রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
পুরোনো কবরস্থানের চারপাশে ঘন কুয়াশা। রায়হান মাটিতে পড়ে থাকা ফোনটির দিকে তাকিয়ে আছে। তার কানে বাবার শেষ কথাগুলো বারবার বাজছে।
“যাকে তুই মা ভাবছিস, সে ১৭ বছর আগেই মারা গেছে।”
হঠাৎ পেছন থেকে ছুরির ঝলক দেখা গেল।
রায়হান দ্রুত সরে গেল।
“কে তুমি? সামনে এসো!”
অন্ধকার থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
তার মুখ দেখে রায়হান স্তব্ধ হয়ে গেল।
লোকটি আর কেউ নয়—ডা. আরিফ।
“আপনি! এতদিন ধরে এসবের পেছনে আপনি ছিলেন?”
ডা. আরিফ ঠান্ডা গলায় হাসলেন।
“অবশেষে বুঝতে পেরেছ, রায়হান। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
“আমার মা কোথায়? আমার পরিচয় কী? আর ১৭ বছর আগে কী হয়েছিল?”
ডা. আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
“১৭ বছর আগে এই হাসপাতালে তিনটি শিশু জন্মেছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল নীলার সন্তান, একজন সাবিনার সন্তান, আর তৃতীয় শিশুটি ছিল এক অজ্ঞাত নারীর।”
“তাহলে পরিচয় বদলানো হয়েছিল কেন?”
“কারণ সামিউল হক তিনটি শিশুকে নিয়ে একটি ভয়ংকর পরিকল্পনা করেছিল। সে চেয়েছিল তিনটি শিশুর পরিচয় বদলে তাদের পরিবারগুলোর সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে।”
রায়হান অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আপনি তো তার সহযোগী ছিলেন!”
ডা. আরিফ মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ। আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, সামিউল শুধু শিশুদের পরিচয় বদলাতে চায়নি। সে তাদের একজনকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।”
“কাকে?”
ডা. আরিফ রায়হানের দিকে তাকালেন।
“তোমাকে।”
রায়হান পিছিয়ে গেল।
“কেন?”
“কারণ তোমার জন্মের সময় নীলা একটি গোপন নথি রেখে গিয়েছিল। সেই নথিতে সামিউলের অপরাধের সব প্রমাণ ছিল।”
রায়হান কিছু বলার আগেই কবরস্থানের অন্য পাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
“আরিফ, যথেষ্ট হয়েছে!”
সাদা আলোয় একজন মানুষ সামনে এগিয়ে এলেন।
রায়হান তাঁকে দেখে চিৎকার করে উঠল—
“বাবা!”
লোকটি ছিল তার পালক বাবা। যাকে এতদিন মৃত বলে জানানো হয়েছিল।
তিনি ধীরে ধীরে রায়হানের কাছে এসে দাঁড়ালেন।
“বাবা, তোকে এতদিন সত্যিটা বলতে পারিনি। আমি তোকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসেছি। কিন্তু ১৭ বছর আগে আমি যে শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম, তার আসল পরিচয় জানতাম না।”
রায়হানের চোখে পানি চলে এল।
“তাহলে আমার আসল মা কে?”
বাবা একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিতে নীলা, সাবিনা এবং আরেকজন নারী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন।
“তোর জন্মদাত্রী মা ছিল নীলা। কিন্তু জন্মের পর হাসপাতালের রেকর্ড বদলে দেওয়া হয়েছিল। নীলা সেই সত্য জানার পর সামিউল তাকে চুপ করিয়ে দেয়।”
রায়হান কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমার মা মারা গিয়েছিলেন?”
বাবা মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি তোকে বাঁচানোর জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন।”
ঠিক তখনই ডা. আরিফ পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলেন।
“সব মিথ্যা! আসল খুনি আমি নই!”
তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করলেন।
“এই রেকর্ডিং শুনলে সব বুঝতে পারবে।”
রেকর্ডার চালু হলো।
প্রথমে সামিউল হকের কণ্ঠ শোনা গেল—
“তিনটি শিশুর পরিচয় বদলে দাও। কেউ যেন জানতে না পারে কোনটি কার সন্তান।”
তারপর আরেকটি কণ্ঠ।
“আর নীলা?”
সামিউল উত্তর দিল—
“নীলা বেঁচে থাকলে সব শেষ। তাকে থামাতেই হবে।”
রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।
রায়হান বুঝতে পারল, এতদিন ধরে যে মানুষটিকে সে রহস্যের কেন্দ্র মনে করেছে, তার পেছনে ছিল আরও ভয়ংকর একজন।
“সামিউল এখন কোথায়?” রায়হান প্রশ্ন করল।
তার বাবা ধীরে ধীরে বললেন—
“সে এখানেই আছে।”
রায়হান চারদিকে তাকাল।
হঠাৎ কবরস্থানের গেটের কাছে একটি গাড়ির আলো জ্বলে উঠল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন সামিউল হক।
তিনি শান্তভাবে হাসলেন।
“অনেকদিন পর দেখা হলো, রায়হান।”
“আপনি আমার জীবন নষ্ট করেছেন!”
সামিউল হেসে বললেন, “আমি শুধু তোমার পরিচয় বদলেছি। তোমার জীবন নয়।”
রায়হান রাগে কাঁপতে লাগল।
“আমার মাকে কে হত্যা করেছে?”
সামিউল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
“আমি।”
চারদিকে নীরবতা নেমে এল।
“আর তোমার বাবাকে?”
“তাকেও আমি সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে বেঁচে গিয়েছিল।”
ঠিক তখনই মেহেরিন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে কবরস্থানে প্রবেশ করল।
“সামিউল হক! আপনাকে নীলা রহমানের হত্যা, জালিয়াতি এবং শিশুদের পরিচয় পরিবর্তনের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।”
সামিউল পালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে ধরে ফেলল।
ডা. আরিফও নিজের অপরাধ স্বীকার করলেন। তিনি তদন্তে সহযোগিতা করতে রাজি হলেন।
রায়হান ধীরে ধীরে বাবার কাছে এগিয়ে গেল।
“তুমি আমাকে এতদিন সত্যটা বলোনি কেন?”
বাবা চোখ মুছে বললেন—
“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম, তোকে হারাব।”
রায়হান বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
“তুমি আমার জন্মদাতা না হলেও, তুমি আমার বাবা।”
দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
১৭ বছরের রহস্যের অবসান হয়েছে। কিন্তু রায়হানের মনে তখনও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে।
মেহেরিন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“সব শেষ?”
রায়হান মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ। এবার সত্যিই সব শেষ।”
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“তুমি ভুল করছ, রায়হান। সামিউল আসল খুনি ছিল না। সে শুধু আমার নির্দেশ পালন করেছিল।”
রায়হান মেসেজটির দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রেরকের নাম—
নীলা রহমান।
তারপরই ফোনের স্ক্রিন নিভে গেল।
রায়হান ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল।
সত্যিই কি সব রহস্যের সমাধান হয়েছে?
নাকি ১৭ বছরের সেই ভয়ংকর রাতের পেছনে এখনও কেউ লুকিয়ে আছে?
সমাপ্ত।