Posts

উপন্যাস

চোখের তারায় জোনাকির আলো (৯ম পর্ব)

January 27, 2026

ইহতেমাম ইলাহী

45
View

                                                                 (১০) (নতুন পাতা)


অনেক কাজ থাকলে, পরিশ্রম হলে সময় যেন ধীরগতির হয়ে যায়। সময় আগাতে চায় না, কাজ ফুরাতে চায় না। কিন্তু, হাসান আশ্চর্য্য হয়ে ভাবছে ৭-৮ দিন  কীভাবে এত দ্রুত চলে গেল? অবশ্য তার এই আশ্চর্য ভাব চেহারায় ফুটে উঠবে এমন অবস্থাও নেই।  তার শরীর প্রায় অবশ হয়ে আছে। আরেকজন অবসন্ন হয়ে বাসের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছে। জহির। হাসান জহিরের ঘুমানোর দৃশ্য দেখছে। প্রীতিকর দৃশ্য বলা যাবে না। জহির ঘুমাচ্ছে মুখ হা করে। অতিরিক্ত ক্লান্তিতে মানুষ মুখ হা করে ঘুমায়। তাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আসতে হয়েছে। এখন বাস ডেমরা যেতে আধা ঘন্টা বা ২৫ মিনিট সময় নিতে পারে । রাত প্রায় দশটা বেজে গেছে। হাসান ডেমরায় নেমে পড়বে। জহির সাইনবোর্ড হয়ে চাঁনখারপুলে যাবে। দুজনের শরীর এমন অবসন্ন! বাস থামলেও মনে হয় নামতে ইচ্ছে করবে না। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। তাদের উপর দিয়ে কয়েকদিনের একটা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে বলা চলে।  এই ঘুর্ণিঝড় ক্যামেরাবন্দিও হয়েছে। প্রোগ্রাম ভিডিও করার কথা ছিল না। কিন্তু আতহার স্যার এত অসুস্থ্য! যেতে পারলেন না। প্রোগ্রাম ভিডিও করাতে বললেন। পরে দেখতে চান তিনি। বাসের মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল, একদিনে কত রোগী দেখলেন, ভাই? 
ভদ্রলোককে কিছুক্ষণ আগে বলা হয়েছে মেডিকেল ক্যাম্পের কথা। তিনি আরও জানতে আগ্রহী। হাসানের কথা বলার শক্তি নেই। আর সে বুঝতে পারছে না– ভদ্রলোক তাকে ভাই বলছে কেন? বাবা অথবা আংকেল বললে মানাত। হাসান উত্তর দিল, ১ দিন না ক্যাম্প ২ দিন ছিল, আলহামদুলিল্লাহ। 
      ‘রোগী কতজন?’
      ‘প্রত্যাশা করা হয়েছিল রোগী ১০০০ জন হতে পারে । কিন্তু মানুষ কম এসেছে তুলনামূলক। হিসাব অনুযায়ী ৭১৪ জন রোগীর সেবা দেয়া হয়েছে ২ দিনে।’ 
      ‘আচ্ছা ভালো, ভালো। আপনারা কতজন ছিলেন?’
  ‘ডাক্তার ছিলেন ৯ জন। ডাক্তারের সহযোগী ও ওষুধ বিতরণকারী ২২ জন। বাবুর্চি, ডেকোরেশন, সেচ্ছাসেবী মিলে আরও ১২ জন্য। প্রায় ৪৫ জনের দল।’
    ‘সুবহানাল্লাহ। অনেক মানুষ। সবাই ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন? বিরাট খরচের ব্যাপার ভাই!’
      ‘না, না। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট, ভলান্টিয়ারদের অধিকাংশই স্থানীয়।’
    ‘আচ্ছা, আপনি অনেক ক্লান্ত। গলার স্বর শুনে বোঝা যাচ্ছে। সরি, কথা বলে কষ্ট দিলাম।’
    ‘না না, ঠিক আছে, চাচা।’ 
হাসান ভুলে চাচা বলে ফেলল। ভদ্রলোক ডাকছিল ভাই। যাই হোক, কী আর করার। কথা বার্তায় জহির জেগে গেছে। আড়মোড়া ভাঙল। তার হাতের কনুই দিয়ে হাসানের মাথায় আঘাত লেগে গেল। 
      ‘সরি, সরি হাসান।’
      ‘ঠিক আছে সমস্যা নাই। ঘুম ভালো হয়েছে?’
      ‘মনে তো হয়।’
জহিরের চোখ মুখ হাসি হাসি। হাসান বলল, কিরে তোকে আনন্দিত লাগছে হঠাৎ? ব্যাপার কী? 
      ‘সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম বন্ধু!’
      ‘হা হা। কী দেখলি!’
      ‘বলা যাবে না।’
জহির আবার চোখ বন্ধ করল। হাত পা ছেড়ে দিল। মনে হচ্ছে, আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু না। সে চোখ বন্ধ করেই কথা বলতে শুরু করল। 
      ‘হাসান। আমি কিছু মানুষের অডিও ইন্টারভিউ নিয়েছি! শুনবি?’
      ‘কী বলিস? কখন নিলি ইন্টারভিউ?’
      ‘দাঁড়া। ফোন বের করি।’
জহির ফোন বের করল। অডিও অন করল। চারদিকে গাড়ির শব্দ। ভালো শোনা যাওয়ার কথা না। হাসান বলল, হেডফোন বের কর। দুজন হেডফোন কানে দিয়ে, কুকরিমুকরি চরের একজন বাসিন্দার ইন্টারভিউ শুনতে লাগল। 

জহির বলছে, চাচী আপনার নাম? এক বয়স্ক মহিলার কন্ঠস্বর শোনা গেল। কন্ঠস্বর বলছে, আমার নাম সখিনা বিবি, বাজান। জহির আবার বলল, বলেন, আপনার দুঃখের কাহিনী বলেন। জহিরটা অদ্ভুৎ। মহিলাকে সরাসরি বলছে, আপনার দুঃখের কাহিনী শোনান! মহিলার কন্ঠ আবার শোনা গেল। 
  ‘এক বছর আগে নদীতে নাও বাইতে গিয়া স্বামী মারা গেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর এনজিও আলারা একটা ঘর করে দিছে। ৩ মেয়ে, ১ ছেলে নিয়ে অভাব অনটনে কাটছে আমাগো সংসার। বড় মেয়ের জামাই ডায়রিয়ায় মারা যাওয়ার পর থিকা মেয়া এহন আমার সংসারে আছে। তার ভরণপোষন আমার করতে হয়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তারে আমার ঘাড়ে ফেলে দিছে। তারা আমার মেয়ার খোঁজ খবর নেয় না।’

হাসান বলল, জহির, রেকোর্ডগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিবি। আমরা তো চোখে দেখে এলাম সব। আতহার স্যার ইন্টারভিউতে শুনবে ভালো করে। ভালো লাগছে যে, মানুষগুলোর কিছু চিকিৎসা সেবা দেয়া গেছে। আসলে এরকম দু’একটা ক্যাম্প দিয়ে কিছু হবে না। বিনা চিকিৎসায় অনেক বাচ্চা মারা যায় ওখানে। স্থায়ী কিছু করতে পারলে খুব ভালো হত। 

বাস স্টাফ কোয়ার্টারের কাছাকাছি এসে গেছে প্রায়। হাসান বাসা গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারবে ভেবে আনন্দিত। অবশ্য বন্ধু জহিরের জন্য কষ্ট হচ্ছে, তাকে আরেকদফা বাসে উঠতে হবে তার বাসা পৌঁছানোর জন্য।  আল্লাহ রহম করুন তার প্রতি। হাসান দুআ করল। ফোন বেজে উঠল হাসানের । কে কল করতে পারে এখন? হাসান ফোন বের করে দেখল, ইমরুল ভাই। 
      ‘আসাসালামু আলাইকুম ভাই, কেমন আছেন?’
      ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আপনে কই আছেন?’

ইমরুলের কন্ঠে রাগ, বিরক্তি। খানিকটা ভয়ও আছে। হাসান বুঝতে পারছে না কী হলো। 
    ‘ভাই, আমি স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে চলে এসেছি। বাসা যাচ্ছি ইন শা আল্লাহ।’ 
        ‘তাড়াতাড়ি আসেন মিয়া, সিয়ামের পায়ে গুলি  লাগছে । রক্তে ভেসে যাচ্ছে।’ 
        ‘আল্লাহ! কী বলেন ভাই?’
      ‘আরে কী বলমু আমি। আপনার এলাকার পোলাপান এত জ্বালাতন করতেছে। বিল্ডিং এর একটা ব্যাচেলর পোলারে রাখতে দিমু না। সামনের মাস থেকে সবাই আউট।’
হাসান অস্থির হয়ে পড়েছে। বলল, ভাই এম্বুলেন্স ডাকছেন? সেন্স আছে ওর?
          ‘সেন্স কখন যায় ঠিক নাই। আপনি তাড়াতাড়ি আসেন মিয়া। এত কথা কন ক্যান।’

হাসান বুঝতে পারছে না, ইমরুল ভাই তার উপর রাগ করছে কেন। কল কেটে দিয়েছে ইমরুল ভাই। আবার কল দিল হাসান। রাগ দেখালে দেখাবে। কল রিসিভ করল ইমরুল। রিসিভ করেই বলল, সিএনজি তে উঠাইছি। মাতুয়াইল মেডিকেলে নিব। ওখানে থেকে এম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল। আপনি ঢাকা মেডিকেলে চলে আসেন তাড়াতাড়ি। টাকা পয়সা সাথে নিয়েন। 

জহির জানতে চাচ্ছে, কী হয়েছে। কিন্তু জহিরকে ঘটনা বলার মত মানসিক অবস্থা হাসানের নেই । হাসান বলল, জহির চল, আমিও চানখারপুল হয়ে ঢাকা মেডিকেলে যাবো। একজনের পায়ে গুলি লেগেছে। হাসান দৌড় দিয়ে সিএনজি নিয়ে এল একটা। দুই বন্ধু লাফ দিয়ে উঠে পড়ল প্রায়। বলল, মামা চলেন। দ্রুত নেন। সুবহানাল্লাহযি সাখখরালানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহূ মুনকিরীনা ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লা মুনকলিবুন। বাহনে উঠার দুআ। দুজনেই পড়ল। হাসান দরুদ পড়ছে মাথা নিচু করে । জহির বলল, হাসান কাহিনী কী, খুলে বল।


সিয়ামের সেন্স নেই। গুলি লেগেছে উরুতে। গজের বাঁধন রক্ত আটকাতে পারে নি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। হাসপাতালে আসা মাত্রই পায়ে টুর্নিকেট বেঁধে দেয়া হয়েছে। ব্লাড দেয়া হচ্ছে। এক্সরে রুমে নেয়া হচ্ছে সিয়ামকে। এরপরে এমআরাআই করাতে হবে। হাসান ছোটাছুটি করছে পাগলের মত। তাকে উদভ্রান্তের মত লাগছে। মেসের কয়েকটা ছেলে এসেছে। হাসান দেখছে, ইমরুল ভাইয়ের চেহারা হাসি হাসি। বোকা বোকা ভাব মিশে আছে হাসিতে । এই মানুষটাই কিছুক্ষণ আগে ভীষন রেগে ছিল। এখন কী হলো তার? পাশ থেকে জহির হাসানকে ডাকল । হাসান তাকালো জহিরের দিকে। জহিরের চোখ কেমন নিভু নিভু করছে। জহির হাসানের এক হাতে কাঁধ চেপে ধরল শক্ত করে। হাসান বুঝছে না কী হলো? হঠাৎ তার মনে হল জহিরকে ধরতে হবে, না হয় ও পড়ে যাবে । হাসান জহিরকে ধরল। জহির বসে পড়ল সাথে সাথে। হাসান বলল, জহির মাথা ঘুরাচ্ছে? 
    ‘হ্যাঁ। চোখে কিছু দেখছি না। দুনিয়া অন্ধকার।’
  
জহিরের কন্ঠে জোড় নেই। অবসন্নভাবে সে মেঝেতে বসে পড়ল। সিয়ামের স্ট্রেচার এগিয়ে গেছে অনেকদূর । হাসান তার বন্ধুকে ধরে রাখল। জহির বলল, হাসান আমাকে বাথরুম নিয়ে যা। বমি করব।

হাসান জহিরকে ধরে দাঁড় করালো। জহির পুরো শরীর ছেড়ে দিয়েছে। শরীরের পুরো ভার হাসানের উপর। হাসান একজন স্টাফকে দেখে বলল, ভাই বাথরুম কোনদিকে। লোকটি না তাকিয়ে হাতের ইশারা করল একদিকে। হাসান সেদিকে ঘুরতে না ঘুরতেই জহির বসে পড়ল। সে মাথা চেপে ধরে বমি করছে ফ্লোরের উপর। হাসান নির্বিকার। বন্ধুর পিঠে হাত রাখল সে। এক ভদ্রলোক পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, ছিহ। হাসান আহত চোখে তাকাল তার দিকে। জহির আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছে ফ্লোরের দিকে। তার বমি থামছে না। হাসানের খুব মায়া লাগছে দেখে। এক বৃদ্ধ পাশে এসে দাড়ালো। দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, গাঁ-গ্রামের মানুষ। কাঁধে গামছা ঝোলানো। বৃদ্ধ চাচা বলল, আহারে, আহারে। বমি করে। বমি করে কেন? হাসান বৃদ্ধের দিকে তাকাল শুধু। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তার বলতে ইচ্ছে করছে না– তার বন্ধু জহির রক্ত, কাটা-ছেড়া দেখে সহ্য করতে পারে না। বৃদ্ধ অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা করে নেই। তার চোখে করুনা। হাসানের মনে হলো, বৃদ্ধ হয়ত কিছু সময়ের জন্য তাদের দুই বন্ধুর পাশে থাকতে চায়। হয়ত বমি পরিস্কারের জন্য আয়াকে ডাকার জন্য নিজে থেকে ছুটে যাবে। জহির সুস্থ্য হলে তাদের সাথে অতি পরিচিতের মত হাসিমুখে কথা বলবে। ব্যক্তিগত অনেক প্রশ্নও করতে পারে। আগের দিনের গ্রামের মানুষদের একটা স্বভাব ছিল মানুষের বিপদে আপদে ছুটে যাওয়া। গ্রামের কারও বিপদ অসুখ মানেই অনেকরই নতুন কর্মসূচি। অসুস্থ্যকে দৈন্যদন্দিন দেখতে যাওয়া। বুদ্ধি পরামর্শ দেয়া। হাসানের ছোটবেলার কথা মনে পরে– মহল্লার এক ছেলের অসুখ হয়েছিল, অবচেতন অবস্থায় চিৎকার করত। তাকে দেখতে মনে হয় পুরো গ্রাম ভেঙ্গে মানুষ এসেছিল। সবাই চিকিৎসার জন্য নিজ বুদ্ধি পরামর্শ দিচ্ছিল। ছেলেটির পরিবারকে সান্তনা দিচ্ছিল। রান্না বান্না করে দিচ্ছিল। জহির উঠে দাঁড়াতে চাচ্ছে। তাকে ওয়াশরুমে নিতে হবে আপাতত। হাসানের ঘোর কেটে হঠাৎ মনে হলো– সিয়ামের কথা। তার মনে প্রশ্ন জাগছে, সিয়ামের অপারেশনে কত খরচ হতে পারে। ৪/৫ লাখের নিচে তো হওয়ার কথা না। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হবে। সিয়ামের পরিবার কীভাবে টাকা জোগার করবে? 


    ‘হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।’
    ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আপনি সিয়ামের মামা বলছেন?’
    ‘হ্যাঁ। আপনি কে?’
কী পরিচয় দেয়া যায়? ভাবছে হাসান। এলাকার বড় ভাই বা পরিচিত হিসেবে পরিচয় দেয়া এই মুহুর্তে নিরাপদ না। সিয়াম নিশ্চয়ই কোনো গ্যাং এর সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে গুলি খেয়েছে।  হাসান শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। পারছে না। কন্ঠের মধ্যে এক ধরণের উত্তেজনা স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। 
    ‘আমি সিয়ামের সাথে একই বিল্ডিং এ থাকি। ও ৪ তলায় আমি ১ তলায় থাকি। ও ঢাকা মেডিকেলে আছে। একটু আসবেন তাড়াতাড়ি।’ 
      ‘কী হয়েছে সিয়ামের?’
    ‘ওর পায়ে গুলি লেগেছে। উরুতে। এমআরআই রুমে আছে। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।’
ও পাশের কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। 
        ‘ভাই, আপনি কে বলছেন আসলে। আসলেই কি সত্য বলতেছেন? সিয়ামকে দেন কথা বলি।’
        ‘এমআরআই রুমে আছে ও। বের হোক কথা বলিয়ে দিব, সমস্যা নেই ইন শা আল্লাহ।’
সিয়ামের এক রুমমেট বলল, সিয়ামের ছবি ওর মামার হোয়াটসেপে পাঠিয়ে দেন, ভাই। তাহলেই হয়। 
        ‘হ্যালো, হ্যালো।’
    ‘আপনার এই নাম্বারে হোয়াটস এপ আছে? থাকলে সিয়ামের ছবি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ 
      ‘ছবি পাঠাতে হবে না। সিয়াম গুলি খাইছে তো ওর মা বাপকে কল না দিয়ে আমাকে কল দিছেন কেন?’ 

হাসান থতমত খেয়ে গেল। এই কথার মানে কী। সিয়ামের মামার কন্ঠে বিরক্তি, রাগ। ওপাশ থেকে কথা শোনা যাচ্ছে, অমানুষটার প্রতি আমার কোনো মায়া নাই। কিছু নাই।  মরলে কী?, বাঁচলে কী? আরেকটি নারীকন্ঠ শোনা যাচ্ছে, কী হয়েছে? কার কী হয়েছে? হাসান চুপ করে আছে।  ফোন কেটে গেল। 

হাসান বোকা বোকা চেহারায় সবার দিকে তাকালো। ইমরুল ভাই বলল, মজা শুরু হইছে না? হা হা। বললাম, হ্যার বাপকে কল দেন আগে। আপনি শুনলেন না। এই দুনিয়ায় কেউ কারো না। আরে আপনি মিয়া কথাও কইতে জানেন না। ধমক দিবেন মিয়া। 

হাসান কী করবে বুঝতে পারছে না। জহিরের দিকে তাকালো সে। মাথা নিচু করে আছে জহির। সেও বোকার মত হাসল। হাসান বলল, জহির তুই বাসা চলে যা। আমরা আছি ইন শা আল্লাহ। 
জহির বলল, সমস্যা নাই। থাকি। 
    ‘অনেক রাত হয়ে গেল। কাছেই তো বাসা চলে যা। তোর বউ অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই।’
    ‘না সমস্যা নাই। শ্বাশুরী আছেন তো বাসায়।’
  ‘শরীর অনেক খারাপ তোর। বমি করলি। বাসা যেয়ে ঘুমা। আর কথা বলবি না। যা।’
    ‘আরে রিপোর্ট শুনে যাই। কী অবস্থা জানতে হবে না?’

ইমরুল বলল, অবস্থা বুঝতে বাকি এখনো আপনার? অপারেশন লাগবে। সুস্থ্য হতে ৩/৪ মাসের মামলা। ৭/৮ লাখ টাকা পানির মত চলে যাবে।  হাসান ভাই, সিয়ামের বাবাকে কল দেন। ঝামেলা মিটুক। আমি বাসা চলে যাবো। 
হাসানের ফোন বেঁজে উঠল। সিয়ামের মামা কল করেছে। হাসান একদিকে সরে গেল ফোন কানে নিয়ে। 

    ‘কী বলে লোকে?,’ ইমরুল জিজ্ঞেস করল। 
  ‘ভদ্রলোক আসতেছে  আলহামদুলিল্লাহ। সিয়ামের বাড়িতেও জানিয়েছে। ওরাও বের হয়েছে।’ 


 

(নতুন পাতায়, দেয়া যেতে পারে।)

ভদ্রলোকের চুল কাঁচাপাকা। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। দাড়ি চুলে মেহেদি দেয়া। মেহেদির রং ফিকে হয়ে এসেছে। মনে হয় পান বেশি খান। এই মুহুর্তেও মুখে পান। দাত স্বভাবতই লাল। গায়ের রং সিয়ামের মতই। তবে একটু বেঁটে। এখন তুলনামূলক বেশি বেটে লাগছে। হয়ত পরিস্থিতির আকস্মিকতায় তার পিঠ ঝুঁকে গেছে। হাসানের স্বভাব মানুষকে পর্যবেক্ষণ করা। সে দখছে সিয়ামের মামা শাহ আলমকে। ইমরুল তাকে বোঝাচ্ছে কীভাবে কখন কী হলো।  এমআরআই রুমে থেকে সিয়াম বের হএছে। সে শুয়ে আছে ফ্যাকাশে চেহারায় । তাকে হাসপাতালের বড় একটি বেডে শোয়ানো হয়েছে। তার মামা রুমে আসা মাত্রই সিয়ামের চেহারা ভীতি ফুটে উঠল। সবাইকে আশ্চর্য্য করে দিয়ে, সিয়ামের মামা শাহ আলম সাহেব হিঁসহিঁস করে সিয়ামকে মারতে এগিয়ে গেলেন। সবাই হতভম্ভ। ভদ্রলোককে আটকালো ইমরুল ভাই। সিয়াম চেহারা ঘুরিয়ে নিয়েছে। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। হাসানের ভালো লাগছে না এসবের মধ্যে থাকতে। সে এক্সরে রিপোর্টের খোঁজ নেয়ার জন্য বের হয়ে গেল। জহির উঠতে চাইল। হাসান হাত দিয়ে ইশারা করে থাকতে বলল তাকে। ডিউটি ডাক্তারকে দেখাতে হবে রিপোর্ট। সম্ভাবনা আছে, আজ রাতেই রোগীকে অর্থোপেডিক হাসপাতালে নিতে হবে। হাসানের শরীরের তাপ বেড়ে গেছে। হাত পায়ের ত্বক জ্বলছে। তবে ভেতরে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। দ্রুত বিশ্রাম না করলে জ্বর আসার সমূহ সম্ভাবনা । 

রোগীর যেহেতু ইমার্জেন্সি অবস্থা, এজন্য রিপোর্টও ইমার্জেন্সি দিয়ে দিয়েছে। এক্সরে রিপোর্ট। এমআরআই রিপোর্ট আসতে সময় লাগবে। এর মধ্যে সিয়ামকে কয়েকটা ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছে। এরপর রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা হবে।  হাসান রুমে ফিরে এল। আশ্চর্য্য এখনো রুমে উচ্চবাচ্চ শোনা যাচ্ছে। শাহ আলম সাহেবের কন্ঠস্বর স্পষ্ট। 

হাসান রুমে ঢুকে আলম সাহেবের কাঁধে হাত রাখল। মৃদু হাসল। বলল, মামা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। দেখা যাক ডাক্তার কী বলে। আলম সাহেব মুখ ফিরিয়ে নিল। বলল, কী আর হবে? অমানুষটার বাপ-মা তাদের বাড়ি ভিটা বিক্রি করে টাকা জোগার করবে এখন। ৫/৬ লাখ টাকা মুখের কথা না। বাড়ি ভিটা, ঘর, ঘরের চালা সব বিক্রি করতে হবে। সুস্থ্য হলে এরপর এই ছোটলোকটা তার বাপ মারে নিয়া ঢাকা শহরে ভিক্ষা করে খাবে। পঙ্গু পা নিয়ে ভিক্ষা করলে ভালই ভিক্ষা পাবে। 

সিয়ামের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ইমরুলের চাপা গলা শোনা গেল, সিন ভালো লাগে না রে। একটু দূরেই জহির আর ইমরুল ভাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । হাসান আলম সাহেবের হাত ধরে বাইরে নিয়ে এল। অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, ভদ্রলোকের চোখেও পানি। হাসানের মন বলে উঠল, আহারে, আহারে। কয়েকঘন্টা আগে কাঁধে গামছা ঝোলানো বৃদ্ধ চাচার বলা কথাটিই হয়ত হাসানের মনে গেঁথে গেছে। কিংবা তা না-ও হতে পারে। হতে পারে, তার এই হাহাকার স্বতস্ফূর্ত। হাসানের চলার ভঙ্গি ক্লান্ত একজন সৈনিকের মত। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু  সেই ছাপেও একটা দৃঢ়তা আর নিয়ন্ত্রনের মিশ্রন বোঝা যায় । সে সিয়ামের মামার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। কিন্তু তার নিজের হৃদয়ই শক্ত নেই। সিয়ামের পরিবার আর চিকিৎসার বিরাট খরচের কথা ভেবে সে ভীষন অসহায়ত্ব বোধ করছে। 

    ‘জহির দেখ তো, বাইরে কাউকে ভিক্ষুক বা অসহায় টাইপের পাস কি না?’
    ‘কেন?’
    ‘কিছু সাদাকা করা দরকার। আল্লাহ যেন বিপদ কাটিয়ে দেন। সহজ করে দেন। সবচেয়ে ভালো হত, যদি সিয়ামের আত্মীয় কেউ সাদাকাহ করত। কিন্তু ওরা কেউ এই কথা শোনার মুডে নাই।’ 
    ‘৫০০ টাকা! আরও কম  দিলেও তো হত।’
    ‘ বিপদ টা বড় জহির। আরও বেশি দিলে ভালো হত বরং। আল্লাহ কবুল করুন। বিপদ কাটিয়ে দিন।’
    ‘আচ্ছা ঠিক আছে। হাসবুনাল্লাহ।’
    ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল।’

জহির বাইরে বেরিয়ে গেল। ডিউটি ডাক্তার রিপোর্ট নিয়ে রুমে যেতে বলেছে। সাথেই আলম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বিড়বিড় করছেন। একটু আগেই সিয়ামের বাবা-মায়ের সাথে ফোনকলে কথা বলেছেন। সেখানেও রাগারাগি করেছেন। তবে তাকে এখন ভীষন অবসন্ন লাগছে। চেহারা রক্তহীন। 

    ‘স্যার, রিপোর্ট কী দেখলেন?’
  ‘ রিপোর্ট তো এক্সরে এর। এমআরআই রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে ভালো মত। তবে আপনাদের জন্য সুসংবাদ আছে।’
    ‘সুসংবাদ মানে ডাক্তার সাহেব?’ 
শাহ আলম চেঁচিয়ে উঠল। হাসান তার ঘারে হাত দিয়ে মৃদু চাপ দিল। এর অর্থ শান্ত হোন। কিন্তু আলম সাহেব অশান্তই। ছটফট করছেন। হাসান জিজ্ঞেস করল, স্যার একটু বুঝিয়ে বলুন। 
      ‘পায়ের হাড়ে গুলি লাগে নাই। মেজর কিছু হয় নাই। মাংস ভেদ করে গেছে গুলি। এটাই সুসংবাদ।’ 
      ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
    ‘মেজর অপারেশন লাগবে না। এখন মাইনর কিছু ট্রিটমেন্ট লাগবে। এমআরাই রিপোর্ট আসুক। এরপর ফাইনাল চিকিৎসা। রক্তনালী, লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কি না দেখতে হবে। চলেন রোগীকে দেখে আসি । ভয় নাই ইন শা আল্লাহ। আল্লাহকে ডাকেন।’ 

হাসান দেখল, আলম সাহেবের চোখে আবার পানি চলে এসেছে। ভদ্রলোক সেই পানি লুকোনোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। তবে তার মুখ কিছুটা হাসি হাসি। ডাক্তার এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনে পেছনে যাচ্ছে হাসান ও আলম সাহেব। ডাক্তার জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা আপনার কী হয় সম্মন্ধে? আলম উত্তর দিল, অমানুষটা আমার ভাগনে। আলম সাহেব ডাক্তারকেও জানাতে চান যে, তার ভাগনে অমানুষ! ডাক্তার আলম সাহেবের উত্তর শুনে আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। অবশ্য অমানুষ মোটামুটি ভদ্র ধরণের বিশেষণ, এর চেয়ে খারাপ কোনো বিশেষণ বা গালি যে শুনতে হয় নি, এটা সৌভাগ্য। হাসানের হাসি পাচ্ছে। শরীরও এখন ভালো লাগছে। কিন্তু এই ভালো লাগাটা হয়ত পুরোটাই মানসিক। শারীরিক না। 

প্রায় ঘন্টাখানেক সিয়াম থাকল অপারেশন রুমে। মাইনর অপারেশন। অপারেশন শেষ। ডাক্তারের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সিয়ামের অবস্থা খুব ক্রিটিকাল না। সিয়ামের রুমমেট, হাসান, জহির, আলম সাহেব এই চারজন মানুষ ঘিরে আছে সিয়ামকে। ইমরুল ভাই, আরও দুজন ঘন্টা দুয়েক আগে চলে গেছে। হাসান জিজ্ঞেস করল, মামা, সিয়ামের বাড়ি মানুষজন আসতে কত সময় লাগতে পারে?
‘ঘন্টাখানেক লাগবে হয়ত।’ 

হাসপাতালে সময় যেতে যেতে প্রায় ভোর রাত হয়ে গেল। সিয়ামের বাবা, মা, চাচা এসে পড়েছে। আসার পরেই যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এক কথায় বলে বোঝানো সম্ভব না। বিপদে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। কান্না-কাটি, রাগারাগি, ঝগড়া, অভিমান মিলেমিশে একাকার। দুইজনে হয়ত ঝগড়া লেগে গেল, একজন থামানোর কথা বলছে। থামানো কথা বলতে বলতেই সে নিজে আরেকজনের সাথে লেগে পড়ছে । যখন রুমের অন্যন্য রোগীরা আপত্তি করল, তখন তাদের কোলাহল থামল । সিয়ামের চেহারা অন্ত্যন্ত ভীত। তাকে দেখতে অত্যন্ত অসুস্থ্য লাগছে। হাসান সিয়ামকে জানাল সে হাসপাতালে এসে খোঁজখবর করবে মাঝে মাঝে ইন শা আল্লাহ। জহির তার নাম্বার দিয়ে বলল, তার বাসা কাছেই, যেকোনো প্রয়োজনে সে দ্রুত আসতে পারবে। ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। হাসান, জহির সবাইকে বলে বের হয়ে এল। বের হয়ে তাদের মনে পড়ল সারারাত কেউ কিছু খায় নি। খাওয়ার কথা মনেই পড়ে নি। 

    ‘ফ্রেশ হয়ে, নামাজ পড়ে বাসা যাই, ইন শা আল্লাহ।’
    ‘হ্যাঁ, ইন শা আল্লাহ। হাসান, আমার বাসায় থেকে যা আজ।’
  ‘না, বাসা চলে যাব। গোসল করে ঘুমাবো, ইন শা আল্লাহ। আজ ছুটি, আমার কোনো তাড়া  নাই। তুই তো অফিসে যাবি। আমি তখন তোর বাসায় একাই থাকব?!’
    ‘তা ঠিক! এখন মনে পড়ল। আগেই বলে রাখব অফিসে যেতে লেট হবে। মন চাচ্ছে রাস্তায় শুয়ে পড়ি। ঘুমে মরে যাচ্ছি।’ 

হাসান দেখল জহিরের চোখ সরু হয়ে গেছে। সে মৃদু দুলছে। একটা মসজিদ চোখে পড়ল তাদের। হাসান এগিয়ে গেল মসজিদের দিকে। জহির থামিয়ে বলল, হাসান, এই মসজিদে দীর্ঘক্ষণ ধরে নামাজ পড়ায়। আজ এখানে নামাযে দাঁড়ানো সম্ভব না। নির্ঘাত পড়ে যাব। সামনের একটা মসজিদ আছে ওখানে যাই। চল। 

হাসান, জহির দুজনেই দ্রুত হাঁটার চষ্টা করছে। কিন্তু হাঁটা দ্রুত হচ্ছে না। দুজনেই চুপচাপ। কথা বলার শক্তি নেই বললেই চলে। জহির মুখ খুলল হঠাৎ– সিয়ামের গুলি লাগল কীভাবে, দোস্ত?
    ‘কোনো গ্যাং এর সাথে ঝামেলায় জড়িয়েছে মনে হয়। আল্লাহই ভালো জানেন।’ 
হাসান স্পষ্টতই সিয়ামের কথা এড়াতে চাচ্ছে জহিরের সামনে। গীবত হয়ে যেতে পারে। এই রিস্ক নেয়া যাবে না। হাসান বলল, মনে পড়ছে, তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। রাতে এক মাস্তানের দল আমাকে মারতে এল। 
      ‘কী কারণে মারতে এল ?’
      ‘Long story short…’
      ‘হুম, বল।’ 
    ‘একটা দলের সাথে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। তো অন্য স্কুলের একটা ছেলে, সাইকেলে করে যেত। আমাদের দেখলেই থুথু ফেলত।’ 
        ‘হা হা। কাহিনী কী রে ভাই?’
    ‘আমাদের সাথে এক ছেলে ছিল। ও বলল যে, মাস ছয়েক আগে সাইকেল ওয়ালা ছেলেটাকে ওরা এক সন্ধ্যাবেলা কী কারণে মেরে বিবস্ত্র করে। এরপর সবাই মিলে তার গায়ে থুথু দেয়। তো এর প্রতিশোধ হিসেবেই ঐ ছেলে একে দেখলে থুথু ফেলে।’
        ‘হাস্যকর।’ 
    ‘তো দিনের পর দিন এমন করেই থুথু ফেলে ছেলেটা। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। মানে বোঝার চেষ্টা করি তার মানসিকতা। কিন্তু ঐ ছেলেটা ভেবেছে যে, আমি তার দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে থাকি দিনের পর দিন। এইজন্য এক রাতে দল বেঁধে মারতে এল আমাকে।’
          ‘আজীব।’ 
    ‘হুম। তখন ভেবেছিলাম, শহরে আর থাকব না, গ্রামে চলে যাব। এরকম অদ্ভুত বিষাক্ত পরিবেশ ভালো লাগছিল না। ছেলেগুলা কেমন খারাপ বলি। ঐ যে সাইকেল ওয়ালা।’
            ‘থুথু নিক্ষেপকারী!’
      ‘হ্যাঁ। ওদের বড় বড় গরু ছিল। ও কুকুরের ডাক নকল করতে পারত। তো একদিন দুপুরবেলা, মনের সুখে সে রাস্তার বাইরে এসে কুকুরের ডাক দিচ্ছে। তার ডাক শুনে আশপাশের কিছু কুকুর সাড়া দেয়। এরপরে আরও কিছু কুকুর ডেকে উঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে ১০/১২ টা কুকুর ঘেউ ঘেউ আওয়াজ করে তীব্র গতিতে ছুটে আসে। এই ছেলে ডাক দিয়েই যাচ্ছে। হঠাৎ এতগুলো কুকুর দেখে সে দৌড়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা আটকিয়ে দেয়। আর বাইরে ছিল বড় একটা গরু। বেচারা গরুটাই কুকুরদের আক্রমণের স্বীকার হয়।’ 
          ‘এরপর?’ 
        ‘এরপর আর কী। গরুটা মরে গেছিল। কিন্তু ইন্টেরেস্টিং পার্ট হলো, ছেলেটা তার কয়েক বন্ধু মিলে মরা গরু যবাই দিয়ে ভ্যানে করে সেই মাংসা হাফ দামে বিক্রি করতে বের হয়ে যায় রাতের মধ্যেই। বিক্রিও করে অনেক। এরপর জানাজানি হলে তারা গরু, ভ্যান সব রেখে পালিয়ে যায়। কয়েকদিন এলাকায় আসে নি আর।’
          ‘মারাত্মক কথা শুনালি, ভাই।’
        ‘এরা একদম না-মানুষ টাইপের ছেলে ছিল। এখন কী করে আল্লাহই জানেন। বড় সন্ত্রাসী, গ্যাং লিডার হলে আশ্চর্য হবো না।’ 

মসজিদের কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। ওজুখানায় ঢুকতে হয় মসজিদের ভেতর দিয়ে। হাসান হাঁফাচ্ছে। জহির ঘুম, ক্লান্তি আর ক্ষুধায় দুলছে প্রায়। মসজিদের দরজার কাছাকাছি এসে গিয়েছে তারা। বেশ কিছু মুসল্লী চলে এসেছে এর মধ্যেই। চারদিক আলোয় ঝকঝক করছে। 

নামাজ শেষ হলো। জহির ও হাসান চাঁনখারপুল ব্রিজের দিকে এগোচ্ছে। হাসান বলল, জহির চলে যা। আসতে হবে না আর এদিকে। 
    ‘আচ্ছা। ঘুমে এমন অবস্থা, দোস্ত! মসজিদে ডান পা ঢুকিয়ে, আল্লাহুম্মাফতাহলী… না পড়ে ভুলে ঘুমের দুআ আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূতু ওয়া আহইয়্যা পড়ে ফেলছি!’
        ‘হা হা। আল্লাহ রহম করুন তোর প্রতি। তুই যা তাহলে। ফী আমানিল্লাহ।’ 
      ‘ফী আমানিল্লাহ।’

 

জহির হাসানকে বিদায় দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। হাসান সকাল সকাল বাস পেয়ে গেছে। তার যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। জহির যাচ্ছে হেঁটে। খুব কাছেই তার বাসা। তার মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে। চর কুকরিমুকরি। দরিদ্র মানুষগুলোর অসহায়ত্ব। সিয়াম। গুলি। হাসপাতাল। গ্যাং কালচার। ক্লান্তিতে ভাবনাগুলো এলোমেলো ভাবে আসছে, যাচ্ছে। বাসা গিয়ে খেয়ে শুতে হবে দ্রুত, ইন শা আল্লাহ। আচ্ছা, কয়েকদিনের মিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে কোনো কবিতা লিখে ফেলা যায় না? যায়, ইন শা আল্লাহ। হায়াতের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, অনুভূতিগুলো হারিয়ে যায়। মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু কবিতার আকারে লিখে রাখলে সেগুলো হারিয়ে যায় না। কবিতা হলো মনের আয়না। মাঝে মাঝে আওড়াতে ভালোই লাগে। অন্যের কবিতা তো পুরোপুরি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। এজন্য নিজের অনুভূতি নিয়ে নিজেকেই কবিতা লিখতে হয়। কবিতা লিখতে জহিরের ভালোই লাগে। যদিও সে একজন ইঞ্জিনিয়ার। তাতে কী? বাসার কাছাকাছি এসে পড়েছে জহির। এইতো দোতালার হাতের ডানের বাসাটা। দরজায় নক করল সে। তার স্ত্রী দরজা খুলল। জহির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আবার ভূল দুআ পড়ল– আল্লাহুম্মাফতাহলী আবওয়াবা রহমাতিকা। 
        ‘এই, মসজিদে প্রবেশের দুআ পড়ছ কেন?’
        ‘হ্যাঁ?’
        ‘পড়ো বিসমিল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম। পড়ো কষ্ট করে!’ 
        ‘বিসমিল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম।’ 




 


                                                        (১১)


রাত পৌনে দশটা। হাসান ঘরে শুয়ে আছে। ঘরের লাইটের আলো কেমন যেন ফিকে লাগছে। ফ্যান ঘুরছে মধ্যম তেজে। বিদ্যুতের ভোল্টেজ মনে হয় কম আজ। পরিবেশটা করুণ লাগছে। আসলে হাসানের মন কেমন যেন ভালো নেই, ভালো নেই লাগছে । একাকীত্ব অনুভব করছে সে। সারাদিন অফিসে কাজে থাকলে সময় ভালোই কাটে। কিন্তু দিন শেষে ঘরে এলে এত একা লাগে! ঘরে ঢুকতেই ইচ্ছা করে না। শূন্য একটা ঘর।


(চলবে ইন শা আল্লাহ)


পূর্বের পর্বের লিংকঃ

https://fictionfactory.org/posts/13908

https://fictionfactory.org/posts/13909

https://fictionfactory.org/posts/13911

https://fictionfactory.org/posts/13923

https://fictionfactory.org/posts/13968

https://fictionfactory.org/posts/13969

https://fictionfactory.org/posts/15954

https://fictionfactory.org/posts/15955

https://fictionfactory.org/posts/15956

Comments

    Please login to post comment. Login