Posts

গল্প

স্যারের বাড়িতে জিন (জিন অথবা ভুতের গল্প, ২য় পর্ব)

January 24, 2026

ইহতেমাম ইলাহী

52
View

লেখকের সব লেখা পড়তে,
https://fictionfactory.org/contributor/4237

১। স্যারের বাড়িতে জিন

আলী স্যার। ছিলেন আমাদের গণিতের শিক্ষক। তার বাড়ি ছিল গ্রামের একটা নির্জন জায়গায়। ধান ক্ষেতের ঠিক মাঝামাঝি। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন বললে খুব একটা ভুল হবে না। আলী স্যার এবং তার কয়েক চাচার পরিবার মিলে একত্রে বসবাস। পাশে লম্বা লম্বা সুপারি গাছের বাগান। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। বহুদিন স্যারের বাসায় পড়তে গিয়েছি ছোট বয়সে। বাড়ির আশপাশ জুড়ে ছিল কাগজি লেবুগাছের ঝোপ। যে ঘরটায় স্যার আমাকে পড়াতেন তার পেছনের পুকুর পারে একটা সুবিশাল দারুচিনি গাছ। একটু দূরে বাঁশের ঝোপ। তাদের বাড়ির আবহ খুব একটা ভৌতিক বলা যায় না। তবে স্যারের এক চাচির ছিল ধবল রোগ। বৃদ্ধা মহিলা। যখন দেখতাম সাদা কালো ছোপ ছোপ শরীর, তখন চমকে যাওয়ার মত একটা অনুভুতি হত। স্যারের দাদি বেঁচে ছিলেন। অনেক বয়স হয়েছে। তার কী যেন রোগ হয়েছে। প্রায় এ নিয়ে কথা শুনতে পাই। তার নাকি মরমর অবস্থা। কিন্তু মরছেন না। আবার সুস্থ্যও হচ্ছেন না। অনেক ডাক্তার অষুধ করা হয়েছে কিন্তু তার অবস্থার উন্নতি নেই। বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট পাচ্ছেন শুধু শুধু। সব চিকিৎসা যখন করা হয়ে গেল তখন বাদ রইল কেবল জিন চিকিৎসা। আমি প্রায় ২০ বছর আগের কথা বলছি। তখন গ্রামের কারো রোগ না সারলে আত্মীয়দের কেউ কেউ জিন চিকিৎসার পরামর্শ দেবে না তা কখনো হয় নি। স্যারের দাদিকেও জিন দিয়ে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত হলো। তো জীন চিকিৎসা হবে কীভাবে? মানুষের মাঝে যেমন ডাক্তার থাকে। জিনদের মাঝেও তেমনই থাকার কথা। তবে চিকিৎসার ধরণ কেমন সে সম্পর্কে বলা মুশকিল। হয়ত গাছ গাছরার লতা-পাতা চিকিৎসা হতে পারে। সে যাই হোক, জিন ডাক্তার তো আর চেম্বার খুলে বসে থাকে না। যে তার চেম্বারে গেলেই তাকে পাওয়া যাবে। বরং তাকে আনতে হত ডেকে।  সবাই আবার তাদের ডাকতে পারে না। বিশেষ বিশেষ লোকই এই কাজ পারে। আমাদের এলাকায় এই বিশেষ শ্রেণির লোকদের বলা হত মাহান। শহরে এসে জানলাম তাদের কবিরাজ বলে। আমাদের এলাকায় বেশ কিছু কবিরাজ ছিল। এদের নাম—জহির মাহান, সাদেক মাহান, কাছুয়া মাহান ইত্যাদি। এখন ভাবি মাহান শব্দটা কি কোনোভাবে মহান শব্দ থেকে এসেছে কি না? এর উত্তর মনে হয় নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। মূল গল্পে যাই। 

গভীর এক রাতে সত্যিই আলী স্যারের বাড়িতে জিন ডাকা হল। আমার সন্দেহ ছিল যে, জিন ডাকার ব্যাপারটা আসলেই ঘটবে কি না। কারণ আমাদের আলী স্যার, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। চিন্তাভাবনায় কিছুটা প্রগতিশীল। তার বাড়িতে এসব হবে—এ নিয়ে বেশ সংশয় ছিল। তবে ঘটনা যে ঘটেছিল তা আমাকে জানাল মেরাজ চাচা। ঘটনার পরদিন রাতে (সম্ভবত)। বরাবরই ছোটদের কাছে এই  ব্যাপারগুলো গোপন রাখা হত। কিন্তু মেরাজ চাচা জিন ঘটিত ব্যাপার নিয়ে অতি মাত্রায় উৎসাহী থাকেন। ঘটনার সরাসরি সাক্ষী হতে ভালোবাসেন। সেই ঘটনা আবার ছোটদের কাছে বর্ণনা করে অন্তর তুষ্টি করেন। জিনঘটিত ঘটনা ঘটার সময় মানুষ হয়ত ভয়টাই বেশি পায়। কিন্তু পরদিন ঝকঝকে আলোয় তা নিয়ে অন্যের কাছে গল্প বলা ভিন্ন ব্যাপার। রোমাঞ্চকর সেই গল্প বলার যে আনন্দ তা সচরাচর পাওয়া দায়। তাই সুযোগ হাতছাড়া কেউ করে না। আমিও মেরাজ চাচার সেদিনের গল্প আপনাদের বলে এক ধরণের আনন্দ বোধ করছি। যেমন আনন্দ পেয়েছিলেন মেরাজ চাচা স্বয়ং। এবার গল্পটি মেরাজ চাচার কথনে লিখা যাক। 


“বুঝলা ইহতেমাম? মাহান আসছিল তিনজন। কালো কুটকুটা রাইত। তোমার আলী স্যারের আঙিনায় সবাই আমরা। মাহান তিনজন বেঞ্চে বসছে। আরও বসার জায়গা ছিল। বাড়ির লোকজন বসল। আমি আর তোমার আলী স্যার পেছনে দাঁড়ায় থাকলাম। দেখি কীভাবে কি হয়। কে একজন বলছিল, জিন নাকি সাদা ঘোড়ায় চড়ে আসে।
মাহান তিনজন মন্তর (মন্ত্র) পড়া শুরু করল। কি যে গরম পড়ছিল! সবার শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ছুটতেছে। আশপাশে কোনোকিছুর সাড়া শব্দ নাই। কোনো বাতাস নাই। আমাবস্যার রাইতের মতন কালো রাইত। ঘুটঘুটা অন্ধকার। মাহানরা বাতি জ্বালাতে নিষেধ করল। ইহতেমাম, এই যে! দেখো আমার গায়ের পশম দাঁড়ায় গেছে, দেখো দেখো।“

আমি চাচার হাত দেখলাম সত্যিই তার পশম দাঁড়িয়ে গেছে। ভয় ও রোমাঞ্চ আমাকেও স্পর্শ করল। আমি চাচার কাছে এগিয়ে বসলাম। দূরে থাকতে ভয় পাচ্ছিলাম। চাচা বলে যাচ্ছেন।
“দুইজন মাহান মন্ত্র পড়তেছে। খুব স্পিড। কি পড়ছে বোঝা যায় না। পড়েই যাচ্ছে। পড়েই যাচ্ছে। এক নিঃশ্বাসে। মনে হচ্ছে দম  বন্ধ হয়ে যাবে, তবু মন্ত্র ছাড়বে না। একজন মাহান মন্ত্র পড়া বন্ধ করল। অন্যরা চালিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম সাদেক মাহান পড়া বন্ধ করেছে। সে হঠাৎ এমন চিৎকার দিয়ে উঠল!  বাড়ির মহিলা পুরুষ সবাই আঁতকে উঠল। হায় হায়। ঘরের ভেতর মহিলাদের আর্তনাদ শোনা গেল। চিৎকারের পরেই সাদেক মাহান শুরু করল, জিনের নাম ধরে ডাকাডাকি। জিনের নাম বহর।
আয়রে বহর আয়। দোহাই লাগে তোর, আয়। আয়রে বহর আয়। 
মন্ত্র পড়ার শব্দ আর জিন ডাকার আওয়াজ মিলে অদ্ভুত গানের মত আওয়াজ হতে লাগল। মনে হচ্ছে চারদিক ভয় ছড়ায় দেয়া হচ্ছে। ভয়ে আমাদের গায়ের পশম তো পশম মাথার চুল পর্যন্ত থরথরে খাড়া হয়ে গেছিল। তোমার আলী স্যার আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে, চাচাজি! আমি বলি, ভয় পাইস না রে! খাড়ায় থাক। আর মেজাজটাও হচ্ছিল খারাপ। পাজি মাহান পড়তেছে কুফরি কালাম। সব দেবদেবির নামে কি কি বলতেছে। সাদেক মাহান তো উন্মাদের মত ডাকতেছেঃ
আয়রে বহর আয়
এই ডাক ফেলতে পারবি না রে, আয়
আয়রে বহর আয়।
আয় আয় আসি পড়, আয়
ওরে বহর আয়।
দোহাই লাগে আয়।“

মেরাজ চাচা হাঁফ ছাড়লেন। শ্বাস নিচ্ছেন। এদিকে তখন আমি এত ভয় পেয়ে গেছি যে চাচার হাত শক্ত করে চেপে ধরে আছি। চাচা আবার শুরু করলেন। 

“শা*রা কুফরি কালাম পড়তেছে দেখে মনটায় চাচ্ছিল পিছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেই।  কিন্তু সেই সাহস তখন নাই। মন্ত্রের গান চলতেই আছে। থামাথামি নাই। হঠাৎ দেখি তোমার আলী স্যার কাঁপতেছে। তার কাঁধ চেপে ধরে দাড়ালাম। বিরক্তও লাগতেছিল। কখন জিন আসবে? আর এদের কুফরি কালামে ভরা মন্ত্রের কারণে মনটা তিতা হয়ে গেছে। মনে মনে তাওবা করতেছি, আল্লাহ আর এগুলাতে আসব না।  
এমন সময় শুনি পাশের বাঁশ ঝাড়ে শো শো শো শো বাতাসের আওয়াজ! 
ভয়ংকর আওয়াজ। কালবৈশাখী ঝড় যেমন। বাঁশের আগা পাগলের মত একটার সাথে আরেকটা বারি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো মাতাল দৈত্য মাতলামি করতেছে। ভয়ে আমার শরীর ঝিম ধরে গেছে। তোমার আলী স্যার কাঁপতেছে। আমাকে শক্ত করে ধরছে। 
মাহানরা হঠাৎ মন্ত্র পড়া থামিয়ে দিল। সাদেক মাহান চিৎকার দিয়ে বলল, থামরে বহর থাম। থাম। দোহাই তোর থাম। 
কিন্তু বহর মনে হয় থামল না। কেবল জায়গা বদল করল।  কারণ বাঁশঝাড়ের উন্মাদ বাতাস আর দুলুনি এসে ভর করল আমাদের পাশের আমগাছটায়। আমরা আঁতকে প্রায় লাফ দিয়ে উঠলাম। গাছ মনে হয় ভেঙে পড়বে আমাদের মাথায়। এত দুলতেছে। ভয়ে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শক্ত পাথর হয়ে গেছি। সাদেক মাহান চিৎকার দিল, থামরে থাম। অন্য দুজন আবার মন্ত্র পড়া শুরু করল। আম গাছ দৈত্যের মাতলামি সহ্য করতে পারবে নাকি ভেঙ্গে পড়বে, বোঝা যাচ্ছিল না। 
মিনিট ২-৩ হবে। উন্মাদনা বন্ধ হলো না। এরপরে খেয়াল করলাম ধীরে ধীরে আম গাছের দুলুনি কমে যাচ্ছে।  
আম গাছ শান্ত হলো। সাদেক মাহান কথা বলা শুরু করল বহরের সাথে। 
আমার শরীর, শার্ট, লুঙ্গি ততক্ষণে ভিজে ঘাম দিয়ে গোসল করার অবস্থা। আলী পাথরের মত সোজা হয়ে দাঁড়ায় আছে। আমার হাত ধরছে শক্ত করে।“

গল্পের এই পর্যায়ে মেরাজ চাচা একটু থামলেন। তিনি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আমি খেয়াল করলাম, কখন যেন চাচাকে জড়িয়ে ধরেছি। চাচা বললেন, ছাড়ো দেখি। শ্বাস নিতে দেও। ভয় নাই ইন শা আল্লাহ। বললাম, এরপরে কী হলো ?  

‘এরপর নানান অষুধ পাতি দিল। কি তাবিয কবয করতে বলল। বহর জিনকে প্রথম যেমন উন্মাদ দৈত্য মনে হয়েছিল। কথা শুনে তেমন মনে হলো না। তার কন্ঠ কেমন স্যাঁতস্যাতে। কিন্তু উগ্র। দেমাগী। 
আলীর দাদীর ব্যাপারে অনেক কথা হলো। কথাবার্তা শেষ হলে সাদেক মাহান আমাকে ডাক দিল। “ওয় (ওহে) মেরাজ, বহরক (বহরকে) কিছু পুছিবার (জিজ্ঞেস করার) থাকিলে পুছ।“ বুঝতে পারছি না। আমি আবার কি জিজ্ঞাসা করব?
গলা কোনোমত পরিস্কার করে বললাম, আপনে জিন না কি তা বুঝি কেমনে? আসলেই জিন হয়া থাকলে আমাকে তার নমুনা দেবেন। 
বহরের কন্ঠ শোনা গেল। স্যাঁতস্যাঁতে কন্ঠ। “যা নমুনা পাবি।“
রাইত তখন ৩ টা। ভাবলাম আর না। বাড়ি চলে যাই। আমি বাড়ি চলে আসলাম দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে। বাড়ি এসে দেখি নারিকেল গাছটার একটা কাঁচা ঢোনা (ডাল) ভেঙ্গে পড়ে আছে। আমের গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে আছে। অথচ কোথাও কোনো ঝড় বাতাস নাই। এত রাতে কেউ গাছেও উঠবে না। বুঝলাম, জিন নমুনা দিয়া গেছে। ইহতেমাম, কাল সকালে তোমাকে গাছের ভাঙ্গা ডাল দেখাবো। হা হা।“

মেরাজ চাচা আমাকে পরদিন নারিকেল গাছের ভাঙা ঢোনা আর আম গাছের ডাল দেখালেন। আমি খুবই আশ্চর্য্য হলাম।এখন ভাবি, জিন জাতি কি বিশেষভাবে গাছের ডাল ভেঙ্গে নমুনা দিতে পছন্দ করে কি না। কারণ, গাছের ডাল ভেঙ্গে নমুনা দেয়ার ব্যাপারে অনেক পরে আমার সাথে সরাসরি একটা ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে একটা গল্পে লিখেছিলাম। আমার খুবই প্রিয় । অন্য একটি গল্প সংকলনে রয়েছে। এখানেও দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পটার নাম সুদর্শন। 




                                            একজন সুদর্শন



(ইন শা আল্লাহ চলবে)

গল্পঃ এমপি সাহেব


https://fictionfactory.org/posts/15187


গল্পঃ ওয়াজ মাহফিল
https://fictionfactory.org/posts/13774

গল্পঃ ঠান্ডা স্নায়ু

https://fictionfactory.org/posts/13777

গল্পঃ সবচেয়ে বড় শত্রু
https://fictionfactory.org/posts/13790

গল্পঃ তরুন অভিনেতা
https://fictionfactory.org/posts/13991

গল্পঃ সাইকেলে জিনের হানা
https://fictionfactory.org/posts/16080

উপন্যাসঃ চোখের তারায় জোনাকির আলো (সব পর্ব)
https://fictionfactory.org/posts/15960


গল্পঃ একজন সুদর্শন


https://fictionfactory.org/posts/15934


 

লেখকের সব লেখা পড়তে,
https://fictionfactory.org/contributor/4237
 
 

Comments

    Please login to post comment. Login