হাসপাতালের সব আলো নিভে যাওয়ার পর রায়হান কিছুক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু দূরে কোথাও পানি পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
“মেহেরিন!” রায়হান চিৎকার করল।
কোনো উত্তর এল না।
হঠাৎ তার হাত কেউ শক্ত করে চেপে ধরল।
“চুপ! আমার সঙ্গে এসো।”
কণ্ঠটি মেহেরিনের।
রায়হান বুঝতে পারল, মেয়েটি তাকে হাসপাতালের পেছনের একটি ছোট ঘরে নিয়ে এসেছে। ঘরের ভেতরে একটি টেবিল, পুরোনো আলমারি আর দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটি ছবি।
মেহেরিন দরজা বন্ধ করে বলল, “এখানে আমরা নিরাপদ।”
“তুমি বলেছিলে তুমি তৃতীয় শিশু। কিন্তু তোমার কথা আমি কীভাবে বিশ্বাস করব?”
মেহেরিন ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করল।
“এটা আমার জন্মের হাসপাতালের রেকর্ড। এখানে আমার মায়ের নাম লেখা আছে—সাবিনা রহমান।”
রায়হান কাগজটি হাতে নিল।
সেখানে তিনটি শিশুর জন্মের তথ্য ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনটি শিশুর জন্মের সময় একই লেখা—রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
“তাহলে আমার মা নীলা, তোমার মা সাবিনা আর তৃতীয় শিশুটির মা কে ছিল?” রায়হান প্রশ্ন করল।
মেহেরিন উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
কেউ একজন দরজায় তিনবার টোকা দিল।
টক… টক… টক…
তারপর বাবার কণ্ঠ ভেসে এল।
“রায়হান, দরজা খোল। আমি জানি তুই ভেতরে আছিস।”
রায়হান দরজার দিকে এগোতেই মেহেরিন তাকে আটকে দিল।
“খুলবে না! এই কণ্ঠটা আসল নয়।”
বাইরে থেকে আবার শব্দ এল।
“রায়হান, তোর ছোটবেলার কথা মনে আছে? তুই যখন পাঁচ বছর বয়সী ছিলি, তখন একদিন পুকুরে পড়ে গিয়েছিলি। আমি তোকে বাঁচিয়েছিলাম।”
রায়হান থমকে গেল।
এই ঘটনা সত্যি। এমন কথা তার পরিবারের বাইরে আর কেউ জানার কথা নয়।
“তুমি কে?” সে দরজার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
বাইরে থেকে উত্তর এল—
“তোর অতীত।”
হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ভেতরে ঢুকে এল।
রায়হান খামটি খুলল।
ভেতরে ছিল তার শৈশবের কয়েকটি ছবি। প্রতিটি ছবিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একই অচেনা ছেলে।
শেষ ছবিটির পেছনে লেখা—
“রায়হান ও রাহাত—দুই ভাই, এক পরিচয়।”
রায়হানের মাথা ঘুরে উঠল।
“রাহাত কে?”
মেহেরিন ধীরে ধীরে বলল, “তোমার জন্মের পর হাসপাতাল থেকে যে শিশুটি নিখোঁজ হয়েছিল, তার নাম ছিল রাহাত।”
“তাহলে সে কি আমার ভাই?”
মেহেরিন মাথা নিচু করল।
“হয়তো। কিন্তু তোমার বাবা তাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন কি না, সেটা আমি জানি না।”
ঠিক তখনই ঘরের আলমারির ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।
খট… খট… খট…
রায়হান আলমারির দরজা খুলতেই ভেতরে একটি ছোট বাক্স দেখতে পেল। বাক্সের মধ্যে ছিল পুরোনো খেলনা, একটি লাল রঙের শিশুর জুতা এবং একটি ক্যাসেট।
ক্যাসেটের ওপর লেখা—
“রায়হানের পঞ্চম জন্মদিন—শেষ সত্য।”
রায়হান পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ারে সেটি চালু করল।
প্রথমে হাসির শব্দ। তারপর তার বাবার কণ্ঠ—
“আজ রায়হানের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু আজও আমি জানি না, আমার ঘরে যে শিশুটি বড় হচ্ছে, সে আসলে রায়হান, নাকি রাহাত।”
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।
একজন নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছেন—
“তুমি ভুল শিশুকে নিয়ে এসেছ। আমার আসল সন্তানকে ফিরিয়ে দাও!”
রায়হান ক্যাসেট বন্ধ করে দিল।
তার চোখে পানি।
“তাহলে এতদিন আমি কে ছিলাম?”
মেহেরিন তার হাত ধরল।
“তুমি যেই হও, তোমার জীবন তোমার নিজের। কিন্তু তোমার অতীতের সত্যটা জানতে হবে।”
হঠাৎ রায়হানের ফোনে একটি নতুন মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
“তোমার আসল নাম রায়হান নয়। তোমার জন্মের সময় দেওয়া নাম ছিল রাহাত।”
মেসেজের সঙ্গে একটি হাসপাতালের পুরোনো জন্মসনদের ছবি।
রায়হান ছবিটি বড় করে দেখল।
নাম: রাহাত
জন্মতারিখ: ১৪ নভেম্বর
সময়: রাত ৩টা ১৭ মিনিট
পিতার নাম: অজানা
আর নিচে মায়ের নামের জায়গায় লেখা—
নীলা রহমান।
রায়হান কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধ মানুষটি—যাকে সে এতক্ষণ নিজের মৃত বাবা ভেবেছিল।
বৃদ্ধের হাতে একটি পিস্তল।
তিনি শান্ত গলায় বললেন—
“এবার তোর অতীত জানার সময় শেষ। কারণ তুই সত্যিটা জানলে, আমাদের সবার মৃত্যু নিশ্চিত।”
চলবে…