১.
আকাশের রং যখন ফিকে বেগুনি থেকে কালচে নীল হতে শুরু করে, ঠিক তখন শহরটার সমস্ত জানালার কাচ অদ্ভুত এক শব্দে কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনি ভূমিকম্পের নয়, বাতাসে ভেসে আসা এক চেনা অথচ অচেনা সুরের। সুরটা কোথা থেকে আসে কেউ জানে না। কেউ বলে শহরের শেষ মাথায় যে ভাঙা লাইটহাউসটা পরিত্যক্ত পড়ে আছে, ওখানকার কোনো ফাটল দিয়ে বাতাস ঢোকার শব্দ এটা। আবার কারো মতে, এটা নিছকই শহরের মানুষের মনের ভুল।
কিন্তু সৌমিকের কাছে এটা মনের ভুল ছিল না। সৌমিক পেশায় একজন ঘড়ি-মেকার। পুরোনো দিনের টিকটিক করা ঘড়ি, দাদু আমলের পকেট ওয়াচ কিংবা ভাঙা দেওয়াল ঘড়ি মেরামত করাই তার কাজ। শহরের এক অন্ধকার গলির মোড়ে তার ছোট্ট দোকানটা। দোকানের নাম ‘কাল-পরিক্রমা’। সৌমিকের বয়স ত্রিশের কোঠায়, কিন্তু তার চোখ দুটো দেখলে মনে হয় সে যেন কয়েক শতাব্দী ধরে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে।
সেদিন রাতেও সৌমিক একটা আঠারো শতকের ফরাসি পকেট ঘড়ি নিয়ে বসেছিল। ঘড়িটার কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরছিল। যতবারই সে স্প্রিংটা সোজা করার চেষ্টা করছিল, ততবারই তার কানের কাছে সেই অদ্ভুত সুরটা এসে ধাক্কা মারছিল। ঠিক তখনই দোকানের দরজার ওপরে ঝোলানো পিতলের ঘণ্টাটা টুং করে বেজে উঠল।
সৌমিক চোখ তুলে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত জোড়া চরিত্র। একজন খোকন আর অন্যজন খুকু। কিন্তু সাধারণ কোনো খোকন-খুকু নয় তারা। ছেলেটার পরনে একটা ঢিলেঢালা কোট, যার পকেট থেকে তাসের পাতার মতো কিছু একটা উঁকি দিচ্ছে। আর মেয়েটার চুলে বাঁধা মেঘের মতো ধূসর রঙের একটা রিবন। তাদের দুজনেরই চোখগুলো অসম্ভব উজ্জ্বল, যেন সেখানে হাজারটা জোনাকি একসঙ্গে জ্বলছে।
"তুমিই কি সৌমিক?" ছেলেটি জিজ্ঞেস করল। তার গলার আওয়াজটা ঠিক মেঘ ডাকলে যেমন গম্ভীর শোনায়, তেমন।
সৌমিক ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, "হ্যাঁ। কী চাই?"
মেয়েটি এগিয়ে এল। তার হাতে কাপড়ের তৈরি একটা পুঁটলি। সে পুঁটলিটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, "আমাদের একটা অদ্ভুত জিনিস মেরামত করে দিতে হবে। বাবা বলেছেন, এই শহরের শুধু তুমিই পারো ভাঙা সময় জোড়া দিতে।"
সৌমিক পুঁটলিটা খুলল। ভেতরে কোনো ঘড়ি নেই। সেখানে রয়েছে একটা কাচের পাত্র, যার ভেতরে বন্দি হয়ে আছে একটুকরো ঘন কালো মেঘ। আর সেই মেঘের ভেতর থেকে থেকে রূপোলি রঙের বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেঘটার ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ব্যাঙ বসে আছে। ব্যাঙটার মাথায় একটা ছোট্ট টোপর!
সৌমিক অবাক হয়ে তাকাল। "এটা কী?"
ছেলেটি, যাকে খোকন বলে মনে হচ্ছিল, সে গম্ভীর মুখে বলল, "এটা আমাদের পোষা ব্যাঙ। নাম তার গ্যাঙর বাবু। কিন্তু সমস্যা ব্যাঙটাকে নিয়ে নয়, সমস্যা তার বাসাকে নিয়ে।"
"বাসা?"
"হ্যাঁ, ও মেঘের ওপর বাসা বানিয়েছিল," খুকু বলল। "আমরা বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, মেঘে কি কেউ বাসা বাঁধে? বৃষ্টি এলে তো ভেসে যাবি! কিন্তু ও শোনেনি। গত পরশু রাতে যখন বোম্বে ঝড় এল, তখন ওর মেঘের তাসের ঘরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আর তারপর থেকেই আমাদের চারপাশের সময় কেমন যেন জট পাকিয়ে গেছে।"
সৌমিকের মনে হলো সে কোনো পাগলের পাল্লায় পড়েছে। কিন্তু তার দোকানে যারা আসে, তারা কেউই খুব একটা স্বাভাবিক হয় না। সে কাচের পাত্রটার দিকে ভালো করে তাকাল। দেখল, মেঘের ভেতরে যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তা আসলে বিদ্যুতের আলো নয়। সেগুলো ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার মতো টিকটিক করে কাঁপছে। ব্যাঙটা যখনই ডাকছে, "গ্যাঙর-গ্যাঙ", দোকানের দেওয়াল ঘড়ির কাঁটাগুলো পাঁচ মিনিট করে পিছিয়ে যাচ্ছে!
২.
সৌমিক বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ মেঘ নয়। এটা হলো ‘সময়-মেঘ’। কোনো এক অজানা কারণে এই দুই শিশু এবং তাদের ব্যাঙ প্রকৃতির এক চরম নিয়মকে ওলটপালট করে ফেলেছে।
"তোমরা কোথা থেকে এসেছ?" সৌমিক জিজ্ঞেস করল।
খোকন একটু হাসল। বলল, "আমরা আসি সুকুমারপুর থেকে। আমাদের ওখানে ছন্দের বাইরে কোনো কথা হয় না, আর নিয়মের বাইরে কোনো রূপকথা চলে না। কিন্তু এই ব্যাঙটা একটা মহাবিপদ ঘটিয়েছে। ও মেঘের ওপর বাসা বাঁধতে গিয়ে আকাশের একটা কালানুক্রমিক ফাটল তৈরি করে ফেলেছে। এখন আমাদের গ্রামে সকালের পর দুপুর আসে না, সরাসরি রাত নেমে আসে। আর রাতে চাঁদ মামা এসে গালে চুমা দেওয়ার বদলে, সূর্য এসে চোখ রাঙায়!"
সৌমিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে তার টেবিল থেকে একটা বড় আতস কাচ নিল। কাচটা পাত্রের গায়ে ধরতেই সে দেখতে পেল, মেঘের ভেতরে ব্যাঙটার পায়ের নিচে একটা ছোট্ট রুপোর চাবি পড়ে আছে। চাবিটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে।
"এই চাবিটা কার?" সৌমিক প্রশ্ন করল।
খুকু বলল, "ওটা আকাশের মেঘ-বিলাসের চাবি। ওটা দিয়েই মেঘের চাদরটাকে আকাশের গায়ে লক করে রাখা হতো। চাবিটা ভাঙার পর থেকেই মেঘের ওপর ব্যাঙের বাসাটা ভেঙে পড়েছে আর সময়টা পিছলে যাচ্ছে।"
সৌমিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাজটা কঠিন। ভাঙা লোহা বা সোনা জোড়া দেওয়া যায়, কিন্তু ভাঙা চাবি যা সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে, তা জোড়া দেওয়া সহজ নয়। সে বলল, "ঠিক আছে। তোমরা আগামীকাল রাতে এই সময়ে এসো। আমি চেষ্টা করে দেখব। তবে একটা শর্ত আছে।"
"কী শর্ত?" খোকন জানতে চাইল।
"তোমাদের এই ব্যাঙটাকে এখানে রেখে যেতে হবে। কারণ ওর গ্যাঙর-গ্যাঙ ডাকের সাথে সাথে আমার দোকানের ঘড়িগুলো পাগল হয়ে যাচ্ছে।"
খুকু প্রথমে রাজি হতে চাইল না, কিন্তু খোকন তাকে বুঝিয়ে রাজি করাল। তারা দুজনে অন্ধকার গলির মোড়ে মিলিয়ে গেল। যাওয়ার সময় বাতাস থেকে আবার সেই অদ্ভুত সুরটা ভেসে এল।
৩.
রাত তখন গভীর। পুরো শহর ঘুমে কাদা। সৌমিকের দোকানে শুধু একটা লণ্ঠন জ্বলছে। সে কাচের পাত্র থেকে সাবধানে মেঘের টুকরোটা বের করল। মেঘটা তার হাতের তালুতে এসে এক টুকরো বরফ-ঠান্ডা তুলোর মতো বসল। ব্যাঙটা সোজা লাফ দিয়ে সৌমিকের নাকের ডগায় চড়ে বসল এবং একটা বড় ডাক দিল—"গ্যাঙর!"
সঙ্গে সঙ্গে সৌমিকের চোখের সামনে চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল। দোকানঘর উধাও। সে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল মাঠের মাঝখানে। কিন্তু মাঠটা মাটিতে নয়, মাঠটা তৈরি সাদা তুলতুলে মেঘ দিয়ে! মাথার ওপরে আকাশটা কুচকুচে কালো, আর পায়ের নিচে মেঘের চাদরটা কাঁপছে।
কিছুদূরে দেখা যাচ্ছে একটা অদ্ভুত বাড়ি। বাড়িটা তাসের তৈরি, কিন্তু তাসগুলো যেন মেঘের ওপর ভেসে আছে। সৌমিক বুঝল, এটাই সেই ব্যাঙের বাসা। সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। বাড়ির দরজায় একটা বড় সাইনবোর্ড ঝুলছে, তাতে অদ্ভুত অক্ষরে লেখা: "এখানে আক্কেল কম মানুষের প্রবেশ নিষেধ।"
সৌমিক ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরে টেবিলের ওপর সেই ভাঙা রুপোর চাবিটার একটা অংশ পড়ে আছে। আর ঘরের কোণে একটা চেয়ারে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ লোক। তাঁর চুলগুলো পাটের আঁশের মতো সাদা, আর গায়ে জড়ানো বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে তৈরি একটা চাদর।
"কে তুমি?" বৃদ্ধ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
সৌমিক ভয় না পেয়ে বলল, "আমি একজন ঘড়ি-মেকার। খোকন আর খুকু আপনার চাবিটা ঠিক করতে পাঠিয়েছে।"
বৃদ্ধের মুখের ভাব নরম হলো। তিনি বললেন, "ওহ, সুকুমারপুরের বাচ্চাদুটো? আমি হলাম মেঘ-বিলাস। এই আকাশের মেঘেদের মেষপালক। ওই বোকা ব্যাঙটা আমার চাবিটা চুরি করে মেঘের ওপর বাসা বানাতে গিয়েছিল। ও তো আর বোঝেনি, মেঘে বাসা বাঁধলে বৃষ্টির তোড়ে সব ভেসে যায়! এখন চাবিটা ভেঙে যাওয়ায় আকাশের ছন্দ কেটে গেছে।"
"আমি এটা কীভাবে ঠিক করব?" সৌমিক জিজ্ঞেস করল।
মেঘ-বিলাস বললেন, "চাবিটা লোহা বা আগুনে গলিয়ে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে মানুষের খাঁটি আনন্দ আর খাঁটি ছন্দ দিয়ে। তুমি যদি এমন একটা সত্য ছড়া বা কথা বলতে পারো যা এই আকাশের বুকে আগে কখনো ধ্বনিত হয়নি, তবেই এই চাবিটা জোড়া লাগবে।"
সৌমিক চিন্তা করতে লাগল। সে তো কবি নয়, সে ঘড়ি-মেকার। সে শুধু সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টার হিসাব বোঝে। সে কীভাবে ছন্দ মেলাবে?
ঠিক তখনই ব্যাঙটা তার পকেট থেকে মাথা বের করে বলল, "গ্যাঙর-গ্যাঙ, ভিজছে ট্যাং!"
সৌমিকের মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে চারপাশে তাকাল। দেখল মেঘের দেশে কোনো মানুষ নেই, শুধু নিয়মের খেলা। সে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে বলতে শুরু করল:
"আক্কেল যার মাথায় কম,
মেঘের ওপর ডাকল দম।
ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘোরে,
ব্যাঙ বাবু যায় মাটির ঘরে।
খোকন-খুকু হাসুক এবার,
সময় হলো ছন্দ নেবার!"
সৌমিকের ছড়াটা শেষ হতেই চারপাশের মেঘের মাঠ প্রচণ্ড জোরে কাঁপতে শুরু করল। বৃদ্ধ মেঘ-বিলাস খিলখিল করে হেসে উঠলেন। সেই হাসির শব্দে যেন হাজারটা কাচের চুড়ি একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। আর দেখতে দেখতে টেবিলের ওপর থাকা চাবির টুকরো দুটো একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়ে এক উজ্জ্বল আলো ছড়াতে লাগল।
৪.
চোখ মেলতেই সৌমিক দেখল সে আবার তার নিজের দোকানের কাঠের চেয়ারটায় বসে আছে। কপালে তার ঘাম। হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে দেখল, চাবিটা সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে গেছে। আর কাচের পাত্রের ভেতরে ব্যাঙটা চুপচাপ বসে আছে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না।
পরদিন রাতে ঠিক সময়ে খোকন আর খুকু দোকানে এল। তাদের মুখে আজ কোনো দুশ্চিন্তা নেই। খুকু এসেই বলল, "আমাদের গ্রামের সময় ঠিক হয়ে গেছে সৌমিক! আজ সকালে আমরা একদম ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠেছি।"
সৌমিক পাত্রটা আর জোড়া লাগানো চাবিটা তাদের হাতে দিল। খোকন চাবিটা পকেটে রেখে বলল, "তোমাকে ধন্যবাদ সৌমিক। তুমি শুধু ঘড়ি ঠিক করো না, তুমি আমাদের জীবনটাও ঠিক করে দিলে।"
সৌমিক হাসল। বলল, "তোমাদের ব্যাঙ বাবুকে বোলো, এবার যেন মাটির নিচে কোনো গর্তে বাসা বানায়। মেঘের ওপর বাসা বানানোর আক্কেল যেন আর না হয়।"
খুকু ব্যাঙটাকে কোলে নিয়ে তার গালে একটা আলতো টোকা দিয়ে বলল, "শুনলি তো? এবার থেকে মাটিতেই থাকবি।"
তারা দোকান থেকে বের হয়ে গেল। সৌমিক দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল, রাতের আকাশে মেঘেরা কেমন সুন্দর সার বেঁধে ভেসে চলেছে। বাতাস থেকে আর সেই অদ্ভুত কান্নার মতো সুরটা আসছে না। এখন বাতাসে ভেসে আসছে এক মিষ্টি, শান্তিময় ছন্দ—যা শুনলে যেকোনো খোকনমণির চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে।
সৌমিক দোকানের লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। দেওয়াল ঘড়িটা তখন একদম সঠিক সময় দেখাচ্ছিল—টিক, টিক, টিক।