Posts

উপন্যাস

চোখের তারায় জোনাকির আলো (১০ম পর্ব)

January 27, 2026

ইহতেমাম ইলাহী

35
View

                                                         (১১)


রাত পৌনে দশটা। হাসান ঘরে শুয়ে আছে। ঘরের লাইটের আলো কেমন যেন ফিকে লাগছে। ফ্যান ঘুরছে মধ্যম তেজে। বিদ্যুতের ভোল্টেজ মনে হয় কম আজ। পরিবেশটা করুণ লাগছে। আসলে হাসানের মন কেমন যেন ভালো নেই, ভালো নেই লাগছে । একাকীত্ব অনুভব করছে সে। সারাদিন অফিসে কাজে থাকলে সময় ভালোই কাটে। কিন্তু দিন শেষে ঘরে এলে এত একা লাগে! ঘরে ঢুকতেই ইচ্ছা করে না। শূন্য একটা ঘর। সে আজাদের দোকানে বসে কথা বার্তা বলে সময় কাটায় কোনো কোনো দিন।  আজ আজাদের দোকান বন্ধ। দুই সপ্তাহের ব্যাস্ত সময়টায় ক্লান্তির কারণে ঘুমানোর আগে নফল নামাজ পড়ার সুযোগ হয় নি হাসানের । এর প্রভাব এখন অনুভব করা যাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। থেকে থেকে কেমন ছটফট লাগছে। রাতের এই নামাজটা দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়লে মন অনেক শান্ত আর দৃঢ় থাকে। আবার শুরু করতে হবে– ভাবছে হাসান। কিন্তু উঠে ওজু করতে যেতে ইচ্ছে করছে না। কী করা যায়? হাসান উঠে বিছানা ঝাড় দিল। মশারি টানাল। ল্যাপটপ, ল্যাম্প, একটা বই ভেতরে নিয়ে ঘরের বাতি অফ করে দিল। হাসান ভাবছে বই পড়া হয় না অনেক দিন। বই না পড়লে মন কেমন সংকুচিত হয়ে থাকে। মানসিকতা ছোট হয়ে যায়। অল্পতে ছটফট লাগে। তার হাতের বইটির নাম,  সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (সংগ্রাম ও বিজয়ের দিনলিপি)। আকিক পাবলিকেশন। হাসান পৃষ্ঠা উল্টালো। ৪৪ পৃষ্ঠা বের হলো। এখান থেকেই পড়া যাক। “ (সুলতানের) কুরআন তিলাওয়াত শোনা। সুলতান কুরআনুল কারীমের তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি যাকে ইমাম নিযুক্ত করতেন তার পরীক্ষা নিতেন, কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও হাফেজ হওয়ার শর্ত আরোপ করতেন। রাতের বেলা বুরুজে থাকা অবস্থায় যিনি তাকে পাহারা দিতেন, তাকে দুই, তিন বা চার পারা পড়ে শোনাতে বলতেন এবং তিনি (সুলতান) শ্রবন করতেন।” বুরজ মানে কী? ওহ, নিচে টীকায় অর্থ লিখা আছে। বুরজ মানে কাঠের তৈরি নিরাপত্তা ঘর। সুলতানের তাঁবুর পাশের স্থাপন করা হতো। হাসান পড়ছে। “... সুলতান ছিলেন নরমদিল, কোমলচিত্ত। কুরআন তেলাওয়াত শোনার সময় তার অন্তর বিগলিত হতো, চোখ সজল হয়ে উঠত।” এই অংশটা পড়ে হাসানের মনে হলো কুরআন তিলাওয়াত শুনলে তার অস্থিরতা দূর হতে পারে, ইন শা আল্লাহ। বই আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। এতই একঘেয়ে আর অস্থির লাগছে কেন আজ? আল্লাহ রহম করুন। হাসান, ল্যাপটপ থেকে সূরা মূলকের তিলাওয়াত ছাড়ল। ঘুমানোর জন্য ল্যাম্প অফ করে দিল। তার আগের অভিজ্ঞতা আছে। কুরআন শুনতে শুনতে শরীরের শান্ত অবস্থা ফিরে আসে। আশা করি আজও শরীর মন শান্ত হবে, ইন শা আল্লাহ । হাসান পাশ ফিরল। হয়ত আজও এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে যাবে। তারপর আবার কিছুক্ষণ কাটিয়ে অফিস। খারাপ কী?


        
  ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার।’ 
  ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছ হাসান?’
  ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনার শরীর এখন কেমন, স্যার?’
  ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালোর দিকে। কিছু বলবে?’
‘স্যার আগামী শুক্র-শনি ছুটির সাথে কি আমার জন্য বৃহস্পতিবার ছুটি অ্যাড করে দেয়া যায়? বাড়ি থেকে ঘুরে আসতাম ইন শা আল্লাহ। কেমন একঘেয়ে লাগছে সবকিছু। কাজে ঠিকমত মন বসাতে পারছি না।’ 
  ‘ঠিক আছে ছুটি নাও ইন শা আল্লাহ। টিমের কোনো প্রয়োজন হলে তোমার বাসা   থেকে সাপোর্ট দিও টুকটাক। নোট রেখো, কানেক্টেড থেকো ইন শা আল্লাহ।’ 
  ‘জি, ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ সহজ করুন। 
  ‘আমীন।’ 


হাসান নিজের রুমে ফিরে গেল। আলহামদুলিল্লাহ আতহার স্যার চাওয়া মাত্রই ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ভালো লাগছে কিছুটা। বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকেট কাটতে হবে। না, এখন না। অফিস টাইমে না। বাসা গিয়ে এরপর কাটব ইন শা আল্লাহ। হাসাব ভাবছে। আশা করি টিকেট পাওয়া যাবে, ইন শা আল্লাহ। বাড়িতে যাওয়ার আগে সিয়ামকে আরেকবার দেখে আসতে হবে। হাসান জুনিয়র একটা ছেলেকে ডাকল। বলল, কুরিয়ারের পার্সেল গুলোর ফলোআপ নাও। কোনো পার্সেলে অতিরিক্ত দেরি হলে, অফিসে কমপ্লেইন দিয়ে রাখো। ছেলেটা উত্তর দিল, ঠিক আছে ভাই। হাসান জুনিয়র সবাইকে বলে দিয়েছে স্যার না ডাকতে। ভাই শুনতেই ভালো লাগে।


 


                                                    (নতুন পাতা)


হাসান তার গ্রামের বাড়িতে। তার মন বেশ ভালো। তার মা রান্নাবান্নায় ব্যাস্ত। ছেলে তিনদিন থাকবে। কোন বেলা কী খাওয়াবেন এই নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। হাসানকে জিজ্ঞেস করছেন বারবার, কী খেতে চাও? আর কী খাবে? হাসান হাসে। বলে, যা ইচ্ছা খাওয়াও। তার মা বলে, না, না। ঢাকায় কী খাও, না খাও। শরীরটার কী অবস্থা করেছ? হাসান হাসে। তার মাও হেসে ফেলে। এখন রান্না হচ্ছে, লাউ খুব চিকন করে কেটে পোলাওয়ের চাল দিয়ে খিচুরি রান্না। সাথে ডালের বড়ি দিয়ে মাছ রান্না হবে। এটা খুব প্রিয় হাসানের। খিচুরি রান্নার ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় পুরো বাসায়। কারেন্ট চলে গেছে। চারদিকে অন্ধকার। আকাশে চাঁদের মৃদু  আলো। এই সময়টা তাদের বাড়ির পশ্চিম দিকের রাস্তায় গেলে খুবই ভালো লাগবে। কারেন্ট চলে যাওয়ায়, আলোর দূষন (light polution) থাকবে না। প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ তার নিজস্ব রূপে দেখা যাবে। ঘ্রাণ নেয়া যাবে। বিশুদ্ধ বাতাস টেনে নেয়া যাবে ফুসফুসে। এই বাতাস টানতে থাকলে বুক নিচু হতে থাকে, হতেই থাকে। কিন্তু শ্বাস নেয়া শেষ হয় না। আর ঢাকার রাস্তার বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসে। হাসান বাইরে চলে এসেছে। সাথে তার ছোট ভাই মাহের। 

  ‘ইশ! পুরো আকাশ দেখি ভরা তারা!’
  ‘হুম।’ 
  ‘সৌভাগ্য তোর। তুই তো মাঝে মাঝেই দেখিস।’
  ‘দেখা হয় না!’
  ‘ফাজিল।’ 
  ‘চলো, সামনে চলো। অনেক জোনাকী বের হয়েছে এবার।’
  ‘কী বলিস! আকাশও আলো ঝলমল। আর জমিনেও জোনাকীর আলো ঝলমল! সুবহানাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ 


হাসান চারদিকে যেখানেই তাকাচ্ছে, ঝোপঝাড়ে বা দূরের বাঁশঝারে– ঝাকে ঝাকে জোনাকি। একেকটা ঝাঁক ১০/১৫ ফুট দীর্ঘ। ৩/৪ ফুট পুরু। দেখতে পুরু জাজিমের মত লাগে। আলোর জাজিম! লিচু গাছের নিচে বিশাল জায়গা নিয়ে কয়েকটা লেবু গাছ। ঘন ঝোপ। সেখানেও অন্তত ৫০০ জোনাকি। হাসান এগিয়ে গেল। কিছু জোনাকি ছুঁয়ে দেখতে হবে। গতবছর তার ছোট্ট চাচাত বোনকে নিয়ে জোনাকি দেখতে এসেছিল হাসান। সে হাসানকে বলছিল জোনাকি ধরে দিতে। হাসান উত্তর দিল, জোনাকী পোকাকে ধরে নিয়ে গেলে জোনাকী পোকার মা কান্না করতে পারে। যেমন তোমাকে কেউ নিয়ে গেলে তোমার আম্মু কান্না করবে। বুঝতে পেরেছ? বাবুটা মাথা ঝাঁকায়। সে বুঝতে পেরেছে! হাসান তাকালো আকাশের দিকে। অসংখ্য তারা। মনে হচ্ছে, সেগুলোও জোনাকী। লিচু গাছের মাথার দিকে শুধু তিনটি জোনাকি। একা একা উড়ছে, ঘুড়ছে। তাদের আশেপাশে আর কোনো জোনাকি নেই। 

    ‘মাহের, পৃথিবীতে প্রায় ২০০০ প্রজাতির জোনাকী পোকা আছে। জানো?’
    ‘জানতাম না।’ 
    ‘কোনো কোনো প্রজাতির আলো সবুজ, কোনোটার হলুদ। আবার কিছু আছে লালচে-কমলা আলো দেয়। জোনাকী পতঙ্গটাকে দুনিয়াতে বেহেশতের একটা উপকরণ মনে হয়।’ 
  ‘জোনাকী দেখেই মনে হয়, মরিচ বাতি তৈরির আইডিয়া মানুষের মাথায় আসছে, তাই না?’
    ‘হতে পারে!’

হঠাৎ কারেন্ট চলে এল। চারদিকে ছোট বড় বাতি জ্বলে উঠল। প্রকৃতির নিজস্ব রূপ হারিয়ে গেল। হাসান বলল, চল, সামনে থেকে আরেকটু হেঁটে আসি। 


 

সকাল বেলা। হাসান বাড়ির বাইরে, আম গাছের নিচে চেয়ারে বসে আছে। হাতে বই। সুলতান সালাহুদ্দীন। পড়তে ভালো লাগছে আজ। ১০ পৃষ্ঠার মত পড়া হয়ে গেছে। কী অসাধারণ মানুষ ছিলেন সুলতান। দৃঢ়তা আর কোমলতার অপূর্ব মিশ্রন তার চরিত্রে। বুদ্ধিমত্তা ও ভদ্রতার চমৎকার উপমা। আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। হাসান বই থেকে চোখ উঠাল। দেখল মানিক চাচা হেঁটে যাচ্ছে। হাসান হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। 

    ‘আসসালামু আলাইকুম, চাচা। কবে বাড়ি এলেন?’
    ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আজ সকালে আসছি বাবা, রাতের বাসে।’
    ‘কেমন আছেন?
    আলহামদুলিল্লাহ। তুমিও বাড়িতে চলে আসলা! ভালোই হলো! দেখা হয়ে গেল!’ 
    ‘আলহামদুলিল্লাহ। কোথায় যাচ্ছিলেন?’
    ‘বাজারে যাই একটু। বিকালে আজমলদের বাড়ি যেতে হবে। দুলাভাই  অসুস্থ্য।’ 
    ‘আল্লাহ সুস্থ্য করুন। আচ্ছা, কাজ না থাকলে আমিও যাবো ইন শা আল্লাহ। ঢাকায় আজমলের সাথে দেখা হয়েছিল তো।’
    ‘ওহ, ভালো। ও তো ডেমরাতেই আছে।’
    ‘হ্যাঁ।’ 

হাসানের মা জানালো মানিক চাচার দূরবস্থার কথা। চাচী, চাচাত বোনরা কোনো মত খেয়ে-পরে আছে। বড় মেয়ের বাবু হওয়ার সময় হয়ে গেছে। তার শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকার জন্য চাপ দিয়েছে। 
  ‘খরচ এদেরকে দিতে বলে?’
  ‘হুম।’ 
  ‘কী অবস্থা।’
  ‘মানিকের হাতে তো মনে হয় একটা টাকাও নাই। মানুষের বিপদ। কখন কী যে বিপদ আসে! আল্লাহ মালিক রক্ষা করো।’


হাসান মানিকের সাথে বেড়িয়ে পড়েছে বিকেল বেলা। আজমলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। রোগী দেখতে যাওয়ার অনেক সাওয়াব আলহামদুলিল্লাহ। রোগীর পরিবার মানসিকভাবে থাকে দূর্বল। রোগী নিজের ব্যাপারে ভীত থাকে। এই ভীতি সে নানান কথার মাধ্যমে প্রকাশ করে। তার কথায় পরিবারের অন্যরাও প্রভাবিত হয়। বাইরের কেউ যেয়ে যদি তাদের সাহস দেয়, ভালো কথা বলে আনন্দিত করার চেষ্টা করে, তাহলে ব্যাপারটা চমৎকার কাজ করে। রোগীর পরিবারের মধ্যে যে কষ্ট ও ভয়ের ঘোর থাকে, সেটা কেটে যায়। একসাথে হাঁটছে হাসান আর মানিক। কিছুদূর পরে মেইন রাস্তায় গিয়েই ভ্যানগাড়িতে উঠতে হবে। 

    ‘চাচা, শুনলাম রিয়ামনি অসুস্থ্য?’
    ‘হ্যাঁ, ডেলিভারি ডেট কয়েকদিন পরেই।’
    ‘টাকা পয়সা হাতে আছে, চাচা?’

  মানিক চুপ করে আছে। হাসান আর কিছু বলল না। মেইন রাস্তা আর কিছু দূর। মানিক বলল, কিছু টাকা আছে। কিন্তু এই টাকা দিয়ে তো হবে না। দেখা যাক কী করা যায়। তোমার শহীদ চাচার কাছে কিছু ঋন চাইব, ভাবতেছি। হাসান বলল, আচ্ছা। হাসান দেখল, মানিক চাচার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মানিক চাচা হয়ত হাসানের কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছে। সে চাইলেই হয়ত হাসানকে টাকার জন্য বলতে পারত। কিন্তু বলে নি। হাসানও কিছু বলছে না। ভ্যানগাড়িতে উঠে গেল দুজনে। হাসান বলল, আজমল কী আসবে, ঢাকা থেকে?
      ‘ও আসছে তো। এক বাসেই আসছি দুজনে।’ 
      ‘ওহ আচ্ছা। দেখা হবে তাহলে, ইন শা আল্লাহ।’
      ‘ইন শা আল্লাহ।’ 
হাসান দেখল মানিক চাচা কেমন উশখুশ করছে। একবার হাসানের চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল। হাসান বলল, কিছু বলবেন চাচা?
      না, না। কী আর বলব! 

হাসান চারপাশে তাকাচ্ছে। রাস্তার পাশে অনেক গাছ। বিকালবেলার হলুদাভ আলো চমৎকার লাগছে। আর বেশিক্ষণ লাগবে না হয়ত যেতে আজমলদের বাড়ি। ১০/১৫ মিনিট সময় লাগতে পারে। কিছু কেনা দরকার। সামনের বাজার থেকে কিছু ফল কিনতে হবে ইন শা আল্লাহ। মানিক বলল, আমার জামাইটার বয়স তেমন বেশি না। দেখছিলা তো, বিয়ের সময়? 
    ‘হ্যাঁ, চাচা।’ 
  ‘রিয়ামনির শ্বশুরের কিছু জমি আছে। আবাদা সাবাদ করে, গাই, গরু পালে। জামাই কাপড়ের দোকানে থাকে। অল্প কিছু বেতন পায়। সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে। খুব ভালো চলে না। দিন আনি দিন খাই আরকি। এখন বাচ্চা হওয়ায় সময় হইছে মেয়াটার। আমারই তো খরচ দেওন লাগব, তাই না?’

হাসান চুপ করে আছে। মানিক বলল, আমি না দিলে কে দিব আর? মেয়া আমার। জামাইর উপর টাকার চাপ পড়লে পরে সংসার খরচ চালাতে কষ্ট হয়ে যাবে। তাগো কষ্ট মানে আমার কষ্ট। তাই না? হাসান বলল, আল্লাহ সহজ করুন, চাচা। রহম করুন সবার উপর। 

সন্তানের প্রতি মানিক চাচার মমতা দেখে হাসান আবিভূত হয়। আবার চাচার অপারগতার জন্য করুনা অনুভব করে। হাসান যখন প্রথম প্রথম ঢাকা আসে। তখন মানিক চাচার সাথে দেখা করলে ফিরে আসার সময় ফল টল সাথে দিয়ে দিত। সময় কত দ্রুত চলে যায়! এইত মনে হচ্ছে সেদিনের কথা। মানিক চাচার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, কিছু দিন পর বাচ্চা হবে ইন শা আল্লাহ। বয়স অবশ্য কম। হাসানের চোখের সামনে জন্ম হলো। হঠাৎ চুলে আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিল মেয়েটার মাথা। ছোট বেলায় ঐ জায়গাটাতে চুল উঠত না। 


আজমলদের বাড়ির পরিস্থিতি যেমন আশা করা হয়েছিল তেমন পেল না হাসান। আজমলের বাবা ভীষন অসুস্থ্য। চোখ বন্ধ, শ্বাস নিচ্ছে ধীরে ধীরে। শরীরে বল নেই। কিছুক্ষণ আগে মাথায় পানি ঢালা হয়েছে। হাসান যে আঙ্গুর নিয়ে গেছে সেটা কাউকে দেবে এই অবস্থাও নেই। আজমলের বাবা একটু সেন্স ফিরে পেলেই আজমলকে গালাগালি করছে। আজমলের মা কান্না করছে। অন্যদের চেহারাও ফ্যাকাশে। হাসান বলল, হাসপাতালে নেয়া দরকার তো। কেউ কিছু বলল না। আজমল মাথা তুলে বলল, হ্যাঁ, নিব ভাই। হাসানের হাতে কে যেন টান দিল। হাসান পাশ ফিরল। দেখল তার বন্ধু, মাজেদ। অনেক দিন পর দেখা হলো। আনন্দে কোলাকুলি করল তারা। তবে বাড়ির বাইরে যেয়ে। মাজেদ বলল, ঢাকায় তো থাকিস, আজমলের থেকে সাবধান!
    ‘কেন?’
    ‘ভয়ানক জুয়াড়ু। টাকা চাইলে দিবি না। নানা বাহানায় টাকা চাবে।’ 
    ‘আল্লাহ রহম করুন।’ 
    ‘ও কোন লেভেলে গেছে তুই ভাবতে পারবি না। হায়রে!’
    ‘কোন লেভেলে গেছে?’
    ‘আরে, ওর বাবার অসুখ কেন?’
    ‘কেন?’
    ‘ওর বাবার তিন বিঘা জমি বিক্রি করে দিছে। দলিল সহ নিয়ে গেছে ওর বাবাকে। জোর করে সব করাইছে। এখন শোনা যাচ্ছে বাড়ির পাশের পুকুরটাও বিক্রি করার ধান্দায় আছে।  এখন খালি বাড়িভিটা বাকি আছে।’ 
    ‘আল্লাহ!’
  ‘অনেক টাকা হারছে জুয়ায়। অনেক টাকা ঋণ। আমি বললাম, পুকুর বিক্রি করলে যেন ওর বোনের কাছে বিক্রি করে। ওর দুলাভাইটা ভালো মানুষ।’ 
    ‘আচ্ছা!  এইজন্যই দেখলাম ফুপা আজমলকে রাগ দেখাচ্ছে। আগেও তো অসুস্থ্য ছিল।’
  ‘হুম, বিছানায় থাকে বেশিরভাগ। এইজন্য তো আজমল সুযোগ পাইছে। একদিনে গিয়ে কোন জুয়ারির কাছে দলিলসহ নিয়ে জমি বেঁচে দিয়ে আসছে। দলিল বন্ধক রেখে খেলেছিল। ঐদিনের পর থেকে চাচা অসুস্থ্য বেশি।’ 
    ‘আমার সাথে তো আজমলের দেখা হয়েছিল ঢাকায়। ওর চেহারায় এত কিছুর ছাপ দেখি নাই।’ 
    ‘আরে, ওইটা আর মানুষ নাই। অমানুষ হয়ে গেছে।’

ভেতর থেকে ঝগড়া কান্নাকাটির শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাসানের ভালো লাগছে না। মানিক চাচাকে বলে সে বের হয়ে এল। 

রাতে নয়টা বাজে প্রায়। হাসান ভেবেছিল, বাড়ি এসে মন ভালো হবে। কিন্তু আজমলের কাহিনী জেনে খুব অস্বস্তি লাগছে। এই অস্বস্তির মধ্যে কেমন যেন অপবিত্র অপবিত্র একটা ভাব। তার অস্থির লাগছে। বাইরে কীসের যেন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হাসান কান খাড়া করল। ছোটাছুটির শব্দ। হাসান বাইরে বেরিয়ে গেল। কফিল চাচা ছুটে যাচ্ছে। পেছনে চাচী। চাচী হঠাৎ কান্না করে উঠল। আশপাশের বাড়ি থেকে কেউ কেউ বের হয়ে এসেছে। কে যেন বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে? সবার চোখে জিজ্ঞাসা। হঠাৎ দেখা গেল গোলাপ চাচাকে। বলল, আজমলের বাপ নাকি মারা গেছে। সবাই কেমন চিৎকার করে উঠল। বড় চাচা বলল, হেই, কোথায় মারা গেছে রে? 
  ‘হাসপাতালে মারা গেছে।’
  ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিঊন।’ 
মানিক চাচার বাড়িতে কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। সবাই বের হয়ে আসছে একে একে। সবাই ছুটছে। হাসান কী করবে বুঝতে পারছে না। 


আজমলের বাবার জানাযা হলো সকাল সাড়ে আটটায়। হাসান আগে আগে কবরের কাছে চলে গেল। দেরি করলে কবরে মাটি দিতে অনেক সময় লাগবে। প্রচুর মানুষ হয়েছে জানাযায়। সবার ভিড় ঠেলে কবরে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এজন্য প্রথমে সুযোগ নেয়াই সুবিধার। লাশের খাটিয়া এখনো আসে নি। দূরে দেখা যাচ্ছে। কবরের উপরে দেয়ার জন্য বাঁশের ফালিগুলো আনা হচ্ছে। হাসানও হাত লাগাল কাজে। কবর ঠিক করছে মোজাফফর আলী। অত্র অঞ্চলে কবর খোড়ায় তার জুড়ি নেই। 


 

হাসানের মন আনচান করছে। আজ রাতেই ট্রেনে উঠতে হবে ঢাকা ফেরার জন্য। বাড়ি থেকে চলে যেতে ইচ্ছে করছে না। আর কয়েকটা দিন যদি থাকা যেত! যাক, আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল। সে যাচ্ছে শহীদ চাচার বাড়ি। চাচা বাড়িতেই আছেন। শহীদ মিয়া হাসানকে আগেই দেখে ফেলল। 
      ‘কীরে ব্যাটা, আছিস কেমন?’
 

(চলবে ইন শা আল্লাহ)


পূর্বের পর্বের লিংকঃ

https://fictionfactory.org/posts/13908

https://fictionfactory.org/posts/13909

https://fictionfactory.org/posts/13911

https://fictionfactory.org/posts/13923

https://fictionfactory.org/posts/13968

https://fictionfactory.org/posts/13969

https://fictionfactory.org/posts/15954

https://fictionfactory.org/posts/15955

https://fictionfactory.org/posts/15956

https://fictionfactory.org/posts/15957


লেখকের সব লেখা পড়তে,
https://fictionfactory.org/contributor/4237

Comments

    Please login to post comment. Login