্যে ভালোও বেসে ফেললি? 😑
*আমি:* তোকে কে বললো তাকে আমি আজকে দেখেছি? তাকে আমি আমার মন আরো আগেই দিয়ে ফেলছি।
*ইয়াফা:* কিহহহ! 😯 স্যারকে তুই আগে থেকে চিনিস?
আমি ওকে সব খুলে বললাম। হাসপাতালের সেই দিনটা, সেই প্রথম দেখা, সেই আস্তে করে বলা কথাগুলো — সব।
*ইয়াফা:* কিন্তু স্যারের যদি গার্লফ্রেন্ড থাকে বা স্যার বিবাহিত হয়, তখন কী করবি?
এই কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন জানি কেঁপে উঠলো।
*আমি:* জানি না রে, কিন্তু আমি তাকে খুব ভালোবেসে ফেলছি। 😭
*ইয়াফা:* স্যার তো খুব রুড, তুই কিভাবে প্রেমে পড়লি স্যারের?
আমাদের কথার মাঝে সেকেন্ড পিরিয়ডের স্যার চলে আসলো। আমরাও চুপ হয়ে গেলাম।
---
এইভাবে সবগুলো ক্লাস শেষ করে আমরা ক্যান্টিনে গেলাম কিছু খাওয়ার জন্য।
*ইয়াফা:* কী খাবি তুই?
*আমি:* আমার জন্য একটা বার্গার আর একটা কোল্ড ড্রিংকস। আর তুই কী খাবি?
*ইয়াফা:* আমিও সেইমটাই খাবো।
ইয়াফা অর্ডার দিতে চলে গেল। ফিরে এসে আমার পাশে বসে দুষ্টুমি করে বললো,
*ইয়াফা:* আফরা, আমার তোকে নিজের ভাবি বানিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে... 😘
*আমি:* পাগল একটা! আমি তো আমার ডাক্তার সাহেবের বউ হতে চাই। আমি চাই কোনো একদিন তার স্টেথোস্কোপ আমার হার্টবিট শুনুক। সেই দিনটা কবে আসবে, আদৌ আসবে কিনা তাও জানি না। 😭
*ইয়াফা:* কষ্ট পাস না, দেখবি তোর ভালোবাসা সত্যি হলে আল্লাহই তাকে তোর করে দিবে। ❤️
কথার মাঝে আমাদের খাবার চলে আসলো। আমরা খেতে খেতে আরো অনেক গল্প করলাম। কথা বলার মাঝে ইয়াফা ফিসফিস করে বললো, _"দেখ ছেলেগুলা কিভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।"_
আমিও সেই দিকে তাকালাম। আসলেই ছেলেগুলা কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। আমরা দুজন ওই দিকে মন না দিয়ে খাওয়া শেষ করে বিল দিয়ে ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে গেলাম।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমি রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আর একটা রিকশা পেয়েও গেলাম। আর ইয়াফার জন্য বাড়ি থেকে গাড়ি আসে, তাই ও আমাকে বিদায় দিয়ে চলে গেল। আমিও বাসায় চলে আসলাম।
---
বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আম্মুর কাছে গেলাম। আম্মুর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করার পর আমি বললাম,
*আমি:* আম্মু, ইয়াশ ভাইয়ার জন্য খাবার কি পাঠিয়ে দিয়েছো?
*আম্মু:* নাহ, একটু পরে ড্রাইভার নিয়ে যাবে। কেন রে?
*আমি:* তাহলে আমি দিয়ে আসি ভাইয়াকে লাঞ্চ?
*আম্মু:* ঠিক আছে, যা রেডি হয়ে আয়। আমি খাবার প্যাক করে নিই।
*আমি:* আচ্ছা। 😘
*আম্মু:* পাগলি মেয়ে আমার। ☺️
আমি একটা ব্ল্যাক শার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স পরে নিলাম। চুলগুলা ছেড়ে দিলাম, একটু আগে গোসল করেছি তাই। চুল থেকে এখনো হালকা পানির গন্ধ আসছে।
আমি রেডি হয়ে নিচে নেমে দেখলাম আম্মু খাবার প্যাক করে বসে আছে। আমি খাবারগুলো নিয়ে আম্মুকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ড্রাইভার নিয়ে।
---
হাসপাতালে পৌঁছে আমি ডিরেক্ট ভাইয়ের কেবিনে চলে গেলাম। কিন্তু ভাইয়ের কেবিনে কেউ ছিল না। তাই আমি ভাইয়ের চেয়ারে বসে বসে ফোন টিপছিলাম। এমন সময় কেউ একজন ভিতরে ঢুকলো। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো আমি এখানে কী করি?
*আমি:* ভাইয়ার জন্য লাঞ্চ নিয়ে আসছি।
আপনারা যা ভাবছেন তাই-ই। এটা আর কেউ না, আমার ডাক্তার সাহেব। ☺️
তাকে দেখেই আমার বুকটা ধক করে উঠলো।
*ডাক্তার সাহেব:* ওহ! এমন অভদ্রের মতো পা টেবিলের উপরে উঠিয়ে রেখেছো কেন? 😡
*আমি:* সরি স্যার। 😔 তার এমন রুড ব্যবহারে আমার চোখে পানি চলে আসলো। 🥹 আমি তো ইচ্ছা করে করিনি।
*ডাক্তার সাহেব:* আর এইভাবে চুলগুলা ছেড়ে রেখেছো কেন, বেয়াদব মেয়ে! 😡
*আমি:* চুল ভেজা তাই। 😔
*ডাক্তার সাহেব:* পরের বার যেন না দেখি, স্টুপিড!
*আমি:* হুম।
*ডাক্তার সাহেব:* মনে থাকে যেন।
ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন। আর তার কথায় আমার ভীষণ কষ্ট লাগলো। 😭 মনে হলো, আমি যাকে এত ভালোবাসি, সে আমাকে শুধু বকাই দেয়।
---
আমি মন ভালো করার জন্য বাইরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। হাসপাতালের করিডোরটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। এমন সময় সাইফান ভাইয়া আসলো আমার কাছে। সাইফান ভাইয়া হলো ইয়াশ ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড।
*সাইফান ভাইয়া:* কখন আসলে আফরা?
*আমি:* একটু আগে ভাইয়া।
*সাইফান ভাইয়া:* মন খারাপ নাকি?
আমি জোর করে হেসে বললাম,
*আমি:* নাহহ।
*সাইফান ভাইয়া:* আচ্ছা চলো একসাথে হাঁটি, তোমার ভালো লাগবে।
*আমি:* আচ্ছা চলেন।
আমরা হাঁটছি আর হাসাহাসি করছি। সাইফান ভাইয়া অনেক মজার মজার কথা বলছিল, তাই মনটা একটু হালকা লাগছিল। এটা দূর থেকে কেউ একজন দেখে খুব রেগে গেল, যেটা আমরা দেখলাম না।
কিছুক্ষণ পরে ভাইয়ার কাজ শেষ হওয়ায় ভাইয়া চলে গেল। আমি একা একা হাঁটছি। হঠাৎ কেউ আমার হাত টান দিয়ে একটা রুমে ঢুকিয়ে নিলো।
আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি চিৎকার দেওয়ার আগে মুখ চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে কেউ একজন বললো,
> *"অন্য ছেলেদের সাথে এত হাসাহাসি করো কোন সাহসে?"*
তার গলার আওয়াজটা চিনতে আমার এক মুহূর্তও লাগলো না।
এটা বলেই সে ঘাড়ে একটা কামড় দিয়ে দিলো। মুখে হাত থাকায় আওয়াজও করতে পারলাম না। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল। আমি ছোটাছুটি করার চেষ্টা করায় ও ছাড়লো। যখন আমার কান্না মাখা মুখটা দেখলো, ও আমাকে টান দিয়ে বুকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
তার বুকের ধুকপুক শব্দটা আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি শান্ত হওয়ার পর আমাকে ওয়ার্নিং দিয়ে চলে গেল।
*বলুন তো, কে ছিল এই লোকটা?* 🫣
*[চলবে...]* ✨
---