মেহেরিনের শেষ কথাটা রায়হানের মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
“তোমার জন্মের রাতে যে শিশুটি মারা গিয়েছিল, সেটি তুমি ছিলে না।”
রায়হান কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে মেহেরিন। হাতে পুরোনো একটি ছবি, চোখে অদ্ভুত এক আতঙ্ক।
“তুমি কী বলতে চাইছ?” রায়হান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
মেহেরিন উত্তর দিল না। শুধু ঘরের কোণে রাখা কাঠের আলমারির দিকে তাকাল।
“তোমার বাবার ডায়েরিটা খুঁজে বের করো। ওখানেই সব লেখা আছে।”
রায়হান দ্রুত বাবার পুরোনো ডায়েরিটি বের করল। ধুলো জমে থাকা কালো মলাটের ডায়েরি। প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিল সাধারণ—কাজের হিসাব, পরিবারের কথা, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা।
কিন্তু মাঝের একটি পৃষ্ঠা খুলতেই তার বুক কেঁপে উঠল।
তারিখ: ১৭ বছর আগের ১৪ নভেম্বর।
লেখা ছিল—
“আজ রাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছি। হাসপাতালের রুম ৩১৭-তে দুটি শিশু জন্মেছিল। একজনের মা ছিল নীলা, অন্যজনের মা ছিল অজ্ঞাত পরিচয়ের এক নারী। কিন্তু সেই রাতের দুর্ঘটনার পর সবকিছু বদলে গেল।
আমি জানি, যা করেছি তার ক্ষমা নেই। কিন্তু সত্য প্রকাশ পেলে আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে।”
রায়হানের হাত কাঁপতে লাগল।
“নীলা… আমার মা!” সে ফিসফিস করে বলল।
ডায়েরির পরের পাতায় লেখা—
“ডা. আরিফ আমাকে বলেছিল, একটি শিশুকে সরিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি। আমি শিশুটিকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছি। অন্য শিশুটির কী হয়েছিল, আজও জানি না।”
হঠাৎ ঘরের বাতি দুবার জ্বলে নিভে গেল।
মেহেরিন পেছনে সরে দাঁড়াল।
“রায়হান, ডায়েরিটা বন্ধ করো!”
কিন্তু রায়হান তখন শেষ পাতাটি খুলে ফেলেছে।
সেখানে লাল কালিতে লেখা—
“যদি রায়হান কোনোদিন এই ডায়েরি পড়ে, তবে তাকে সত্যিটা জানাতে হবে। সে আমার ছেলে নয়। কিন্তু যে শিশুটিকে আমি নিজের ছেলে বলে বড় করেছি, সে-ই আসল বিপদের কারণ।”
রায়হানের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
ঠিক তখনই ডায়েরির ভেতর থেকে একটি ছোট ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন হাসপাতালের সামনে। পাশে ডা. আরিফ। আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পরা সেই রহস্যময় মানুষটি।
ছবির পেছনে লেখা—
“রাত ৩টা ১৭ মিনিট। দ্বিতীয় শিশুটি এখনও বেঁচে আছে।”
রায়হান ছবিটা শক্ত করে ধরে মেহেরিনের দিকে তাকাল।
“দ্বিতীয় শিশুটি কে?”
মেহেরিনের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“আমি জানি না… তবে একটা কথা জানি। সে এখনো তোমার কাছাকাছি আছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে রায়হানের ফোন বেজে উঠল।
সময়—রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম।
বাবা।
রায়হান কলটি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফিসফিসে কণ্ঠ ভেসে এল—
“ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়েছিস?”
রায়হান কথা বলতে পারল না।
কণ্ঠটি আবার বলল—
“তাহলে আয়নায় তাকাস না… তোর পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোর আসল পরিচয় জানে।”
কলটি কেটে গেল।
রায়হান ধীরে ধীরে মাথা ঘোরাল।
ঘরের আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্বের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন।
লোকটির মুখ হুবহু রায়হানের মতো।
কিন্তু তার চোখ দুটো রক্তের মতো লাল।
চলবে…