অধ্যায় ১১: শেষ ফোনকল
লোহার দরজার ওপাশ থেকে আবারও সেই নারীর কণ্ঠ ভেসে এল।
“রায়হান… বাবা, আমাকে বাঁচাও!”
রায়হান দরজার হাতল শক্ত করে ধরে আছে। তার মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে।
একদিকে ফোনে বাবার সতর্কবার্তা, অন্যদিকে দরজার ওপাশে নিজের মায়ের দাবি করা সেই কণ্ঠ।
“তুমি যদি সত্যিই আমার মা হও, তাহলে বলো—আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় খেলনাটা কী ছিল?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নারীটি বললেন, “লাল রঙের একটা গাড়ি। তুই সেটাকে সবসময় বালিশের নিচে রেখে ঘুমাতি।”
রায়হান চমকে উঠল।
এটা সত্যি। তার ছোটবেলার সেই খেলনাটির কথা সে নিজেও প্রায় ভুলে গিয়েছিল।
মেহেরিন ফিসফিস করে বলল, “দরজা খোলো না, রায়হান। ও কীভাবে জানে, সেটা আগে বুঝতে হবে।”
ঠিক তখনই রায়হানের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—বাবা।
রায়হান কল রিসিভ করল।
“বাবা, তুমি কোথায়? এখানে একজন নারী নিজেকে আমার মা বলে দাবি করছেন!”
ওপাশ থেকে ক্লান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
“রায়হান, মন দিয়ে শোন। তোর মা নীলা নয়, সাবিনাও নয়। তোর জন্মের সত্যটা আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছি।”
“তাহলে আমার আসল মা কে?”
বাবা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
“তোর মা সেই নারী, যাকে আমি ১৭ বছর আগে হাসপাতাল থেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“তিনি কি দরজার ওপাশে?”
“না! দরজার ওপাশে যে আছে, সে তোর মায়ের কণ্ঠ নকল করছে। কোনোভাবেই দরজা খুলবি না।”
হঠাৎ ফোনের ওপাশে প্রচণ্ড শব্দ হলো।
“বাবা! কী হয়েছে?”
বাবা দ্রুত বললেন, “আর একটা কথা… ডায়েরির শেষ পাতাটা আবার পড়িস। সেখানে একটা নাম আছে। সেই নামটাই সবকিছুর উত্তর।”
“কোন নাম?”
কিন্তু উত্তর আসার আগেই কল কেটে গেল।
রায়হান সঙ্গে সঙ্গে আবার কল করল।
নম্বর বন্ধ।
মেহেরিন বলল, “তোমার বাবার ফোন থেকে কল এসেছিল?”
রায়হান মাথা নাড়ল।
“তাহলে একটা বিষয় বুঝতে হবে। যদি তিনি সত্যিই বেঁচে থাকেন, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন?”
রায়হান দ্রুত বাবার ডায়েরিটি বের করল। শেষ পাতাটি খুলতেই আগের লেখার নিচে নতুন একটি লাইন চোখে পড়ল।
“সবকিছুর শুরু সাবিনাকে দিয়ে নয়। শুরু হয়েছিল নীলার মৃত্যুর রাত থেকে। আসল খুনি—সামিউল হক।”
রায়হান অবাক হয়ে গেল।
“সামিউল হক! কিন্তু সে তো বলেছিল সে আমার দ্বিতীয় ভাই!”
মেহেরিন ডায়েরিটি হাতে নিয়ে বলল, “তাহলে সে আমাদের সবাইকে মিথ্যা বলেছে।”
হঠাৎ লোহার দরজার ওপাশ থেকে জোরে ধাক্কা আসতে শুরু করল।
ধাম! ধাম! ধাম!
নারীটির কণ্ঠ এবার বদলে গেল।
“রায়হান! আর কতক্ষণ অপেক্ষা করাবি? দরজা খোল!”
রায়হান পিছিয়ে এল।
ঠিক তখনই মেঝের নিচ থেকে একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজটি ভাঁজ করা ছিল।
সে খুলে দেখল, সেখানে লেখা—
“যদি শেষ সত্য জানতে চাও, আজ রাত ৩টা ১৭ মিনিটে পুরোনো কবরস্থানে এসো। একা। — তোমার আসল মা”
রায়হান ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ৩টা ১২ মিনিট।
আর মাত্র পাঁচ মিনিট।
মেহেরিন বলল, “আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
রায়হান মাথা নাড়ল।
“না। এবার আমাকে একাই যেতে হবে।”
সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুরোনো কবরস্থানের দিকে ছুটল।
কবরস্থানে পৌঁছে দেখল, একটি কবরের পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শাড়ি পরা এক নারী। তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না।
“আপনি কি আমার মা?” রায়হান জিজ্ঞেস করল।
নারীটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
রায়হান তাঁর মুখ দেখেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
এই মুখ সে বহুবার দেখেছে।
তার শৈশবের ছবিতে।
তার বাবার ডায়েরিতে।
আর হাসপাতালের পুরোনো ছবিতে।
নারীটি কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“হ্যাঁ, বাবা। আমি তোর মা।”
রায়হান তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।
“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন?”
নারীটি উত্তর দিলেন না। শুধু একটি পুরোনো খাম তার হাতে দিলেন।
“এর ভেতরে সব সত্য আছে। কিন্তু মনে রাখিস, যে মানুষটাকে তুই এতদিন বাবা বলে ডাকিস, সে তোর জন্মদাতা নয়।”
রায়হান খামটি খুলল।
ভেতরে একটি ছবি এবং একটি চিঠি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—রায়হানের মা, ডা. আরিফ এবং সামিউল হক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু চিঠির শেষ লাইনটি পড়তেই রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।
“তোর জন্মের রাতেই আমি আসল খুনিকে চিনে ফেলেছিলাম। সে ছিল তোর নিজের পরিবারের একজন।”
রায়হান মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
শুধু কবরের ওপর পড়ে আছে একটি পুরোনো মোবাইল ফোন।
ফোনটি বেজে উঠল।
সময়—রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
রায়হান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তার বাবার কণ্ঠ ভেসে এল—
“রায়হান, তুই যাকে এখন মা ভাবছিস, সে আসলে ১৭ বছর আগেই মারা গেছে।”
রায়হানের হাত থেকে ফোনটি পড়ে গেল।
ঠিক তখনই কবরের পেছন থেকে কেউ একজন বেরিয়ে এল।
হাতে ছুরি।
মুখে হাসি।
আর সেই মুখটি দেখে রায়হান বুঝতে পারল—
এতদিন ধরে আসল খুনি তার একেবারে কাছেই ছিল।
চলবে…