রাত ৩টা ১৬ মিনিট।
রায়হান নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে থেকে ভেসে আসা শিশুর কান্না ধীরে ধীরে থেমে গেল।
সে দরজাটি খুলল।
কিন্তু বাইরে কেউ নেই।
শুধু করিডোরের শেষ প্রান্তে রাখা পুরোনো আয়নাটির সামনে একটি ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
রায়হান চোখ কচলে আবার তাকাল।
ছেলেটি দেখতে অবিকল তার ছোটবেলার মতো।
"কে তুমি?" রায়হান চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু আয়নার ভেতর থেকে আঙুল তুলে নিচতলার বন্ধ ঘরটির দিকে ইশারা করল।
রায়হান ধীরে ধীরে আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ।
কালো পোশাক পরা সেই অচেনা লোক।
রায়হান দ্রুত পেছনে ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকাতেই লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
"আজ রাতেই হাসপাতালে যাও। দেরি করলে সব প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাবে।"
মেসেজের সঙ্গে একটি ঠিকানাও দেওয়া।
রায়হান আর সময় নষ্ট করল না।
বাড়ির বাইরে বেরিয়ে সে একটি গাড়ি ভাড়া করে পুরোনো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
হাসপাতালটি শহরের এক নির্জন এলাকায়। বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে আছে।
গেটের সামনে পৌঁছাতেই সে লক্ষ্য করল, গেটের তালাটি খোলা।
ভেতরে প্রবেশ করতেই বাতাসে পুরোনো ওষুধ আর স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ পেল।
হঠাৎ অন্ধকার করিডোর থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।
"তুমি কি রায়হান?"
"জি। আপনি কে?"
বৃদ্ধ লোকটি চারদিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
"আমি সেই হাসপাতালের পুরোনো কর্মচারী। তোমার জন্মের রাতের কথা আমার মনে আছে।"
রায়হানের গলা শুকিয়ে গেল।
"আমার আসল বাবা-মা কারা?"
বৃদ্ধ লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিতে দুইজন নবজাতক শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।
"সেই রাতে হাসপাতালে দুটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সকালে একটি শিশু নিখোঁজ হয়ে যায়।"
"কোন শিশুটি?"
বৃদ্ধ লোকটি রায়হানের চোখের দিকে তাকালেন।
"তুমি।"
রায়হান কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না।
"তাহলে আমাকে কে নিয়ে গিয়েছিল?"
বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই হাসপাতালের পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
তারপর লাউডস্পিকারে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"রায়হান, তুমি এখানে আসবে জানতাম।"
এটি তার বাবার কণ্ঠ।
বৃদ্ধ লোকটি আতঙ্কিত হয়ে ফিসফিস করে বললেন,
"সে আবার ফিরে এসেছে!"
"কে ফিরে এসেছে?"
বৃদ্ধ লোকটি কাঁপা হাতে একটি কক্ষের দিকে ইশারা করলেন।
কক্ষটির দরজায় লেখা—
রুম নম্বর ৩১৭।
রায়হান দরজার হাতলে হাত রাখতেই ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলল,
"বাবা... এতদিন পর তুমি আমাকে খুঁজে পেলে?"
দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে একটি খালি হাসপাতালের বিছানা।
আর বিছানার পাশে রাখা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
রায়হান, তার বাবা এবং সেই অচেনা কালো পোশাকের মানুষ।
ছবির পেছনে লেখা ছিল—
"এই তিনজনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই মৃত।"
চলবে...