FF.
অধ্যায় ৫ · একদিন Book page

Chapter 5

অধ্যায় ৫ · একদিন

Oct 18, 2026 8 min read

সাইফুল · ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আমাকে রাশেদ ভাই নিয়ে গিয়েছিল। তিনি আমার চাচাতো ভাই, ইসলামপুরে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। আগের রাতে ফোন করে বলেছিলেন, ‘ঢাকায় থেকেও কিছু দেখিস না। কাল চল।’

আমি বলেছিলাম, ‘উস্তাদের কাছে ছুটি চাইতে হবে।’

তিনি বললেন, ‘দুপুরের পরে তো তোর সবক নাই।’

কথাটা পুরো ঠিক ছিল না। যোহরের পরে আমাদের মুতালাআর সময়, তারপর আসর পর্যন্ত পুরোনো সবক দৌর করতে হয়। বাইরে যেতে হলে দায়িত্বে থাকা উস্তাদকে বলতে হয়। আমি বলেছিলাম বই কিনতে নীলক্ষেত যাব। উস্তাদ বললেন মাগরিবের আগে ফিরতে। আমি মাথা নেড়ে বের হলাম। মিথ্যা বলার সময় আমার কান গরম হয়ে যায়। সেদিনও হয়েছিল।

আমরা বাসে উঠেছিলাম দুপুরের পরে। রাশেদ ভাই ভাড়া দিলেন। শাহবাগের আগে বাস থেমে গেলে হাঁটলাম। এত মানুষ আমি বিশ্ব ইজতেমা ছাড়া দেখিনি। কিন্তু ইজতেমায় সবাই একই দিকে যায়, একই সময়ে নামাজ পড়ে। এখানে কেউ বসে, কেউ দাঁড়ায়, কেউ গান করে, কেউ কাগজে লিখে। ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি বসেছিল। কয়েকজন মেয়ে মাথায় কাপড় দেয়নি। আমার অদ্ভুত লাগল। ভয় লাগেনি, রাগও না। মনে হলো এইটা ঢাকা শহরের ভিতরে আরেকটা দেশ, যার রাস্তা আমি আগে দেখিনি।

রাশেদ ভাই স্লোগান দিলে আমিও ঠোঁট নড়ালাম। সব কথা বুঝিনি। একজন মাইকে যুদ্ধের কথা বলছিলেন। পাশে বসা বৃদ্ধ কাঁদছিলেন। আবার একটু পরে কয়েকজন হাসতে হাসতে ছবি তুলল। একই জায়গায় কান্না আর ছবি তোলা কীভাবে হয় বুঝলাম না।

একটি ছেলে আমাদের কপালে লাল-সবুজ আঁকতে চাইল। রাশেদ ভাই আঁকালেন। আমি না করলাম। রং লাগিয়ে মাদ্রাসায় ফিরলে দেখা যাবে। তিনি হেসে বললেন, ‘তুই সবকিছুতে এত ভয় পাস কেন?’

আমি বললাম, ‘ভয় না।’ আসলে ভয়ই। কী নিয়ে ভয়, তা বলতে পারিনি।

আসরের আজান শুনে আমি নামাজের জায়গা খুঁজলাম। একটু দূরে কয়েকজন জামাত করছিলেন। তাদের সঙ্গে দাঁড়ালাম। নামাজ শেষে একজন দাড়িওয়ালা লোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায় পড়ি। মাদ্রাসার নাম বলতেই তিনি মাথা নেড়ে বললেন, ‘আচ্ছা।’ তাঁর আচ্ছা বলার ভঙ্গি বুঝিনি। তারপর তিনি চলে গেলেন।

নামাজের আগে অজুর পানি খুঁজতে গিয়ে একটি ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, গলায় পরিচয়পত্র ঝুলছিল। আমাকে কল দেখিয়ে বলল, ‘ভাই, এখানে করেন।’ আমি অজু করছিলাম, সে পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বন্ধুদের ফোন করছিল। আমার টুপি নিচে পড়ে গেলে তুলে দিল। নাম জিজ্ঞেস করেনি। আমিও না। পরে ভিড়ের মধ্যে তাকে মঞ্চের দিকে দৌড়াতে দেখলাম। তখন মনে হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে আর মাদ্রাসার তালিব একই কলে অজু করলে পানি আলাদা হয় না। কথাটা কাউকে বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, তবু মনে ছিল।

রাশেদ ভাই আমাকে নানা জিনিস দেখাচ্ছিলেন। দেয়ালে আঁকা কার্টুন, কাগজে লেখা কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের ছবি। একটি ছবির সামনে তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমাদের আব্বারা এসব দেখছে।’ তাঁর আব্বা, আমার চাচা, ১৯৭১ সালে শিশু ছিলেন। তিনি কী দেখেছেন আমি জানতাম না। আমাদের বাড়িতে যুদ্ধের গল্প খুব কম বলা হয়। দাদা মারা গেছেন আমার জন্মের আগে। ইতিহাস আমরা বইয়ের তারিখ দিয়ে জানতাম। এখানে লোকজন নিজেদের পরিবারের কথা বলছিল। আমি শুনে বুঝতে পারছিলাম না কোনটা ইতিহাস, কোনটা স্মৃতি।

একদল ছেলে গান ধরলে রাশেদ ভাইও গাইলেন। আমি শব্দ জানতাম না। সুরের মধ্যে কয়েকটি বাংলা শব্দ স্পষ্ট, বাকিগুলো মানুষের গলায় মিশে যায়। আমার সবকে আরবি বাক্যের উচ্চারণ ভুল হলে উস্তাদ থামিয়ে দেন। এখানে শত মানুষের উচ্চারণ আলাদা, তবু কেউ থামায় না। এই নিয়মহীন একসঙ্গে থাকা আমাকে অস্বস্তি দিয়েছিল। আবার ভালোও লেগেছিল—ভালো লাগার কথাটা নিজের কাছেও স্বীকার করিনি।

গানের পাশে কয়েকজন কবিতা পড়ছিল। একজন কাগজ দেখে পড়তে গিয়ে শব্দ ভুল করল, সবাই তবু হাততালি দিল। আমাদের দরসে ভুল করলে সংশোধন হয়; ভুল রেখে প্রশংসা করা আমার কাছে অদ্ভুত। পরে ভাবলাম তারা হয়তো উচ্চারণ নয়, সাহস শুনছিল। কীসের সাহস, বুঝিনি।

এক বয়স্ক মানুষ মাটিতে সংবাদপত্র বিছিয়ে শুয়ে ছিলেন। তাঁর পাশে তরুণরা স্লোগান দিচ্ছে, তিনি ঘুমাচ্ছেন। এত শব্দে ঘুম কীভাবে হয় দেখতে দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি চোখ খুলে বললেন, ‘বসবা?’ আমি না বললাম। তিনি কাগজের অর্ধেক গুটিয়ে জায়গা করলেন। শেষ পর্যন্ত বসেছিলাম। তাঁর নাম জানিনি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী পড়ো?’ আমি বললাম আরবি। তিনি বললেন, ‘ভালো।’ এই ‘ভালো’তে বিচার ছিল না। মাদ্রাসার নাম শুনে অন্য লোকটির ‘আচ্ছা’র চেয়ে এটি আলাদা।

রাশেদ ভাই আমাকে খুঁজে পেয়ে বললেন অচেনা মানুষের সঙ্গে বসতে নেই। আমি বললাম তিনি তো বৃদ্ধ। ভাই বললেন বৃদ্ধরাও অচেনা হয়। কথাটা ঠিক। তবু সেই মানুষটির পাশে বসে আমার ভয় কমেছিল। সব পরিচয় নাম দিয়ে হয় না; কখনো কাগজের অর্ধেক জায়গা দিয়ে হয়।

একটি মেয়ে আমাকে বসার জায়গা করে দিয়েছিল। তার হাতে লাল রঙের লেখা। সে জিজ্ঞেস করল আমি কোথা থেকে এসেছি। মাদ্রাসার নাম না বলে এলাকার নাম বললাম। সে বলল, ‘এত দূর?’ জায়গাটা আসলে দূর নয়। তার বিস্ময়ে মনে হলো আমি আরও দূর থেকে এসেছি—অন্য কোনো জীবন থেকে। আমি পাল্টা কিছু জিজ্ঞেস করিনি। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস ছিল না। সে আবার সামনের দিকে তাকাল।

বিকেলে ক্ষুধা লাগলে রাশেদ ভাই বাদাম কিনে দিলেন। আমরা একই কাগজের ঠোঙা থেকে খেলাম। তিনি বললেন, ‘দেখলি? মানুষ চাইলে পারে।’ কী পারে জিজ্ঞেস করলাম না। তাঁর চোখে তখন এমন নিশ্চয়তা ছিল যে প্রশ্ন করলে তা নষ্ট হবে। আমি কেবল মাথা নেড়েছিলাম।

ফেরার আগে তিনি থাকতে চাইলেন। বললেন রাতে মোমবাতি আরও সুন্দর হবে। আমার মনে পড়ল এশার পরে মুতালাআ, উস্তাদের অনুমতি, গেট বন্ধ হওয়ার সময়। আমি বললাম যাব। তিনি হতাশ হয়ে বললেন, ‘এক দিন নিয়ম ভাঙলে কী হয়?’

আমি জানতাম না। নিয়ম ভাঙার ফল না জানাই নিয়ম মানার বড় কারণ।

বিকেলের আলো কমলে মোমবাতি জ্বালানো হলো। এত বাতির মাঝেও মানুষ মোমবাতি ধরল কেন, জানতাম না। মাটিতে গলে পড়া মোম জুতায় লেগেছিল। একজন তরুণী মোমবাতির আগুন আড়াল করতে দুই হাত গোল করে রেখেছিল। বাতাস লাগলে শিখা কাঁপছিল। তার পাশের ছেলে নিজের মোমবাতি দিয়ে আবার জ্বালিয়ে দিল। আমি তাকিয়ে ছিলাম। রাশেদ ভাই কনুই দিয়ে ধাক্কা দিলে চোখ নামালাম।

একজন আমার হাতে ছাপানো কাগজ ধরিয়ে দিল। বলল, ‘পড়েন, ভাই।’ আমি কাগজ নিলাম। সেখানে কয়েকটি দাবি লেখা, কিছু নাম, নিচে যোগাযোগের নম্বর। পুরোটা দাঁড়িয়ে পড়িনি। ভাঁজ করে পাঞ্জাবির পকেটে রাখলাম।

সন্ধ্যা নামলে আলো বদলে গেল। দিনের ভিড়ে যাদের মুখ পরিষ্কার দেখেছি, মোমবাতির আলোয় তারা ছায়া। একজন আমার হাতে মোমবাতি দিতে চাইল। নিইনি। আগুন হাতে নিয়ে কী করব জানতাম না। পরে মাটিতে পড়ে থাকা একটি নিভে যাওয়া মোম তুলেছিলাম। সলতে কালো। পকেটে রাখতে গিয়ে থামলাম—উস্তাদ দেখলে প্রশ্ন করবেন। আবার মাটিতে রেখে দিলাম।

রাশেদ ভাই একটি দলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিলেন। দশ মিনিট পরে তাঁকে দেখা গেল না। প্রথমবার একা লাগল। চারপাশের লোকজন আমাকে ধাক্কা দেয়নি, কেউ সন্দেহও করেনি। তবু পরিচিত একজনের ছায়া না থাকলে স্বাধীনতা ভয় হয়ে ওঠে। আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁর পাঞ্জাবি খুঁজছিলাম। তিনি ফিরে এসে বললেন, ‘হারায় গেছিলি?’ আমি বললাম, ‘আপনিই গেছিলেন।’

ফেরার সিদ্ধান্ত তখনই নিয়েছিলাম। মাদ্রাসার গেটের সময় শুধু কারণ ছিল না। এত নতুন দৃশ্য এক দিনে বেশি হয়ে গিয়েছিল—গান, নারী-পুরুষ পাশাপাশি, নামাজ, ছবি, কাগজ, মোম। মানুষ অপরিচিত জিনিসকে ভুল বলে দূরে রাখতে পারে; আমি তখনও রায় দিতে পারিনি। তাই দূরে সরে নিজের পরিচিত বিছানা ও বইয়ের কাছে যেতে চেয়েছি।

মাগরিবের সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। আমি বললাম ফিরব। রাশেদ ভাই থাকতে চাইলেন। আমি একাই বাস ধরলাম। বাসে আমার পাশে বসা লোকটি ফোনে বলছিল, দেশ বদলে গেছে। জানালার বাইরে দোকান, জ্যাম, ভিক্ষুক, পুলিশের গাড়ি—সব আগের মতো দেখাচ্ছিল। হয়তো বদল ভেতরে হয়, বাইরে দেখা যায় না। এই কথা তখন ভাবিনি। শুধু ভাবছিলাম উস্তাদ জিজ্ঞেস করলে কী বলব।

বাস আসার আগে আমি ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে জুতা থেকে ধুলো ঝাড়ছিলাম। একজন ছেলে আমার দিকে একটি কাগজ বাড়িয়ে দিল। তাতে দিনের কর্মসূচি লেখা। নিতে গিয়ে থামলাম; মাদ্রাসায় কেউ ব্যাগ দেখলে কী হবে মনে হলো। ছেলেটি হাত নামায়নি। শেষ পর্যন্ত নিলাম, দুই ভাঁজ করে পকেটে রাখলাম। সে আমার নাম জানতে চায়নি, আমি তারও না। কাগজটি নেওয়ার জন্য কোনো শর্ত ছিল না। এই অবাধ দেওয়া আমার পরিচিত ছিল না; আমাদের বই নিতে নাম, জামাত, কখন ফিরাব—সব লেখা হয়।

বাসের লাইনে একজন বৃদ্ধ আমার আগে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গাড়ি এলে ধাক্কায় উঠতে পারছিলেন না। আমি তাঁর কনুই ধরে তুললাম। তিনি বসার জায়গা পেয়ে আমাকে পাশে ডাকলেন, কিন্তু আমি পেছনে দাঁড়ালাম। মাথার টুপি কাত হয়ে ছিল; ঠিক করতে গিয়ে দেখি তাতে রাস্তার লাল রং। মুছতে চেয়েও মুছিনি। কেন রেখেছি জানি না। হয়তো মাদ্রাসায় ফিরে এইটুকু দেখে মনে হবে সত্যিই গিয়েছিলাম।

পথে রাশেদ ভাই একবার ফোন করলেন। বললেন তিনি পরে ফিরবেন, আমাকে সরাসরি মাদ্রাসায় যেতে। তাঁর গলায় মাইকের শব্দ। আমি জিজ্ঞেস করলাম এত মানুষ কালও থাকবে কি না। তিনি বললেন থাকবে। কথাটি নিশ্চয়তার সঙ্গে বলেছিলেন। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল কোনো ভিড় একবার শুরু হলে আর কমে না, যেমন নদীর পানি শুধু বাড়ে। পরে বুঝেছি নদীও নামে; পাড়ে কাদা আর ভাঙা ডাল রেখে যায়।

পকেটের কাগজটি ঘামে নরম হয়ে গিয়েছিল। বাস থেকে নামার আগে বের করে দেখলাম কালির একটি লাইন আঙুলে লেগেছে। কাগজ ফেলে দিতে পারতাম। ফেলিনি। নাহবেমির বইয়ের মাঝখানে রাখার কথা তখনই ঠিক করেছিলাম, যদিও কেন বইটির ভেতর সেটাই জানতাম না। সবচেয়ে বেশি খুলি বলে, না সবচেয়ে কম সন্দেহ হবে বলে—দুই কারণই হতে পারে।

মাদ্রাসায় ফিরে বললাম নীলক্ষেতে বই পাইনি। উস্তাদ আমার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, ‘এশার পরে মুতালাআ পূরণ করবা।’ তিনি বিশ্বাস করলেন কি না বুঝিনি। কপালে রং ছিল না। জুতার পাশে মোম লেগেছিল, অন্ধকারে দেখা যায়নি।

কাগজটা তিন দিন পকেটে ছিল। আমি কাউকে দেখাইনি। তৃতীয় দিন কাপড় ধোয়ার জন্য দিলে মনে ছিল না। শুকানোর পরে পকেটের ভেতর সাদা নরম দলা পেলাম, অক্ষর সব উঠে গেছে। আঙুল দিয়ে তুলতে গেলে কাগজ গুঁড়া হয়ে মেঝেতে পড়ল। আমি ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দিলাম।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.