মজনু · ৫–৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
পাঁচ তারিখে বিক্রি হইছিল আর দশটা দিনের মতোই। চা একশো বিরাশি কাপ, সিগারেটের প্যাকেট খুলছিলাম সাতটা, বিস্কুট গেছে ছয় প্যাকেট। রায় হইছে শুনলাম দুপুরের পর। কে যেন দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া বলল, যাবজ্জীবন। আরেকজন বলল, এইটা আবার কেমন বিচার। তারপর দুইজনেই চা খাইয়া গেল। একজন নগদ দিল, আরেকজনের নাম খাতায় উঠল।
আমার কাছে দিনের খবর সন্ধ্যায় বোঝা যায়। লোক যদি চা খাইয়া তাড়াতাড়ি উঠে, বুঝি বাসায় যাওয়ার তাড়া আছে। যদি এক কাপের পরে আরেক কাপ নেয়, বুঝি বাইরে কিছু চলতেছে। পাঁচ তারিখে তেমন কিছু বুঝি নাই। আজিজের দোকানগুলা বন্ধ হইল নিজের সময়ে। আমি ফ্লাস্ক ধুইয়া নয়টা চল্লিশে ঝাঁপ নামাইলাম। মিরপুরের বাস ধরতে দশটা পাঁচ হইছিল।
পরদিন দুপুরেও স্বাভাবিক। বিকাল পাঁচটার পর লোক জমতে লাগল। প্রথমে ভাবলাম চারুকলায় কোনো অনুষ্ঠান আছে। ছেলে-মেয়ের হাতে কাগজ, কারও কপালে পতাকা আঁকা। পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে প্রথম ফ্লাস্ক শেষ। সাধারণ দিনে ওই ফ্লাস্ক সাতটা পর্যন্ত যায়। আমি পাশের দোকানের বাচ্চুকে বললাম, চুলায় পানি চাপা। সে বলল, দুধ নাই। দুধ আনতে পাঠাইলাম।
সাড়ে ছয়টার মধ্যে ছয়টা ফ্লাস্ক শেষ। আমার মোট ফ্লাস্ক আটটা। দুইটা তখনও ভরা, কিন্তু লোকের লাইন দোকান ছাড়াইয়া ফুটপাতে। কেউ দাম জিজ্ঞেস করে না। চা তখন ছয় টাকা কাপ। রং চা চার। আমি ওই দিন ছয় টাকার চা-ই দিছি বেশি, কারণ দুধের চায়ে দুই টাকা লাভ বেশি থাকে। মানুষের দাবি কী, আমার জানা নাই; চিনি, দুধ আর পাতার হিসাব আমি জানি।
সাতটার আগে সব শেষ হইল। জীবনে প্রথম আটটা ফ্লাস্ক সাতটার মধ্যে খালি দেখলাম। দোকান বাচ্চুর হাতে দিয়া নিউ মার্কেটের গলির দিক দৌড় দিলাম। এক ক্যান দুধ, দুই কেজি চিনি, চায়ের পাতা, কাগজের কাপ। ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়া যায় না। মানুষ বসে আছে। কেউ গান গায়, কেউ চিৎকার করে। মাঝখান দিয়া আমি মাল মাথায় নিয়া যাইতেছি, একজন বলল, ভাই, সাবধানে। এই ভিড়ের মধ্যে আমারে ভাই ডাকছে, এইটা ভালো লাগল। তারপরই মনে হইল, ক্যানের দুধ গরমে নষ্ট হইলে আটশো টাকা যাবে।
দোকানে ফিরা আবার পানি বসাইলাম। কাপ ধোয়ার সময় নাই, কাগজের কাপ দিলাম। আটটার দিকে খাতার পুরান পাতা ভইরা গেল। পাতার নিচে জায়গা না থাকলে আমি সাধারণত পরদিন নতুন পাতা খুলি। ওই দিন পারলাম না। নতুন পাতার উপরে তারিখ লিখলাম—৬/২/১৩। নিচে নাম উঠতে লাগল। কবির ভাই দুই চা, জসিম বইঘর বারো, শওকত ভাই পাঁচ। তিনজনের নাম জানি না, চেহারা চিনি; তাদের লিখলাম লাল গেঞ্জি, দাড়িওয়ালা, ক্যামেরা। পরে নাম জাইনা নেব। খাতায় মানুষ আগে নাম না, পাওনা। পাওনা শোধ হইলে নাম হয়।
সাড়ে আটটায় আবার মাল শেষ। বাচ্চু বলল, আর পারব না। তার হাত গরম পানিতে লাল। আমি বললাম, পারবা না তো আজকের মজুরি অর্ধেক। সে গালি দিল মনে মনে, মুখে দিল না। দোকান বন্ধ কইরা আবার দৌড়াইলাম। এইবার দুধ পেলাম কম। পাশের এক দোকানি নিজের জন্য রাখা প্যাকেট বেশি দামে দিল। লাভ কমল, কিন্তু দোকান বন্ধ রাখলে পুরাটাই লোকসান।
ফিরা দেখি দোকানের সামনে একজন দাঁড়াইয়া। বয়স চল্লিশ পার, অফিসের জামা ইন করা, চামড়ার জুতা ধুলায় সাদা। লোকটা আমার দিকে এমনভাবে তাকাইল যেন আমাকে চিনে, কিন্তু কথা কইতে পারতেছে না। আমিও তাকাইলাম। চেহারায় বয়স পড়ছে, চুলের পাশে সাদা, তবু চোখ দুইটা কোথায় যেন দেখা।
আমি বললাম, ‘চা দিব, ভাই?’
সে মাথা নাড়ল। বসার জায়গা নাই। কাউন্টারের পাশে দাঁড়াইল। আমি চা ঢালতে ঢালতে আবার তাকাইলাম। নব্বইয়ের দিকে আজিজে যারা আসত, তাদের অনেকের মুখ আমি ভুলে গেছি। তখন আমার দোকান ছিল না, অন্যের দোকানে কাজ করতাম। তেরো বছর বয়সে নেত্রকোনা থিকা ঢাকায় আইছি; মানুষের মুখ ধরতে না পারলে ওই বয়সে খাওয়া জোটে না। এই চোখ আমি চিনতাম। নামটা আসতে একটু সময় লাগল।
‘সুমন ভাই না?’
লোকটা তাকাইয়া থাকল, তারপর বলল, ‘মজনু?’
আমি হাসলাম। ‘চিনছেন তাইলে। ভাবছিলাম বড়লোক হইয়া ভুইলা গেছেন।’
সে বলল, ‘তোমার নিজের দোকান?’
‘দশ বছর হইল। কিস্তি শোধ করছি দুই হাজার সাতেই। এখন পুরা আমার।’
আমি কাপটা দিলাম। সে টাকা বাইর করল। নিলাম না। এত বছর পরে মানুষ আইছে, এক কাপ চায়ের ছয় টাকা নিলে চলে? তাছাড়া আশপাশে লোক আছে। তারা দেখবে মজনুর পুরান পরিচিত। এইটাও হিসাবের মধ্যে পড়ে।
সে আবার টাকা দিতে চাইল। আমি বললাম, ‘আরে রাখেন, ভাই। কত দিন পরে আইছেন।’
পেছন থিকা তিনজন একসঙ্গে চা চাইল। আমি ঘুরে গেলাম। বাচ্চু কাপ দিতেছে, কিন্তু চিনি কম-বেশি করে। দুইটা কাপ ফেরত আসল। আমি তাকে ধমক দিলাম। আবার ওই লোকের দিকে ফিরতে ফিরতে দেখি সে রাস্তার মানুষের দিকে তাকায়। মুখে হাসি নাই, রাগও নাই। যেন এখান থেকে অনেক দূরে কিছু দেখতেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কই থাকেন এখন?’
সে একটা এলাকার নাম বলল। অফিসের কথা বলল। তিনটা বাক্য। তারপর চা শেষ করল।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘খাতায় লিখা রাখি?’
আগে এমন বললে সে হাসত। অন্যরাও হাসত। সে হাসল না। পকেট থেকে ছয় টাকা বের করে কাউন্টারে রাখল। আমি কী করব বুঝলাম না। টাকাটা ফেরত দিলে লোকের সামনে টানাটানি হয়। নিয়া ক্যাশবাক্সে রাখলাম। আমার হাসি থাইমা গেল।
সে চলে গেল ভিড়ের দিকে না, উল্টা দিকে। আমি তারে আর দেখলাম না। দেখার সময়ও ছিল না। দশটার মধ্যে আর চার ফ্লাস্ক গেল। রাত এগারোটায় দোকান বন্ধ কইরা হিসাব করলাম। দুইবার মাল আনতে দৌড়াইছি। বাচ্চুকে বাড়তি একশো দিলাম; না দিলে পরদিন আসবে না। আয় হইছে তিন হাজারের উপরে, খরচ বাদে লাভ এমন যে বাসায় বউরে বললে বিশ্বাস করবে না।
মিরপুরের বাসে বসার জায়গা পাই নাই। হাতে দুধের ক্যানের গন্ধ, শার্টে চায়ের দাগ। বাসের ভিতরেও ওই মোড়ের কথা। দুইটা ছেলে দাঁড়াইয়া স্লোগান নিয়া কথা কইতেছিল। একজন বলল, কাল থিকা আরও মানুষ হবে। আরেকজন বলল, যত দিন লাগে থাকবে। আমি জানালার কাচে মাথা ঠেকাইয়া হিসাব করলাম—কাল বারো কেজি চিনি লাগতে পারে, দুধ তিন ক্যান, কাগজের কাপ চার বান্ডিল। যত দিন তারা থাকবে, তত দিন আমার মাল লাগবে। তারা কী পাইলে উঠবে, আমি জানি না।
বাসায় ঢুকতে রাত বারোটার কাছাকাছি। বউ দরজা খুলেই বলল, ‘ফোন ধরো না ক্যান?’
আমি পকেট থিকা ফোন বাইর করলাম। চারটা মিসকল। শব্দের মধ্যে শুনি নাই। সে ভাত গরম করতে করতে দোকানে গোলমাল হইছে কি না জিজ্ঞেস করল। বললাম, গোলমাল না, লোক। অনেক লোক। ক্যাশের টাকা টেবিলে রাখলাম না; দোকানের টাকা ঘরে গুনলে বাচ্চারা দেখে। বাথরুমে হাত-মুখ ধুইয়া ব্যাগের নিচে রাখলাম।
বড় ছেলে তখনও জাগা। গণিতের খাতা নিয়া বসছে। বলল, বাবা, এই ভাগটা পারি না। আমি খাতা দেখলাম। ভগ্নাংশ। পাঁচের নিচে সাত, পাশে আরেকটা। আমার মাথায় তখন দুধের ক্যান, কাপের বান্ডিল। বললাম, ‘কাল মাস্টাররে জিগাইবা।’ সে মুখ নামাইয়া ফেলল। বউ রান্নাঘর থিকা বলল, ‘মাস্টাররে জিগাইতে পারলে কোচিং লাগে ক্যান?’
আমি রাগ কইরা বললাম, ‘দোকান থিকা আইসা এখন অঙ্ক করুম?’
ছেলেটা খাতা বন্ধ করল। ভাত খাইতে খাইতে মনে হইল, দোকানে যেই লোকটা আসছিল সে যদি এখনও আগের মতো বই পড়ত, এই অঙ্ক হয়তো পারত। নব্বইয়ের দিকে সে আর তার বন্ধুরা চায়ের টাকা দিতে পারত না, কিন্তু বইয়ের কথা কইত অনেক। আমি কাপ ধুইতাম, তবু শুনতাম। কে কোন দেশে কী লিখছে। ওই সব কথা দিয়া সংসার চলে না, এইটা তখনও জানতাম। কিন্তু বড় ছেলে খাতা বন্ধ করলে মনে হইল, সংসার চললেই সব চলে না।
ভোরে ঘুম ভাঙল বউয়ের অ্যালার্মে। পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। আবার বাজারে যাইতে হবে। সে বলল, ‘কাল কত বিক্রি?’
আমি বললাম, ‘চলছে।’
সঠিক অঙ্ক বললাম না। বেশি শুনলে স্কুলের বেতন, গাইড, ফ্রিজ মেরামত—সব একসঙ্গে সামনে আসে। লাভ আগে দোকানে থাকে, পরে ঘরে যায়। এই নিয়ম না রাখলে ২০০৭ সালে কিস্তি শেষ হইত না।
সকালে বাজারে দুধের দোকানি আমাকে দেখেই হাসল। ‘আজও লাগব?’
‘দাম ঠিক রাখলে লাগব।’
সে বলল, ‘দাম বাজারে ঠিক হয়।’
আমি বললাম, ‘বাজার কার বাপের?’
শেষে আগের রাতের চেয়ে পাঁচ টাকা কমে নিলাম। চিনি নগদ, পাতা আধা বাকিতে। দোকানে পৌঁছে দেখি মোড় পুরো খালি না। কয়েকজন রাত কাটাইছে। চাদর গায়ে ফুটপাতে ঘুমায়। একজন উঠে দাঁত মাজতেছে। আমি ঝাঁপ তুলতেই সে চা চাইল। দিনের প্রথম কাপ। টাকা দিতে গিয়ে পকেট হাতড়াইল, তারপর বলল পরে দেবে। নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে অবাক হইল, তবু নাম বলল। খাতার নতুন পাতায় দিনের প্রথম বাকি উঠল।
খাতার নতুন পাতায় চৌত্রিশটা নাম। কয়েকটার পাশে কোনো অঙ্ক নাই; ভিড়ের মধ্যে লিখতে ভুলছি। একটা লাইনে লিখছিলাম ‘সুমন ভাই—চা’, পরে চায়ের পাশে ছয় টাকার দাগ টানছি, কারণ টাকা দিছে। দাগ টানা মানে শোধ।
পাতা বন্ধ করার আগে লোকটার মুখ মনে পড়ল। হাসে নাই কেন? আমার ঠাট্টা খারাপ হইছে? নাকি জীবনে এমন কিছু হইছে যে পুরান কথা শুনলে হাসি আসে না? ভাবলাম। ভেবে কিছু পাইলাম না। খাতাটা বন্ধ করলাম।