স্টেথোস্কোপে লেখা তুমি - পর্ব ১
#আফরা আনাম
#স্টেথোস্কোপে লেখা তুমি #১
হাসপাতালের গন্ধটা আমার একদম সহ্য হয় না।
আমি বেডে শুয়ে ছিলাম। পা টা মচকে গেছে, তাই ব্যান্ডেজ করা। মেজো ভাইয়া ইয়াশ আমার পাশে বসে ছিল।
*ইয়াশ:* আফরা, একটু বসে থাক, স্যার আসছেন রাউন্ডে। উনি দেখে গেলেই আমরা বাসায় যাবো।
আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। তখনই দরজা ঠেলে কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তার নিয়ে তিনি ঢুকলেন।
সাদা এপ্রোন, হাতে ফাইল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। গলায় ঝুলছে একটা স্টেথোস্কোপ।
আমি তাকিয়ে রইলাম। সে আমার পাশের বেডের একটা বাচ্চাকে দেখছিল আর জুনিয়রদের বোঝাচ্ছিল।
*"অস্কালটেশন করার সময় কখনো তাড়াহুড়া করবে না। রোগী তোমার পরীক্ষার বস্তু না, তোমার দায়িত্ব।"*
আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। ভেবেছিলাম সে আমাকে দেখেই নি।
কিন্তু যখন সে চলে যাচ্ছিল, যাওয়ার সময় হঠাৎ আমার বেডের সামনে এসে থামলো। আমার পায়ের দিকে একবার তাকালো, তারপর আমার মুখের দিকে।
সে খুব আস্তে, শুধু আমি শুনতে পাই এমন ভাবে বললো,
*"পা নাড়াবে না। ব্যান্ডেজ ভিজিও না।"*
বলেই সে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তার মানে তিনি আমাকে হাসপাতালে দেখেছিলেন! খেয়ালও করেছিলেন!
মেজো ভাইয়া এসে বললো, "উনি ডা. আয়ান চৌধুরী। আমাদের মেডিসিনের প্রফেসর। খুব রুড, কিন্তু সবাই তাকে সম্মান করে।"
আমি কিছু বলি নি। শুধু মনে মনে নামটা লিখে রাখলাম - আয়ান।
তারপর আরো একদিন হাসপাতালে ছিলাম, তাকে আর দেখি নি।
---
এর কিছুদিন পর আমার কলেজ খুললো। কলেজে যেতে যেতে আপনাদের সাথে আমার পরিচয়টা দিয়ে দেই -
*আমি আফরা। পুরো নাম আফরা আনাম চৌধুরী। আমি আমার বাবা-মায়ের ৩ নাম্বার সন্তান। আমার আরো দুইটা বড় ভাই আছে। মায়ের নাম মরিয়ম ইসলাম আর বাবার নাম আলী আকবর চৌধুরী। বড় ভাইয়ার নাম আয়াশ নীল চৌধুরী আর মেজো ভাইয়ার নাম ইয়াশ নীল চৌধুরী। বড় ভাইয়া বাবার কোম্পানি সামলায় আর মেজো ভাইয়া একজন ডাক্তার। আম্মু হাউসওয়াইফ। আমি ডিএমসির স্টুডেন্ট। আজ আমার কলেজের প্রথম দিন।*
ওহ, কলেজ চলে এসেছি!
আমি রিকশা ভাড়া দিয়ে আমার স্বপ্নের কলেজটা দেখছি। আমি ধীরে ধীরে কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
ক্লাসরুম খুঁজতে খুঁজতে ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে ঢুকলাম। একটা বেঞ্চে বসলাম। এমন সময় একটা মেয়ে হাসি মুখে এসে বললো -
*ইয়াফা:* আমি কি এখানে বসতে পারি?
*আমি:* কেন নয়, বসো।
ওর নাম ইয়াফা মির্জা। আজ থেকে আমরা ফ্রেন্ডস।
আমাদের কথার মাঝেই স্যার চলে আসলো। আর স্যারকে দেখে তো আমি পুরো স্তব্ধ।
সেই হাসপাতালের সেই ডাক্তার! ডা. আয়ান চৌধুরী!
স্যার এসে অ্যাটেনডেন্স নেওয়া শুরু করলেন।
*স্যার:* রোল ২৩?
*আমি:* প্রেজেন্ট স্যার!
উনি মুখ তুলে তাকালেন, কিন্তু এমন ভাবে তাকালেন যেন আমাকে চেনেনই না। তার মুখটা সাথে সাথে শক্ত হয়ে গেল।
*স্যার:* তুমি আফরা আনাম চৌধুরী? প্রথম দিনেই ডিসিপ্লিন ভেঙেছ? চুল ছেড়ে এসেছ কেন? এপ্রোন কই? এটা কলেজ, কোনো পার্ক না।
পুরো ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে। আমার লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেল।
মনে মনে খুব কষ্ট পেলাম। হাসপাতালে তো তিনি আমাকে দেখেছিলেন, এত সুন্দর করে বলেছিলেন পা না নাড়াতে। তাহলে আজ ক্লাসে এমন অচেনা ব্যবহার কেন করলেন? তিনি কি আমাকে ভুলে গেছেন?
স্যার বোর্ডের দিকে ঘুরে লিখতে লাগলেন। আর আমি তাকিয়ে রইলাম তার গলার সেই স্টেথোস্কোপটার দিকে।
*[চলবে...]*