রুম নম্বর ৩১৭-এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রায়হান বুঝতে পারছিল না, ভেতরে ঢুকবে নাকি পালিয়ে যাবে।
বিছানার পাশে রাখা ছবিটা তার মাথায় হাজারো প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
সে নিজে, তার বাবা এবং কালো পোশাকের সেই অচেনা লোক।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা কথাটি তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।
"এই তিনজনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই মৃত।"
"আপনি জানেন এই লোকটি কে?" রায়হান বৃদ্ধ হাসপাতালকর্মীকে জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ লোকটি কাঁপা গলায় বললেন, "তার নাম আরিফ। সে এই হাসপাতালের একজন ডাক্তার ছিল। কিন্তু ১৭ বছর আগে এক রাতে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।"
"তাহলে আমার বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?"
বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
"রায়হান!"
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
একটি সাদা পোশাক পরা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চুল এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে।
রায়হান মেয়েটিকে চিনতে পারল।
এটি সেই মেয়েটি, যাকে সে নিজের বাড়ির বন্ধ ঘরে দেখেছিল।
"তুমি এখানে কীভাবে এলে?" রায়হান প্রশ্ন করল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
"তোমাকে সত্যিটা জানাতে এসেছি।"
বৃদ্ধ লোকটি মেয়েটিকে দেখেই পিছিয়ে গেলেন।
"অসম্ভব! তুমি তো ১৭ বছর আগে মারা গিয়েছিলে!"
মেয়েটি বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"আপনি এখনো বেঁচে আছেন? তাহলে এতদিন সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?"
রায়হান দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমরা একে অপরকে চেনো?"
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
"আমার নাম মেহরিন। ১৭ বছর আগে এই হাসপাতাল থেকে আমি নিখোঁজ হয়েছিলাম। সবাই ভেবেছিল আমি মারা গেছি। কিন্তু আসল ঘটনা কেউ জানে না।"
"তুমি আমার সঙ্গে কীভাবে জড়িত?"
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"তোমার জন্মের রাতে শুধু একটি শিশু নিখোঁজ হয়নি, রায়হান। আরও একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল।"
"কে?"
"আমার মা।"
রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।
মেহরিন তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে একজন নারী একটি শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
নারীটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে রায়হান স্তব্ধ হয়ে গেল।
তিনি তার নিজের মা!
"এই ছবিটি কোথায় পেলে?" রায়হান জিজ্ঞেস করল।
মেহরিন উত্তর দিল, "আমার মায়ের পুরোনো বাক্সে।"
ঠিক তখনই হাসপাতালের সব জানালা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধ লোকটি চিৎকার করে উঠলেন।
"আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে! সে এসে গেছে!"
"কে এসেছে?" রায়হান প্রশ্ন করল।
বৃদ্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
"ডাক্তার আরিফ!"
হঠাৎ রায়হানের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা—বাবা।
সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।
"রায়হান, মেহরিনকে বিশ্বাস করিস না। সে যা বলছে সব মিথ্যা।"
রায়হান মেহরিনের দিকে তাকাল।
মেয়েটি এবার কাঁদতে শুরু করেছে।
"তোমার বাবা মিথ্যা বলছেন।"
"কেন?"
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
"কারণ তোমার বাবা আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশ থেকে বাবার হাসির শব্দ ভেসে এল।
তারপর একটি বাক্য—
"অবশেষে তোরা দুজন একসঙ্গে হলি। এবার খেলা শুরু হবে।"
কলটি কেটে গেল।
রায়হান বুঝতে পারল, এতদিন সে যে সত্যের সন্ধান করছিল, সেটি আসলে একটি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের অংশ।
কিন্তু মেহরিনের শেষ কথাটি তার সমস্ত চিন্তা থামিয়ে দিল।
"রায়হান, তোমার জন্মের রাতে যে শিশুটি মারা গিয়েছিল, সেটি তুমি ছিলে না।"
চলবে...