১.
ঠিক এক সপ্তাহ পরের কথা। শহরটায় তখন ঝিরঝির করে কার্তিক মাসের কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। সৌমিকের ‘কাল-পরিক্রমা’ দোকানে ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো ছিল কিছু স্প্রিং আর গিয়ার। সৌমিক একটা পুরোনো পকেট ঘড়ির কাচ পরিষ্কার করছিল, এমন সময় হঠাৎ দোকানের দেওয়াল ঘড়িগুলো অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল।
নরমাল টিকটিক শব্দটা বন্ধ হয়ে হুট করে বাজতে লাগল—“খট-খটাখট, খট-খটাখট!”
দেওয়ালের একটা কোকিল ঘড়ি থেকে পাখিটা বের হয়ে ‘কু-কূ’ না ডেকে ডেকে উঠল, “ঘেঁও-ঘেঁও!”
সৌমিক আতস কাচটা চোখ থেকে নামিয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল, “ঐ সুকুমারপুরের আপদগুলো আবার কোনো কাণ্ড ঘটায়নি তো?”
ভাবতে না ভাবতেই দোকানের কাঠের দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। এবার আর শান্তশিষ্টভাবে নয়, খোকন আর খুকু প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের ভেতর ঢুকল। খোকনের কোটের পকেট থেকে তাসের বদলে এবার উঁকি দিচ্ছে একটা বড়সড় কাঁচি, আর খুকুর মাথার সেই ধূসর মেঘ-রিবনটা আজকে কেমন যেন লালচে হয়ে আছে—যেন রাগে ফুঁসছে!
কিন্তু তাদের সাথে গ্যাঙর বাবু নেই।
“কী ব্যাপার? আবার কী ওলটপালট করলে তোমরা?” সৌমিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল।
খুকু টেবিলের ওপর হাত চাপড়ে বলল, “সর্বনাশ হয়েছে সৌমিক ভাই! গ্যাঙর বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তার চেয়েও বড় কথা, আকাশের সেই রুপোর চাবিটা আবার চুরি গেছে!”
খোকন গম্ভীর গলায় যোগ করল, “শুধু চুরি যায়নি ভাই, চোর এবার মহাশক্তিমান। সে চাবিটা দিয়ে আকাশের মেঘ লক করার বদলে উল্টো পুরো আকাশটাকে ‘আনলক’ করে দিয়েছে। যার ফলে সুকুমারপুরের সব ছড়া আর গল্প একে অপরের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে!”
“মানে?” সৌমিক ভুরু কুঁচকাল।
“মানে আর কী!” খুকু হাত-পা নেড়ে বলতে লাগল, “হাঁসজারুর গায়ের কাঁটাগুলো এখন বকচ্ছপের পিঠে গিয়ে গজিয়েছে। দাশরথির পাঁচালির সুর ধরে ডাকছে পাড়ার হুলো বিড়াল। আর সবচেয়ে বিপদের কথা, যে মেঘ-বিলাস বুড়ো আমাদের চাবিটা পাহারা দিচ্ছিলেন, চোর তাকে একটা আস্ত জলভরা মেঘের বালিশের ভেতর বন্দি করে রেখে গেছে। বুড়ো এখন শুধু নাক ডাকছেন আর আকাশে অকাল বন্যা বয়ে যাচ্ছে!”
সৌমিকের মাথায় হাত। সে বুঝতে পারল, চাবিটা যদি দ্রুত উদ্ধার করা না যায়, তবে শুধু সুকুমারপুর নয়, এই বাস্তব শহরের সময়ও জট পাকিয়ে যাবে। অলরেডি দেওয়াল ঘড়ির পাখিটা কুকুরের মতো ডাকতে শুরু করেছে!
“তোমরা চোরকে দেখেছ?” সৌমিক জিজ্ঞেস করল।
“পুরো দেখিনি,” খোকন পকেট থেকে কাঁচিটা বের করে বলল, “তবে সে যখন পালাচ্ছিল, তখন তার পিছু নিয়েছিলাম। সে একটা মস্ত বড় হাতির পিঠে চড়ে হাওয়া হয়ে গেল। তবে সাধারণ হাতি নয়, সেই হাতির পিঠে দুটো বিশাল ডানার মতো পাখা ছিল! আর যাওয়ার সময় সে মাটিতে একটা অদ্ভুত জিনিস ফেলে গেছে।”
খোকন তার কোটের অন্য পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বের করল। কৌটোটা খুলতেই ঘরটা চড়া তামাক আর শুকনো লঙ্কার কড়া গন্ধে ভরে গেল।
সৌমিক কৌটোর ভেতরের জিনিসটা দেখে চমকে উঠল। ভেতরে রয়েছে একটা রুপোলি রঙের সুতো, যা অবিকল একটা ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো এদিক-ওদিক দুলছে।
“আমি এই গন্ধ চিনি,” সৌমিক বলল, তার চোখ চকচক করে উঠল। “এটা এ শহরের কেউ নয়। এটা হলো ‘নস্যি-বাবু’র কাজ! সে থাকে এই শহরের ঠিক ওপরে, যেখানে কুয়াশা আর ধোঁয়া একসঙ্গে মিশে একধরণের কালচে মেঘ তৈরি করে। সে সবসময় মানুষের ভালো সময়গুলো চুরি করে নস্যির মতো নাকে নেয় আর হাঁচি দেয়!”
২.
আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সৌমিক তার ড্রয়ার থেকে একটা বিশেষ জিনিষ বের করল—একটা পিতলের কম্পাস, যার কাঁটা উত্তর-দক্ষিণ দেখায় না, দেখায় সময়ের গতিপথ।
“চলো,” সৌমিক বলল, “আজ আমাদের নস্যি-বাবুর আস্তানায় হানা দিতে হবে।”
তারা তিনজন দোকান থেকে বের হয়ে গলির মোড়ে দাঁড়াল। সৌমিক কম্পাসটা বাতাসে ধরতেই তার ভেতর থেকে একটা হালকা নীল আলোর রেখা বের হয়ে আকাশের দিকে চলে গেল। খুকু তার পকেট থেকে একটা জাদুর চকোলেট বের করে কামড় দিল, আর দেখতে দেখতে তাদের পায়ের নিচে একটা ছোটখাটো মেঘের ভেলা তৈরি হয়ে গেল।
মেঘের ভেলাটা তাদের নিয়ে তরতর করে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। শহরটা আস্তে আস্তে ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল কুয়াশার চাদরে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা এসে পৌঁছাল এক অদ্ভুত জায়গায়। এখানে চারিদিকটা কুচকুচে কালো ধোঁয়ায় ভরা। আর সেই ধোঁয়ার মাঝখানে একটা বিশাল প্রাসাদ, যা দেখতে হুবহু একটা মস্ত বড় নস্যির কৌটোর মতো! প্রাসাদের গেটে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ডানাদলা হাতি, যা খোকন দেখেছিল। তবে হাতিটা এখন মনের সুখে একঝুড়ি লঙ্কা চিবোচ্ছে।
“ভেতরে ঢুকব কীভাবে?” খুকু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
খোকন বলল, “আমার কাছে একটা বুদ্ধি আছে। সুকুমার রায়ের ছন্দের একটা বিশেষ শক্তি আছে। আমরা যদি এমন একটা উল্টো ছড়া বলি যা শুনলে হাতির মাথা ঘুরে যায়, তবে ও নিজেই আমাদের পথ ছেড়ে দেবে।”
সৌমিক মাথা নাড়ল। খোকন আর খুকু হাত ধরাধরি করে জোরে জোরে বলতে শুরু করল:
“ডানাওয়ালা হাতি ওরে,
লঙ্কা খাস তুই গোগ্রাসে!
লেজটা তোর মাথায় ঘোরে,
নাক দিয়ে তোর কান্না আসে!
উল্টো পায়ের নাচটা নাচ রে,
আক্কেলখানা এবার বাঁচ রে!”
ছড়াটা শেষ হতেই হাতিটা তার সুরটা আকাশে তুলে এক বিকট চিৎকার দিল। তারপর নিজের চারটে পা জট পাকিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গিয়ে চোখগোল্লা গোল করে ঘুরতে লাগল।
“দাড়ুন তো!” সৌমিক হেসে বলল। “এবার ভেতরে চলো।”
৩.
প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই এক বিশাল হলঘর। ঘরের চারদিকের দেওয়ালে হাজার হাজার কাচের বয়াম সাজানো। আর সেই বয়ামগুলোর ভেতরে বন্দি হয়ে আছে শহরের মানুষের হাজারটা ‘মিষ্টি মুহূর্ত’ আর ‘সুন্দর সময়’। কোনো বয়ামে জ্বলছে পুজোর ছুটির সকাল, কোনোটাতে বন্দি আছে মায়ের হাতের গরম পায়েসের গন্ধ।
আর ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা মস্ত বড় কাঠের চেয়ারে বসে আছেন নস্যি-বাবু। তার নাকটা একটা মুলোর মতো লম্বা আর লাল। তার এক হাতে সেই রুপোর চাবি, আর অন্য হাতে আমাদের গ্যাঙর বাবু! গ্যাঙর বাবুর মাথায় সেই টোপরটা এখন বাঁকা হয়ে আছে, আর সে রাগে ফুসছে।
নস্যি-বাবু চাবিটা দিয়ে গ্যাঙর বাবুর পিঠে কী যেন একটা লেখার চেষ্টা করছিলেন। তাদের দেখে তিনি চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
“উঁহু হঁহঁ! ঘড়ি-মেকার এসে গেছে দেখছি!” নস্যি-বাবু খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলেন। “আর সাথে সুকুমারপুরের দুই খুদে শয়তান! কেন এসেছ এখানে? এই চাবি আর এই ব্যাঙ এখন আমার। আমি এই চাবি দিয়ে সব মানুষের ভালো সময় লক করে দেব, আর এই ব্যাঙের গ্যাঙর-গ্যাঙ ডাক দিয়ে তৈরি করব দুনিয়ার সবচেয়ে কড়া নস্যি!”
গ্যাঙর বাবু সৌমিককে দেখেই চিৎকার করে উঠল—“গ্যাঙর-গ্যাঙ! বাঁচা ভাই ল্যাঙ্গে-ব্যাঙ্গে!”
সৌমিক একধাপ এগিয়ে বলল, “নস্যি-বাবু, তুমি ঘড়ির সময় চুরি করতে পারো, কিন্তু ছন্দের সময় চুরি করার সাধ্য তোমার নেই। চাবিটা ভালোয় ভালোয় ফিরিয়ে দাও, নইলে কিন্তু বিপদ হবে।”
“বিপদ? হাঃ!” নস্যি-বাবু টেবিল থেকে এক চিমটে কালো নস্যি নিয়ে নাকের কাছে ধরলেন। “আমি একটা হাঁচি দিলে তোমরা সোজা উড়ে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পড়বে!”
সে বড় করে শ্বাস নিল—“আআআ... আআ...” তার হাঁচি আসার উপক্রম!
“খুকু, এখনই!” সৌমিক চিৎকার করে উঠল।
খুকু আর দেরি না করে তার চুলের সেই লালচে হয়ে থাকা মেঘ-রিবনটা খুলে সোজা ছুঁড়ে দিল নস্যি-বাবুর নাকের ওপর। রিবনটা বাতাসে গিয়ে একটা আস্ত জলভরা বর্ষার মেঘে পরিণত হলো এবং নস্যি-বাবুর নাকের ডগায় গিয়ে টুপ করে এক ফোঁটা ঠান্ডা জল ফেলে দিল।
ঠান্ডা জল পড়তেই নস্যি-বাবুর হাঁচিটা মাঝপথে আটকে গেল। সে চোখ পিটপিট করে বলল, “আচ্ছো... নাঃ! এল না!”
ঠিক এই সুযোগে খোকন তার পকেটের বড় কাঁচিটা দিয়ে বাতাসে এক অদ্ভুত কোপ মারল। সেই কোপের টানে নস্যি-বাবুর হাত থেকে রুপোর চাবিটা ফসকে গিয়ে সোজা এসে পড়ল সৌমিকের হাতে।
চাবিটা হাতে আসতেই সৌমিক আর দেরি না করে সেটাকে তার পিতলের কম্পাসের মাঝখানের খাঁজে গুঁজে দিয়ে ডান দিকে একটা মোচড় দিল।
“ক্লিক!”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা এক তীব্র রূপোলি আলোয় ভেসে গেল। নস্যি-বাবুর প্রাসাদের সমস্ত ধোঁয়া নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। দেওয়ালের বয়ামগুলো থেকে মানুষের মিষ্টি সময়গুলো মুক্ত হয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে ছুটে চলল।
৪.
যখন আলোটা কমল, সৌমিক দেখল তারা আবার সেই মেঘ-বিলাস বুড়োর তাসের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়ো মেঘ-বিলাস তার মেঘের বালিশ থেকে জেগে উঠে মনের সুখে তামাক খাচ্ছেন। আর গ্যাঙর বাবু সৌমিকের পায়ের কাছে এসে তার জুতোয় মাথা ঘষছে—যেন সে খুব বাধ্য ছেলে!
“তোমাদের অনেক ধন্যবাদ, হে তরুণ দল!” মেঘ-বিলাস বুড়ো বললেন। “চাবিটা এবার আমি আমার বুকের পকেটে লুকিয়ে রাখব। আর এই ব্যাঙ বাবাজিকে একটা খাঁটি সোনার মেডেল দেওয়া উচিত, ও চোরের হাত কামড়ে ধরে চাবিটা আটকে রাখার চেষ্টা করেছিল।”
খুকু গ্যাঙর বাবুকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “মেডেল লাগবে না দাদু, ও যেন আর মেঘে বাসা না বাঁধে, সেই আক্কেল হলেই হবে।”
সৌমিক চাবিটা বুড়োর হাতে দিয়ে বলল, “আমাদের এবার ফিরতে হবে। দোকানের ঘড়িগুলো বোধহয় এতক্ষণে আবার পাগল হয়ে গেছে।”
খোকন সৌমিকের হাত ধরে বলল, “সৌমিক ভাই, সুকুমারপুরে যখনই ছন্দ কাটবে, আমরা কিন্তু তোমার কাছেই আসব।”
সৌমিক হাসল। “স্বাগতম। তবে এবার আসার সময় একটু ভালো মিষ্টি নিয়ে এসো, শুধু ব্যাঙ আর মেঘ নিয়ে এলে চলবে না!”
তারা আবার মেঘের ভেলায় চড়ে শহরের দিকে নামতে লাগল। সৌমিক যখন তার দোকানের দরজায় পৌঁছাল, তখন রাত বারোটা বাজছে। দেওয়াল ঘড়ির কোকিলটা এবার আর কুকুরের মতো ডাকল না। সে খুব সুন্দর করে মিষ্টি সুরে ডেকে উঠল—“কু-কূ! কু-কূ!”
সৌমিক চেয়ারটায় এসে বসল। তার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি। ঘড়ির কাঁটাগুলো এখন একদম ঠিকঠাক, নিজের ছন্দে টিকটিক করে চলেছে।