রায়হান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার সামনে পিস্তল হাতে সেই বৃদ্ধ মানুষটি। যাকে সে এতদিন নিজের মৃত বাবা ভেবে এসেছে।
“তুমি কে?” রায়হান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ লোকটি মৃদু হাসলেন।
“আমি সেই মানুষ, যে তোকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।”
“আমার আসল নাম কী? রায়হান, নাকি রাহাত?”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“তোর নাম যাই হোক, তুই আমার কাছে সবসময় রায়হান ছিলি।”
মেহেরিন দ্রুত রায়হানের সামনে এসে দাঁড়াল।
“ওকে আর মিথ্যা বলবেন না! ১৭ বছর ধরে আপনি সবাইকে ধোঁকা দিয়েছেন।”
বৃদ্ধ লোকটি এবার পিস্তলটি মেহেরিনের দিকে তাক করলেন।
“তোমার মায়ের মতো তুমিও বেশি প্রশ্ন করছ।”
মায়ের কথা শুনে মেহেরিন চমকে উঠল।
“আমার মা কোথায়? আপনি জানেন তিনি কোথায়?”
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। বরং টেবিলের ওপর একটি পুরোনো চাবি ছুড়ে দিলেন।
“এই চাবি দিয়ে তোমরা সব সত্য জানতে পারবে। কিন্তু মনে রেখো, সত্য জানার পর আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকবে না।”
কথা শেষ করেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রায়হান চাবিটি হাতে তুলে নিল।
চাবির গায়ে ছোট করে লেখা—
নিচতলার ঘর।
বাড়িতে ফিরে রায়হান সরাসরি নিচতলায় চলে গেল।
সেই বন্ধ ঘর, যেটির কথা তার বাবা প্রথম ফোনেই নিষেধ করেছিলেন।
দরজায় তালা ঝুলছে। চারপাশে ধুলা আর মাকড়সার জাল।
রায়হান চাবিটি তালায় ঢোকাতেই তালা খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।
ঘরের মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের টেবিল। দেয়ালে অনেকগুলো ছবি। ছবিগুলোর মধ্যে রায়হান, মেহেরিন, তার বাবা এবং ডা. আরিফের ছবি রয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছবিটি ছিল একেবারে মাঝখানে।
ছবিতে তিনটি শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।
ছবির নিচে লেখা—
“প্রকল্প ৩১৭ — তিন শিশুর পরিচয় পরিবর্তন।”
রায়হান ছবিটি হাতে নিল।
টেবিলের ড্রয়ারে একটি নীল ফাইল পাওয়া গেল। ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা—
গোপন হাসপাতাল প্রতিবেদন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ বছর আগে তিনটি শিশুর জন্মের পর তাদের পরিচয় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল হাসপাতালের পরিচালক সামিউল হক, ডা. আরিফ এবং আরও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি।
রায়হান পরের পাতাটি খুলল।
সেখানে তিনটি নাম লেখা—
১. রায়হান — নীলা রহমানের সন্তান।
২. রাহাত — সাবিনা রহমানের সন্তান।
৩. মেহেরিন — অজ্ঞাত পরিচয়ের এক নারীর সন্তান।
কিন্তু তিনটি নামের পাশে লাল কালিতে লেখা—
“বর্তমান পরিচয় নিশ্চিত নয়।”
রায়হানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা একটি পুরোনো টেলিফোন বেজে উঠল।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
রায়হান ধীরে ধীরে রিসিভার তুলল।
ওপাশ থেকে এক নারীর কণ্ঠ ভেসে এল।
“রায়হান… তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ?”
“আপনি কে?”
নারীটি কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“আমি তোমার মা।”
রায়হানের হাত কেঁপে উঠল।
“আমার মা তো মারা গেছেন!”
“না, বাবা। তোমাকে মিথ্যা বলা হয়েছে। আমি ১৭ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।”
“আপনি কোথায়?”
নারীটি খুব নিচু গলায় বললেন—
“তোমাদের বাড়ির নিচেই।”
ঠিক তখনই ফোনের লাইন কেটে গেল।
রায়হান দেয়ালের দিকে তাকাল।
ঘরের পেছনে একটি বড় কাঠের আলমারি। আলমারিটি সরাতেই দেখা গেল মেঝেতে লুকানো একটি লোহার দরজা।
দরজার ওপর লেখা—
রুম ৩১৭ — প্রবেশ নিষেধ।
রায়হান দরজাটি খুলতে এগিয়ে গেল।
কিন্তু মেহেরিন হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
“দাঁড়াও! তুমি জানো না এর ভেতরে কী আছে।”
“আমার মা যদি ভেতরে থাকেন, তাহলে আমি যাবই।”
মেহেরিন চোখের পানি মুছে বলল—
“আমি তোমাকে একটা কথা বলিনি। ১৭ বছর আগে আমার মা নিখোঁজ হওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন, তোমার বাবা একা এই পরিকল্পনা করেননি। এই বাড়ির ভেতরেই আরেকজন ছিল।”
“কে?”
মেহেরিন উত্তর দেওয়ার আগেই লোহার দরজার ওপাশ থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক… টক… টক…
তারপর ভেসে এল একটি পরিচিত কণ্ঠ—
“রায়হান, দরজাটা খোল। আমি তোর আসল মা।”
রায়হান দরজার হাতল ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোনে বাবার পুরোনো নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল—
“দরজা খুলিস না। ওপাশে যে আছে, সে তোর মা নয়।”
রায়হান স্থির হয়ে গেল।
দরজার ওপাশ থেকে এবার সেই নারী হাসতে শুরু করলেন।
আর হাসির সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা তিনটি শিশুর ছবির চোখ থেকে রক্তের মতো লাল তরল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
চলবে…