Story

সুন্দরবনের রাত

September 29, 2026

10 views


Written By Asadullah Galib Al Sadi

সন্ধ্যার পর সুন্দরবনকে আমি যতবার দেখেছি, প্রতিবারই মনে হয়েছে এই বন দিনের চেয়ে রাতে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। আমি সাংবাদিক আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি। সেদিন স্ত্রী জেনিয়া জয়ার সঙ্গে একটি বিশেষ প্রতিবেদন করতে সুন্দরবনের ভেতরে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল নদীর ভেতরের একটি পুরোনো বনরক্ষী ক্যাম্প নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। স্থানীয় কয়েকজন বলেছিল, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত ওই ক্যাম্পে মাঝরাতে নাকি আলো জ্বলে। বিষয়টি আমার সাংবাদিকসুলভ কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আমাদের ট্রলারটি সরু একটি খালের পাশে নোঙর করল। চারপাশে শুধু অন্ধকার। মাঝে মাঝে পানির শব্দ আর দূরের কোনো অচেনা প্রাণীর ডাক শোনা যাচ্ছিল।

জেনিয়া ধীরে বলল, এত রাতে এখানে আসাটা কি সত্যিই দরকার ছিল?

আমি হেসে বললাম, খবরের পেছনে কখনো কখনো খবরের চেয়েও বেশি কিছু লুকিয়ে থাকে।

কথা শেষ হওয়ার আগেই দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

আলোটি ঠিক সেই পরিত্যক্ত ক্যাম্পের দিকেই।

আমরা টর্চ হাতে নেমে পড়লাম। কাদার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাম্পের কাছে পৌঁছালাম। দরজাটি ভাঙা। ভেতরে বহু বছরের ধুলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মেঝেতে একেবারে নতুন জুতার ছাপ।

জেনিয়া আমার হাত ধরে বলল, এখানে কেউ আসে।

ঠিক তখনই বাইরে শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ হলো।

আমরা আলো নিভিয়ে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে গেলাম।

কয়েক সেকেন্ড পর দুজন মানুষ ক্যাম্পের সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের হাতে বড় ব্যাগ। তারা নিচু স্বরে কথা বলছিল। আমি মোবাইলের ক্যামেরা চালু করে রেকর্ড করতে শুরু করলাম।

কথোপকথন থেকে বুঝলাম, সুন্দরবনের একটি নির্জন খাল ব্যবহার করে তারা অবৈধভাবে কিছু পাচার করছে। পুরোনো ক্যাম্পটি তাদের অস্থায়ী ঘাঁটি।

হঠাৎ জেনিয়ার পা একটি পুরোনো টিনের টুকরোয় লেগে শব্দ হলো।

লোক দুজন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।

আমরা দৌড় দিলাম।

সামনে ঘন গাছপালা, পেছনে মানুষের চিৎকার। অন্ধকারে দৌড়াতে গিয়ে একসময় আমি পথ হারিয়ে ফেললাম। জেনিয়ার হাত শক্ত করে ধরে এগোতে থাকলাম।

কিছুক্ষণ পর সামনে নদীর পানি দেখা গেল।

কিন্তু সেখানে আমাদের ট্রলার নেই।

জেনিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, এখন কী হবে?

আমি মোবাইল বের করলাম। নেটওয়ার্ক নেই।

ঠিক তখন দূরে একটি ছোট আলো দেখা গেল।

আমরা চিৎকার করলাম।

আলোটি ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। সেটি ছিল বন বিভাগের একটি টহল নৌকা। স্থানীয় একজন আমাদের অবস্থান বুঝতে পেরেছিল, কারণ ট্রলারে থাকা আমাদের নাবিক আগেই সন্দেহের কথা জানিয়েছিল।

পরদিন ঢাকায় ফিরে সেই ভিডিও ও তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দিলাম।

কয়েক সপ্তাহ পর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো।

কিন্তু সুন্দরবনের সেই রাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল অন্য কিছু। জঙ্গল কখনো শুধু গাছ আর নদীর সমষ্টি নয়। সেখানে প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের তৈরি অন্ধকারও থাকে। আর একজন সাংবাদিকের কাজ কখনো শুধু সেই অন্ধকারের দিকে তাকানো নয়, প্রয়োজনে তার ভেতরে ঢুকে সত্যিটা খুঁজে বের করা।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login