আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রায়হানের পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল।
তার প্রতিবিম্বের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির মুখ হুবহু তার মতো। একই চোখ, একই নাক, একই চেহারা। শুধু লোকটির চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল।
রায়হান পেছনে ফিরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকাতেই লোকটি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“এতদিন পর দেখা হলো, রায়হান।”
রায়হান চিৎকার করে পেছনে সরে গেল।
মেহেরিন ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল।
“কী হয়েছে?”
রায়হান কাঁপা আঙুলে আয়নাটি দেখাল।
কিন্তু সেখানে এখন শুধু তার নিজের প্রতিবিম্ব।
মেহেরিন কিছুক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “সে আবার এসেছে।”
“কে সে?”
“যার কথা তোমার বাবা ডায়েরিতে লিখেছিলেন।”
রায়হান কিছু বলার আগেই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
‘আজ রাত ৩:১৭-তে পুরোনো হাসপাতালের রুম ৩১৭-তে এসো। সত্য জানতে চাইলে একা আসবে।’
মেসেজের নিচে একটি ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে রায়হানের বাবা হাসপাতালের একটি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কোলে একটি নবজাতক শিশু।
ছবির পেছনে তারিখ—১৪ নভেম্বর, ১৭ বছর আগে।
রায়হান ছবিটি মেহেরিনকে দেখাল।
ছবিটি দেখে মেহেরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“এই শিশুটি…”
“কী হয়েছে?”
মেহেরিন কাঁপা গলায় বলল, “এই শিশুটির জন্যই আমার মা নিখোঁজ হয়েছিল।”
রায়হান আর অপেক্ষা করল না।
রাত ৩টা বাজার কিছুক্ষণ আগে সে পুরোনো হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। মেহেরিন তাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রায়হান শুনল না।
হাসপাতালটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। ভাঙা জানালা, দেয়ালে শ্যাওলা আর চারদিকে অন্ধকার।
ভেতরে ঢুকতেই তার ফোনের আলো নিভে গেল।
হঠাৎ করিডরের শেষ মাথায় একটি দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
দরজার ওপরে লেখা—
রুম ৩১৭।
রায়হান ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মাঝখানে একটি পুরোনো টেবিল। তার ওপর রাখা একটি টেপ রেকর্ডার, একটি হাসপাতালের ফাইল এবং বাবার হাতের লেখায় একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“রায়হান,
যদি তুই এখানে এসে থাকিস, তাহলে বুঝব সত্য জানার সময় হয়েছে।
১৭ বছর আগে এই হাসপাতালে দুটি শিশু জন্মেছিল। একজন ছিল তোর মায়ের সন্তান। অন্যজন ছিল সেই নারীর, যার নাম কেউ জানত না।
সেদিন রাত ৩টা ১৭ মিনিটে হাসপাতালের বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারের সুযোগে একটি শিশুকে অন্য শিশুর জায়গায় রাখা হয়।
আমি সব দেখেছিলাম।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, যে শিশুটিকে আমি বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম, সে আমার পরিচিত শিশুটি ছিল না।
আমি এতদিন যাকে নিজের ছেলে বলে বড় করেছি, তার পরিচয়ও আমি জানি না।”
রায়হানের হাত থেকে চিঠিটি পড়ে গেল।
ঠিক তখনই টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হলো।
প্রথমে কিছু শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর তার বাবার কণ্ঠ।
“রায়হান, তুই যদি এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি আর বেঁচে নেই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—তোর জন্মের রাতের ঘটনা দুর্ঘটনা ছিল না। কেউ পরিকল্পনা করেছিল।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বাবা আবার বললেন—
“ডা. আরিফ একা ছিল না। তার সঙ্গে ছিল এমন একজন, যাকে তুই প্রতিদিন দেখিস।”
রায়হান থমকে গেল।
“সে তোর খুব কাছের মানুষ। তাকে বিশ্বাস করিস না।”
হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের পেছন থেকে একটি দরজা খোলার শব্দ হলো।
রায়হান ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন বৃদ্ধ ডাক্তার। হাতে পুরোনো একটি ফাইল।
“তুমি অবশেষে এসেছ, রায়হান,” বৃদ্ধ বললেন।
“আপনি কে?”
“আমি ডা. আরিফ।”
রায়হানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আপনি জানেন, ১৭ বছর আগে কী হয়েছিল?”
ডা. আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ফাইলটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
“জানি। কারণ সেই রাতে যে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সে আসলে মারা যায়নি।”
“তাহলে সে কোথায়?”
ডা. আরিফ ধীরে ধীরে রায়হানের দিকে তাকালেন।
“সে তোমার সামনেই আছে।”
রায়হান কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাসপাতালের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটি বেজে উঠল।
রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
আর ঠিক তখনই ডা. আরিফের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকের মানুষটি মুখ তুলে তাকাল।
রায়হান তার মুখ দেখে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।
কারণ লোকটি দেখতে হুবহু তার বাবার মতো।
কিন্তু তার বাবা তো ১৭ বছর আগেই মারা গেছেন!
লোকটি ধীরে ধীরে হাসল।
“রায়হান, এতদিন ধরে তুই ভুল মানুষকে বাবা বলে ডাকছিস।”
চলবে…