একটি গল্প কিছু মানুষের, কিছু অপেক্ষার, আর সারাজীবন আলো জ্বালিয়ে রাখা এক নিঃসঙ্গ বাতিঘরের।
সমুদ্র তীরে জনবসতি থেকে দূরে একটা পুরোনো বাতিঘর। চারদিকে শুধু অথৈ জল। দিনের আলোয় তাকে খুব সাধারণ মনে হয়। রাত নামলেই মাথার ওপরের বিশাল আলোটা ঘুরতে শুরু করে। যেন সমুদ্রের গভীরে যেকোনো দিক থেকে দেখা যেতে পারে। ঝড় তুফানে সমুদ্র উত্তাল থাকলেও সে আলো পৌঁছে যায় পথ হারানো জাহাজ অব্দি। উত্তাল ঢেউয়ে দিশেহারা নাবিকেরা এই আলো দেখেই তার আলোয় নিরাপদে বন্দরে ফিরে। কতো শত জাহাজ এই আলোর সুবিধা নিয়েছে তার হিসাব বাতিঘর নিজেও জানে না।
বাতিঘরের দায়িত্বে আছেন মুহসীন আলী। বয়স আটষট্টি। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি এই বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখছেন।
তার জীবনটা বড় অদ্ভুত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আলো জ্বালান, রাতভর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন, ভোর হলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করেন। তারপর আবার সন্ধ্যার অপেক্ষা। এই করেই একা বাতিঘরের সঙ্গী হয়ে জীবন প্রায় শেষ দিকে এখন তার।
মুহসীনের জীবনে দিন-রাতের পার্থক্য আছে, ঋতু পরিবর্তন আছে, ঝড়-বৃষ্টি আছে, শুধু নিজের জন্য আলাদা কোনো সময় নেই।
কেউ কোনোদিন মুহসীনকে জিজ্ঞেস করেনি, এতো রাত জেগে থাকতে তার কষ্ট হয় কি না। কেউ জানতে চায়নি, সারারাত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার কখনো একঘেয়েমি লাগে কি না।
সবাই শুধু তার আলোটুকু নিয়েছে। তার বদৌলতে তীরে ফেরায় তার অবদান নিয়ে কথা বলেননি।
মুহসীনও কখনো কাউকে কিছু বলেননি।
কারণ তিনি জানেন, বাতিঘরের কাজ আলো দেওয়া। নিজের অন্ধকারের গল্প শোনানো নয়।
১.
বাতিঘরের ছোট্ট ঘরটিতে একটা পুরোনো ট্রাংক আছে। ট্রাংকের ভেতর কিছু চিঠি, একটা মেয়ের চুলের ফিতা, আর ছোট্ট ফ্রেমে বাঁধাই করা রং জ্বলে যাওয়া তিনজনের একটা পারিবারিক ছবি।
ছবিতে মুহসীন আলী, তার স্ত্রী মার্জিয়া এবং তাঁদের ছোট্ট মেয়ে টুনি।
মুহসীন প্রতিদিন ছবিটা বের করে দেখেন। ছবির দিকে তাকালে তার মনে পড়ে বহু বছর আগের একটা বিকেল।
ছোট্ট টুনি বাবার কোলে বসে সমুদ্র দেখছিল আর বলছিলো, “বাবা, তুমি প্রতিদিন রাতে ওখানে কেনো থাকো?”
মুহসীন উত্তর দিলেন “মা আমার, সমুদ্রে দিনে-রাতে অনেক জাহাজ চলে।রাতে তারা অনেকেই পথ হারিয়ে ফেলে। আমি আলো জ্বালিয়ে রাখি, যাতে তারা ঠিকমতো বাড়ি ফিরতে পারে।
টুনিঃ তাহলে তুমি আমাদের বাড়ি ফিরবে কখন?
মুহসীন একটু হেসে বলেছিলেন, “কালই ফিরব মা।”
টুনিঃ প্রমিজ?
মুহসীনঃ প্রমিজ।
টুনি বাবার গলা জড়িয়ে ধরেছিল। সেদিন মুহসীন জানতেন না, জীবনের কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষ চাইলেও রাখতে পারে না।
কয়েক মাস পর এক ভয়ংকর ঝড়ে সমুদ্রতীরের গ্রামটিতে সব ওলট পালট হয়ে যায়। মার্জিয়া আর টুনিকে নিয়ে একটি নৌকা গ্রামের অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয়।
সেই রাতে মুহসীন বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। একটার পর একটা জাহাজকে নিরাপদ পথ দেখিয়েছিলেন। সকালে খবর এলো, কয়েকটি জাহাজের যাত্রী ও ক্রুরা প্রাণে বেঁচেছে। কিন্তু মার্জিয়া আর টুনির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তারপর বেশ অনেক বছর কেটে গেছে।
মুহসীন আজও প্রতিদিন সন্ধ্যায় আলো জ্বালান। হয়তো অভ্যাসে অথবা দায়িত্বে কিংবা সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায়।
২.
সেই রাতটা ছিল খুবই ভয়াবহ।
উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। ঢেউ আর বাতাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় বাতিঘরের পুরোনো দেয়াল কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঠিক সেই সময় সমুদ্রের কয়েক কিলোমিটার গভীরে একটা যাত্রীবাহী জাহাজ পথ হারিয়ে ফেলল। জাহাজের ক্যাপ্টেন জহির বারবার রাডার চেক করছিলেন।
ক্যাপ্টেন জহিরঃ রাডারের সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না! সবাই সাবধান থাকুন।
একজন নাবিক চিৎকার করে উঠল, “স্যার, চারদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না!” বলতে বলতেই দূরে বাতিঘরের আলো দেখা গেল।
নাবিকঃ স্যার! লাইটহাউজ! আলো দেখা যাচ্ছে!
ক্যাপ্টেন জহিরঃ ওই আলোর দিকে যাও। সবাই শক্ত হয়ে ধরো!
অন্যদিকে বাতিঘরের ভেতরে মুহসীন আলী যন্ত্রপাতি, নিজের জিনিসপত্র ও ট্রাংক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আলোটা একবার নিভে যাওয়ার উপক্রম হলো। মুহসীন আতঙ্কিত হয়ে যন্ত্রের কাছে ছুটে গেলেন। কাঁপা হাতে, ভেজা গায়ে তিনি আবার আলোটা সচল করলেন।
বাতিঘরের আলো অনুসরণ করে জাহাজটি নিরাপদে তীরে পৌঁছাল। জাহাজের সবাই আনন্দে চিৎকার করল। ক্যাপ্টেন জহির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অথচ বাতিঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা মুহসীন শুধু মৃদু হাসলেন আর মনে মনে বললেন “যাক, আজও কারও বাড়ি ফেরা হলো”।
নিজের ঘরে ফিরে গেলেন।
টেবিলের ওপর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক প্লেট ভাত ছিলো মুহসীনের অপেক্ষায়।
৩.
রোজকার মতো পরদিন বিকেলে মুহসীনের সঙ্গে দেখা করতে এলেন আটাশ বছর বয়সী তরুণ নাবিক লাবিব। সমুদ্রের সঙ্গে তার পরিচয় নতুন, কিন্তু জীবনের সঙ্গে লড়াইটা প্রায় ছোটকাল থেকেই।
লাবিবঃ চাচা, আপনি কত বছর ধরে এখানে আছেন?
মুহসীনঃ তা প্রায় চল্লিশ বছর হবে।
লাবিবঃ একা থাকতে কেমন লাগে?
মুহসীনঃ ভালোই লাগে। অভ্যাস হয়ে গেছে তো।
লাবিব একটু হেসে বলল, “আপনার পরিবার?”
মুহসীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আছে, ঐ আকাশের তারা হয়ে। এখান থেকেই দেখা হয় মাঝে মাঝে।”
লাবিব আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না।
কিছুক্ষণ পর দুজন বাতিঘরের বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখছিলেন।
লাবিবঃ চাচা, আপনার কখনো ইচ্ছে করে না এসব ছেড়ে কোথাও চলে যেতে?
মুহসীনঃ ইচ্ছে তো করে বাবা। খুব করে।
লাবিবঃ তাহলে যান না কেন?
মুহসীনঃ হাহ হাহ হাহ, সবাই যদি চলে যায়, তাহলে পথ হারানোদের আলো দেখাবে কে?
লাবিব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “কিন্তু আপনার পথ হারিয়ে গেলে?”
মুহসীনের মুখের হাসিটা থেমে গেল। তিনি অনেকক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “আমার পথ হারানোর খবর রাখার মতো আর কেউ নেই রে বাবা।”
লাবিব আর কোনো কথা বলতে পারল না।
মনে হয় প্রথমবার সে বুঝতে পারছিলো, একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে নিজের নিঃসঙ্গতাকেও এতো স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারে।
৪.
সন্ধ্যায় নিজের ঘরে ফিরে মুহসীন পুরোনো ফোনটা হাতে নিলেন।
কন্টাক্ট লিস্টে টুনির নাম।
অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের নামটা তিনি এখনো মুছতে পারেননি। টুনির নম্বরটাও বদলে গেছে বহুবার। তবু পুরোনো নম্বরটা ফোনে রেখে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকেন। সেদিনও তাই করছিলেন।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। কাজের বাইরে অনেকদিন পর অচেনা একটা নম্বর থেকে ফোন।
কিসব এদিক সেদিক ভেবে বেশি সময় নষ্ট না করে মুহসীন তাড়াতাড়ি ফোন ধরলেন।
ওপাশ থেকে একজন মহিলা বললেন, “আপনি কি মুহসীন আলী সাহেব বলছেন?”
মুহসীনঃ জি, বলছি।
মহিলাঃ আমি টুনির বান্ধবী বলছি। টুনি অনেক দিন ধরে আপনাকে খুঁজছে।
মুহসীনের হাত কেঁপে উঠল। চোখে ছলছল অবস্থায় কাঁপা গলায় বললেন, “টুনি! আমার মেয়ে টুনি?”
মহিলাঃ জি। তবে…
মুহসীনঃ তবে?
মহিলাঃ তবে, ও এখন আর নেই।
মুহসীন যেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। এতোদিন পর টুনির খবর দিতে কেউ একজন ফোন দিয়েছে। কিন্তু সে কি শোনালো আমাকে?
মহিলা জানালেন, টুনি অনেক বছর বেঁচে ছিল। অন্য জায়গায় সংসার করেছিল। শেষ জীবনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঠিকানা আর যোগাযোগের সূত্র খুঁজে না পাওয়ায় সম্ভব হয়নি।
মুহসীনের হাতে ফোনটা তখনো ধরা। হাত কাঁপছে…
শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলেন, “আমার টুনি কি জানত, আমি যে রোজ ওর জন্য অপেক্ষা করি?”
ওপাশে নীরবতা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিলা জানালেন, “টুনি শেষদিকে প্রায়ই বলত, ছোটবেলায় বাবা বলেছিল একদিন বাড়ি ফিরবে।”
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মুহসীনের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
সেদিনও যথারীতি বাতিঘরের আলো জ্বলেছিল।
এদিকে তার ভেতরে জীবন্ত একটা মানুষের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল।
৫.
কয়েক দিন পর মুহসীন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সমুদ্রের হাওয়া বাতাস আর জলের প্রভাবে ঠান্ডা জনিত, শ্বাসকষ্ট সহ বিভিন্ন সমস্যা দেলহা দিয়েছে শরীরে। আগের মতো বল নেই গায়ে। হাঁটতে কষ্ট হয়। তবু সন্ধ্যা হলে তিনি উঠে বসেন।
লাবিব সেদিন বাতিঘরে এসে দেখল, মুহসীন বিছানায় শুয়ে আছেন। কাশতে কাশতে বিছানা থেকে পড়ে যাবার অবস্থা। বিছানায় উঠিয়ে দিয়ে গায়ে কাঁথা দিয়ে লাবিব বললো, “চাচা, আজ আমি আলো জ্বালিয়ে দিয়েছি। আপনি চিন্তা করবেন না।”
মুহসীনঃ ভালো করেছ বাবা। আমি যেতে চাইছিলাম, কিন্তু ওঠার শক্তি পাইনি বলে জ্বালাতে পারিনি।
লাবিবঃ আপনার শরীরটা একটু ভালো হলে আপনাকে শহরে নিয়ে যাব।
মুহসীন মৃদু হাসলেন।
মুহসীনঃ শহরে গিয়ে কী হবে?
লাবিবঃ আপনার চিকিৎসা হবে। একটু ঘুরবেন। মানুষের সঙ্গে থাকবেন। আপনাকে নদী দেখাবো।
মুহসীনঃ নদী? অনেকদিন সমুদ্র ছাড়া কিছুই দেখিনি।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
মুহসীনঃ জানো লাবিব, আমার মেয়েটা ছোটবেলায় আমাকে একটা প্রশ্ন করত।
লাবিবঃ কী প্রশ্ন?
মুহসীনঃ বলত, বাবা, তুমি সবাইকে বাড়ি ফিরিয়ে দাও, তুমি নিজে ফিরবে কবে?
লাবিবঃ আপনি তো ফিরতে পারতেন চাচা।
মুহসীন জানালার বাইরে তাকালেন।
মুহসীনঃ পারতাম। কিন্তু সব সময় ভেবেছি, আজ যদি আলো না জ্বালাই, কোনো জাহাজ হয়তো পথ হারাবে। শুধু আমার জ্বালানো আলোর অভাবে সেই জাহাজের তীরে না পৌঁছায়? সেই করতে করতে, জাহাজকে আলো দেখাতে দেখাতে একদিন নিজের বাড়ির পথটাই হারিয়ে ফেললাম।
লাবিবের চোখ ভিজে উঠল। লাবিব মুহসীনের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “চাচা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আছি।”
মুহসীন চোখ বন্ধ করলেন। অনেক দিন পর কেউ তাকে বলল, "আমি আছি।"
তিনি খুব আস্তে বললেন, “অনেক বছর পর কেউ আমার জন্য এই কথাটা বলল বাবা।”
সেদিন রাতে মুহসীন আর কোনো কথা বলতে পারেন নি। কাশি থেমে গিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি চলে গেলেন অনন্তলোকে।
৬.
মুহসীনের মৃত্যুর পর বাতিঘরের দায়িত্ব নিল লাবিব। একদিন ঘর গোছাতে গিয়ে মুহসীনের সেই পুরোনো ট্রাংকে একটা ডায়েরি পেল। ডায়েরির শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা কিছু কথা।
লাবিব পড়তে শুরু করল।
"আজও একটা জাহাজকে পথ দেখালাম। শুনলাম, সবাই নিরাপদে তীরে পৌঁছেছে। ভালো লাগল। কিন্তু আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে, আমার জন্য কেউ কি কখনো অপেক্ষা করেছে? আমারও তো একটা ঘর ছিল। একটা মানুষ ছিল। একটা ছোট্ট টুনি ছিল, যে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকত। আমি সবাইকে বলেছি, আলো দেখে বাড়ি ফিরে যাও। কিন্তু নিজের মেয়েটাকে কোনোদিন বলতে পারিনি, বাবা তোমার কাছে আসছে মা।
জীবনে অনেক জাহাজকে তীরে পৌঁছে দিয়েছি। শুধু নিজের জীবনের জাহাজটাই কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমি জানি না, বাতিঘরের আলো নিভে গেলে সমুদ্র কতটা অন্ধকার হয়। তবে এটুকু জানি, একজন মানুষের আলো নিভে গেলে তার ভেতরের পৃথিবীটা কতটা অন্ধকার হয়ে যায়, সেটা কেউ দেখে না।
আমার কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একটা ইচ্ছে ছিল, জীবনের শেষ দিনটায় কেউ একজন এসে বলুক, “মুহসীন সাহেব, অনেক তো আলো জ্বালালেন। এবার একটু বিশ্রাম নিন।"
লাবিব ডায়েরিটা বন্ধ করল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাতিঘরের আলো জ্বালানোর আগে সে অনেকক্ষণ মুহসীনের পুরোনো চেয়ারে বসে ছিল। পেছনে টেবিলে ফ্রেমে বাঁধাই করা মুহসীনের পারিবারিক ছবি।
৭.
সমুদ্রের বুকে আজও বাতিঘরটা ঠায় দাঁড়িয়ে।
রাত নামলে একই নিয়মে তার আলো জ্বলে ওঠে। জাহাজগুলো সেই আলো দেখে একইভাবে পথ খুঁজে নেয়। কেউ নিরাপদে তীরে ফেরে, কেউ নতুন কোনো গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।
বাতিঘরে মুহসীনের জায়গায় এখন লাবিব। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে আলো জ্বালায়।
তবে একটা কাজ সে কখনো ভুলে না।
আলো জ্বালানোর আগে মুহসীনের পুরোনো ছবিটার সামনে দাঁড়ায় যেখানে মুহসীনের পাশে মার্জিয়া আর ছোট্ট টুনি।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে বলে, “চাচা, আজও অনেকগুলো জাহাজ তীরে ফিরেছে। আপনি নিশ্চয়ই দেখছেন।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। হয়তো ভাবে, এই পৃথিবীতে কত মানুষ আছে, যারা অন্যের জীবনে আলো জ্বালিয়ে নিজের জীবনটাকে অন্ধকারে রেখে দেয়।
আমাদের বাবা হয়তো তেমনই একজন।
আমাদের মা হয়তো তেমনই একজন।
আমাদের খুব কাছের কোনো মানুষও হয়তো তেমনই।
আমরা তাঁদের কাছে যাই প্রয়োজন নিয়ে। বিপদে পড়লে তাঁদের খুঁজি। সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তাঁদের পরামর্শ চাই। মন খারাপ হলে তাঁদের কাছে আশ্রয় নিই। কিন্তু শেষ কবে তাঁদের কাছে গিয়ে বলেছি, “তোমার মনটা ভালো আছে তো?”
শেষ কবে তাঁদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে শুধু মানুষ হিসেবে একটু ভালোবাসতে চেয়েছি?
যে মানুষটা সবসময় বলে, "চিন্তা করো না, আমি আছি", তারও যে একদিন খুব বলতে ইচ্ছে করে, "একটু আমার পাশে থেকো" সেটা কি আমরা বুঝতে পারি?
হয়তো পারি না।
কারণ আমরা তাদের আলো দেখতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাই যে, ভেতরের অন্ধকারটা আর চোখে পড়ে না।
আর এভাবেই একদিন কোনো এক বাতিঘরের আলো নিভে যায়। সমুদ্রের জাহাজগুলো হয়তো তখনো পথ খুঁজে পায়। পৃথিবীর কাজকর্মও থেমে থাকে না। শুধু একটা মানুষ চিরদিনের মতো অপেক্ষা করা বন্ধ করে দেয়।
জীবনে বাতিঘর হয়ে ওঠা বিরাট ব্যাপার। শুধু মনে রাখবেন, যে মানুষটা সারাজীবন অন্যকে পথ দেখায়, তারও একদিন পথ হারাতে পারে। তারও বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে। তারও কারও হাত ধরে একটু পথ চলতে ইচ্ছে করে।
তাই আপনার জীবনে যদি এমন কোনো মানুষ থাকে, যে সবসময় আপনার জন্য আলো জ্বালিয়ে রাখে, একদিন তার কাছে গিয়ে বসুন। তার কোনো সমস্যা সমাধান করতে হবে না। কোনো উপদেশও দিতে হবে না।
শুধু একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করুন, "তুমি কেমন আছো? সত্যি করে বলো, তুমি কেমন আছো?"
হয়তো এই সামান্য প্রশ্নটার জন্যই সে অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করছে।
আর সম্ভব হলে তার হাতটা ধরে বলুন, "অনেক তো অন্যদের বাড়ি ফেরার পথ দেখালে। এবার চলো, তোমাকে একটু তোমার নিজের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।"
কারণ দিনশেষে একটা কথাই সত্যি, বাতিঘর শুধু আলো দেওয়ার জন্য তৈরি হয় না। যে আলো জ্বালিয়ে রাখে, তারও আলোয় বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে।
“একটু খোঁজ নিয়েন”
সমাপ্ত।