শালবন শহরের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি গ্রাম—চরনগর। গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল আবদুল কাদেরের পুরোনো টিনের বাড়ি। বাড়িটির সামনে বিশাল একটি আমগাছ, পেছনে পুকুর, আর পুকুরের ওপারে প্রায় পাঁচ বিঘা জমি। জমিটুকুই ছিল তার পরিবারের শেষ সম্বল। বাবা মারা যাওয়ার আগে কাদেরকে বলেছিলেন, “এই মাটি ছেড়ে যাস না। এই মাটির নিচে আমাদের তিন পুরুষের ঘাম আছে।” কথাটি কাদের কখনো ভুলেনি।
কিন্তু এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখতে পেল, জমির মাঝখানে বাঁশের খুঁটি পুঁতে লাল কাপড় বাঁধা হয়েছে। কয়েকজন অচেনা লোক জমি মাপছে। কাদের দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই একজন ঠান্ডা গলায় বলল, “এই জমি এখন আমাদের।”
কাদের হাসতে হাসতে নিজের দলিল বের করল। লোকটি দলিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “দলিল আপনার কাছে আছে, কিন্তু জমি আপনার নামে নেই।”
কথাটি শুনে কাদেরের মুখ শুকিয়ে গেল।
সেদিন বিকেলে সে ভূমি অফিসে গেল। পুরোনো রেকর্ড বের করা হলো। সেখানে দেখা গেল, তার পাঁচ বিঘা জমি তিন মাস আগে এক ব্যবসায়ীর নামে হস্তান্তর হয়েছে।
কাদেরের হাত কাঁপতে লাগল।
“আমি তো কোনো জমি বিক্রি করিনি!”
কর্মচারীটি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি না করলেও কাগজ বলছে করেছেন।”
সেদিন রাতেই কাদেরের দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
ভেতরে একটি সাদা কাগজ।
মাত্র তিনটি শব্দ—
“মাটি আমাদের হবে।”
আর নিচে আঁকা ছিল একটি কালো বৃত্ত।
কাদের জানত না, এই কালো বৃত্তই শালবনের বহু মানুষের জীবনে মৃত্যুর ছায়া হয়ে নেমে এসেছে।