রায়হান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ অবিকল তার বাবার মতো। সেই একই চোখ, একই কণ্ঠ, এমনকি কপালের ডান পাশের পুরোনো দাগটিও একই।
“তুমি কে?” রায়হান কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল।
লোকটি মৃদু হাসল।
“এত বছর পর নিজের বাবাকে চিনতে পারছিস না?”
“অসম্ভব! আমার বাবা মারা গেছেন!”
“তোর বাবা মারা গেছেন—এটাই তোকে বিশ্বাস করানো হয়েছে।”
ডা. আরিফ দ্রুত এগিয়ে এলেন।
“ওর কথা বিশ্বাস কোরো না, রায়হান। এই মানুষটা তোমার বাবার পরিচয় ব্যবহার করছে।”
লোকটি এবার ডা. আরিফের দিকে তাকাল।
“চুপ করো, আরিফ। ১৭ বছর আগে তুমি যা করেছিলে, তার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে।”
রায়হান দুজনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল না কাকে বিশ্বাস করবে।
ঠিক তখনই তার ফোনে মেহেরিনের কল এল।
“রায়হান! তুমি কোথায়?”
“হাসপাতালের রুম ৩১৭-তে। এখানে একজন লোক এসেছে, দেখতে হুবহু আমার বাবার মতো।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মেহেরিন ফিসফিস করে বলল, “তাকে কিছুতেই তোমার কাছে আসতে দিও না।”
“কেন?”
“কারণ আমার মা বলেছিলেন, তোমার বাবার মৃত্যু হয়নি। তাঁকে সবাই মৃত ভেবেছে, কিন্তু তিনি আসলে…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কল কেটে গেল।
রায়হান আবার ফোন করল। কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।
লোকটি ধীরে ধীরে রায়হানের দিকে এগিয়ে এল।
“তোর মায়ের নাম নীলা, তাই না?”
রায়হান মাথা নাড়ল।
“তাহলে তুই জানিস না, তোর মা কী লুকিয়ে রেখেছিল?”
“কী লুকিয়েছিল?”
লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র বের করল।
সেখানে ছবির নিচে লেখা—
নাম: সামিউল হক
পদবি: হাসপাতাল পরিচালক
তারিখ: ১৪ নভেম্বর, ১৭ বছর আগে।
রায়হান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“কিন্তু ডায়েরিতে তো ডা. আরিফের কথা লেখা!”
লোকটি বলল, “আরিফ ছিল শুধু একজন চিকিৎসক। আসল পরিকল্পনাকারী ছিল অন্য কেউ।”
ডা. আরিফ হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “মিথ্যা! সব মিথ্যা!”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটি তুলে রায়হানের হাতে দিলেন।
“এটা দেখো। এখানে দুটি শিশুর জন্মের তথ্য আছে। কিন্তু একটি শিশুর পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
রায়হান ফাইল খুলল।
প্রথম শিশুর নামের জায়গায় লেখা—রায়হান।
দ্বিতীয় শিশুর নামের জায়গায় লেখা—নাম অজানা।
কিন্তু দুজনের জন্মের সময় একই—রাত ৩টা ১৭ মিনিট।
ফাইলের শেষ পাতায় একটি লাল সিল দেওয়া ছিল।
“একটি শিশু মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য শিশুর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।”
রায়হান মাথা তুলে তাকাল।
“দ্বিতীয় শিশুটি কে?”
সামিউল হক উত্তর দিলেন না।
বরং ধীরে ধীরে নিজের মুখের পাশের চামড়া টেনে ধরলেন। রায়হান বিস্ময়ে দেখল, লোকটির মুখে একটি পাতলা কৃত্রিম আবরণ রয়েছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার চেহারা বদলে গেল।
এবার তার মুখ আর রায়হানের বাবার মতো নয়।
তার মুখটি রায়হানের নিজের মতো।
একই চেহারা। একই চোখ।
শুধু বয়সে সে অনেক বড়।
লোকটি বলল, “আমি সেই দ্বিতীয় শিশু।”
রায়হান পিছিয়ে গেল।
“তাহলে তুমি আমার কে?”
লোকটি উত্তর দিল—
“আমি তোর যমজ ভাই।”
ঠিক তখনই হাসপাতালের করিডর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।
“না, রায়হান! ও তোমার ভাই নয়!”
দুজনেই দরজার দিকে তাকাল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরিন। তার হাতে একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটি রায়হানের হাতে দিয়ে সে বলল—
“এই ছবিটা ভালো করে দেখো। তোমাদের জন্মের রাতে তৃতীয় একজন শিশুও ছিল।”
রায়হানের চোখ ছবির ওপর আটকে গেল।
তিনটি নবজাতক।
তিনটি আলাদা নাম।
আর ছবির পেছনে লেখা—
“তৃতীয় শিশুটির পরিচয় কখনো প্রকাশ করা যাবে না।”
রায়হান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“তাহলে তৃতীয় শিশুটি কে?”
মেহেরিনের চোখে পানি জমে উঠল।
“রায়হান… সেই শিশুটি আমি।”
ঠিক তখনই হাসপাতালের সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে কেউ একজন রায়হানের কানে ফিসফিস করে বলল—
“তোমরা তিনজনের কেউই আসল পরিচয়ে বেঁচে নেই।”
চলবে…