FF.
অধ্যায় ৪ · বিয়াল্লিশ Book page

Chapter 4

অধ্যায় ৪ · বিয়াল্লিশ

Oct 18, 2026 7 min read

ফরিদা · ৯–১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আমি প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটায় অফিস থেকে বের হতাম। মতিঝিল থেকে বাসে শাহবাগ পৌঁছাতে কখনো চল্লিশ মিনিট, কখনো এক ঘণ্টা। নয় ফেব্রুয়ারি প্রথমবার নামার সময় ঘড়িতে পাঁচটা বেজে সাত। বাসের ভেতর থেকেই স্লোগান শুনেছিলাম। মনে হয়েছিল, শহরের মাঝখানে কেউ দরজায় আঘাত করছে, অথচ কোন দরজা তা দেখা যাচ্ছে না।

আমি একা গিয়েছিলাম। সহকর্মী রুবিনা যাওয়ার কথা বলেও শেষ মুহূর্তে যায়নি। তার মেয়ের জ্বর ছিল। আমার কোনো সন্তান নেই, স্বামীও নেই। এই তথ্য দুটি মানুষ সাধারণত একই নিঃশ্বাসে জানতে চায়। আমি উত্তর দিই, তারপর তাদের মুখে যে দ্রুত হিসাব চলে তা দেখি। একচল্লিশ বছরের একজন নারী সন্ধ্যায় একা শাহবাগে দাঁড়ালে তাকে কেউ এসব জিজ্ঞেস করে না। এই সুবিধাটুকু আমার অপ্রত্যাশিত ছিল।

আমি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা থাকতাম। প্রথম দিন কোথায় দাঁড়াতে হয় জানতাম না। মঞ্চের কাছে যেতে পারিনি; ভিড়ের কিনারে দাঁড়িয়েছিলাম। একটি কাঠের কাঠামোতে ছবি সাঁটা হচ্ছিল—মুক্তিযুদ্ধের শহিদ, বুদ্ধিজীবী, নির্যাতিত মানুষের মুখ। কেউ হাতে লেখা নামও লাগিয়ে দিচ্ছিল। আমি অনেকক্ষণ ছবিগুলো দেখলাম।

আমার বাবার ছবি নেই—এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমা দেওয়া একটি পুরোনো আবেদনের কার্বন কপিতে তাঁর পাসপোর্ট সাইজ ছবি আছে। ছবিটি এত ছোট ও ঝাপসা যে বড় কাচের নিচে ধরলে চোখের জায়গায় দুটি ধূসর বিন্দু দেখা যায়। মা বলেন, তাঁর চোখ আমার মতো ছিল না; আমার চোখ নানার। মা সবসময় এই সংশোধনটি করেন, যেন ভুল চোখ নিয়ে বাবাকে মনে রাখা অন্যায়।

তাঁকে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকালে নাখালপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি তখন একটি সরকারি দপ্তরে হিসাব সহকারী। স্থানীয় একজন সহযোগী সঙ্গে ছিল—মা নাম জানতেন, কখনো বলেননি। স্বাধীনতার পরে তেজগাঁও থানা, রায়েরবাজার, মিরপুর—যেখানে খবর এসেছে, মামা গেছেন। কোনো দেহ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের তালিকায় নাম উঠেছিল পরে, তাও বানান ভুল। মা তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমার জন্ম ১৯৭২ সালের মে মাসে। আমার বয়সের সঙ্গে বাবার অনুপস্থিতির বয়স সমান নয়; অনুপস্থিতি আমার চেয়ে পাঁচ মাস বড়।

দ্বিতীয় দিন মঞ্চ থেকে শহিদ পরিবারের কথা বলা হচ্ছিল। আমার চারপাশে মানুষ হাত তুলল। আমি তুলিনি। কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, আপনি কি শহিদ পরিবারের সদস্য, আমি কী বলতাম? আমাদের কাছে মৃত্যু সনদ নেই। কবর নেই। শেষ দেখা মানুষটির সাক্ষ্য ছাড়া আর কিছু নেই, আর সেই মানুষ এখন চুরাশি বছরের, কখনো দুপুরকে সকাল বলেন।

আমি নিজেকে জালিয়াত মনে করলাম। শব্দটি কঠোর, কিন্তু অন্য কোনো শব্দ ঠিক হলো না। যারা ছবির সামনে কাঁদছিল, তাদের শোক দৃশ্যমান। আমার শোক একটি আবেদনপত্রের সঙ্গে স্ট্যাপল করা, যার এক কোণা ইঁদুরে কেটেছে। আমি কি সেই কাগজ নিয়ে এসে অন্য মুখগুলোর পাশে রাখব? বাবাকে কি ঝাপসা বিন্দু দিয়ে প্রমাণ করতে হবে?

দশ ফেব্রুয়ারি বাসায় ফিরে মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘রোজ কোথায় যাস?’

আমি বললাম, ‘শাহবাগে।’

মা চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, ‘ও।’ আর কিছু নয়। তিনি টেলিভিশনে খবর দেখতেন, কিন্তু শব্দ কমিয়ে। পর্দায় ভিড় দেখালে চ্যানেল বদলে ধারাবাহিক নাটক দিতেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, ছবিটা কোথায়। জিজ্ঞেস করিনি।

সেই রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। মা হাতপাখা নেড়ে বসেছিলেন। অন্ধকারে তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছিল না বলে প্রশ্ন করা সহজ হওয়ার কথা, বরং কঠিন হলো। তিনি নিজে বললেন, ‘তোর বাবা ভিড় পছন্দ করত না।’

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কীভাবে জানো?’

‘বায়তুল মোকাররমে ঈদের বাজারে গেছিলাম। আমার হাত এমন ধইরা রাখছিল যে ব্যথা হইছিল।’

বাবাকে নিয়ে মায়ের স্মৃতি খুব কম, এবং যেগুলো বলেন সেগুলোও দৈনন্দিন—চা বেশি মিষ্টি খেতেন, ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষতেন, পাঞ্জাবির বোতাম নিজে লাগাতে পারতেন না। আমি বড় ঘটনার উপযুক্ত স্মৃতি চাইতাম। তিনি দিতেন একটি ব্যথা পাওয়া কবজি। তখন বুঝিনি, এই ছোট তথ্যগুলোই একজন মানুষকে ছবি থেকে আলাদা করে।

মা বললেন, ‘ওইখানে রাইতে থাকিস না।’

‘থাকি না।’

‘মানুষ বেশি হইলে কিছু হইতে সময় লাগে না।’

আমি বলতে চেয়েছিলাম একাত্তরে মানুষের ভিড় বাবাকে নেয়নি; কয়েকজন নির্দিষ্ট লোক নিয়েছিল। বলিনি। মায়ের সতর্কতার সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে তর্ক করার নিষ্ঠুরতা আমার ছিল না।

পরদিন অফিসে রুবিনা আমাকে জিজ্ঞেস করল, শহিদ পরিবারের তালিকায় বাবার নাম আছে কি না। আমি বললাম, কোন তালিকা? সে একটি ওয়েবসাইটের কথা বলল। দুপুরের বিরতিতে খুললাম। নাম খুঁজে পেলাম না। বানান পাল্টে লিখলাম, জেলার নাম দিয়ে খুঁজলাম, পেশা দিয়ে। কিছু নেই। প্রতিবার ‘কোন ফল পাওয়া যায়নি’ উঠল। পর্দার ওই বাক্যটি থানার পুরোনো উত্তরের মতো—খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রযুক্তি বদলেছে, উত্তর না।

সেদিন বিকেলে কাজ শেষে আমি সরাসরি বাসায় যাইনি। তেজগাঁওয়ের পুরোনো ঠিকানার দিকে গিয়েছিলাম। যে ভাড়া বাসা থেকে বাবাকে নেওয়া হয়েছিল, সেটি বহু আগেই ভেঙে বহুতল হয়েছে। নিচে ওষুধের দোকান। আমি রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে বারান্দা গুনলাম, যদিও পুরোনো বাড়ির সঙ্গে কোনো মিল নেই। মা বলেছিলেন দরজার সামনে একটি পেয়ারা গাছ ছিল। সেখানে এখন গাড়ির ঢালু পথ।

ওষুধের দোকানে ঢুকে কিছু না কিনে দাঁড়ানো যায় না। মায়ের রক্তচাপের ওষুধ নিলাম। দোকানি মূল্য বললে মনে হলো একই জায়গা থেকে একদিন মানুষ নেওয়া হয়েছে, আজ ওষুধ। জায়গা কোনো স্মৃতি রাখে না; ব্যবসা ঠিকানা বদলে নেয়। বের হওয়ার সময় একজন নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞেস করল কাকে খুঁজি। বললাম কাউকে না। এই উত্তরটি আমাদের পরিবারের উত্তর—আমরা কাউকে খুঁজি, যার বর্তমান ঠিকানা নেই।

বাসায় ফিরে মাকে বলিনি কোথায় গিয়েছিলাম। ওষুধের প্যাকেট দিলাম। তিনি দাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম। তিনি বললেন পাশের দোকানে কম পাওয়া যায়। বিয়াল্লিশ বছরের শোকের মাঝেও দশ টাকার হিসাব আছে। আগে এতে বিরক্ত হতাম। এখন বুঝি এই হিসাব করেই তিনি এত বছর পার করেছেন।

রাতে নীল ফাইল খুলে আবেদনের তারিখগুলো পড়লাম। ১৯৭২, ১৯৭৫, ১৯৯৬—সরকার বদলেছে, কাগজের ভাষা বদলায়নি। প্রতিটি চিঠিতে আশ্বাস বা গ্রহণের সিল। বাবার ছবির উপর একটি সিলের অর্ধেক পড়েছে। রাষ্ট্র তাঁর মুখও পুরো রাখেনি। আমি ট্রেসিং পেপারে নামটি নকল করলাম, পরদিন কাঠামোয় লাগাব কি না ভেবে। শেষ পর্যন্ত কাগজটি ফাইলেই রেখে দিলাম।

আমি জেলা প্রশাসকের নথির নম্বর জানতাম। বাসায় রাখা কাগজে আছে। চাইলে আবেদন করে নাম তুলতে পারি। কিন্তু নাম ওঠার পরে কী বদলাবে? মা কি টেলিভিশনের শব্দ বাড়াবেন? আমি কি কাঠের কাঠামোয় জায়গা পাব? প্রশ্নগুলো অফিসের কাগজের ফাঁকে লিখে আবার কেটে দিয়েছিলাম।

এগারো তারিখ মোড়ে যাওয়ার পথে একটি ছোট মেয়ে ফুল বিক্রি করছিল। আমি ফুল কিনি না সাধারণত; বাসায় ফুলদানি নেই। সে বলল, ‘শহিদের জন্য নেন।’ দশ টাকায় দুটি গাঁদা নিলাম। কাঠামোর সামনে গিয়ে বুঝলাম কোথায় রাখব জানি না। অন্য ছবির নিচে রাখলে তা কার ফুল হবে? বাবার ছবি নেই। শেষ পর্যন্ত ফুল দুটো হাতে রেখেই দাঁড়ালাম। ফেরার সময় শুকিয়ে গিয়েছিল। বাসায় এনে রান্নাঘরের জানালায় রেখেছিলাম। মা পরদিন আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেন। তাঁকে কিছু বলিনি।

এগারো তারিখ অফিসে একটি মৃত্যু সনদের অনুলিপি যাচাই করতে হয়েছিল। নথির মানুষটি গত মাসে মারা গেছেন; তারিখ, কারণ, নিবন্ধন নম্বর—সব পূর্ণ। আমি সিল দিলাম। নিজের বাবার জন্য এমন একটি সনদ কখনো হবে না। আইন অনুযায়ী বহু বছর নিখোঁজ থাকলে মৃত্যু অনুমান করা যায়, জানি। কিন্তু অনুমানকে সিল দিলে মা কি বিধবা হওয়ার তারিখ পাবেন? তিনি কখন থেকে বিধবা—১৪ ডিসেম্বর, যুদ্ধ শেষের দিন, না আদালতের ঘোষণার দিন? আমি ফাইল বন্ধ করেও প্রশ্নটি বন্ধ করতে পারিনি।

দুপুরে মাকে ফোন করে ছবির কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন পরে দেখবেন। ‘পরে’ তাঁর কাছে প্রত্যাখ্যানের নরম শব্দ। আমি বললাম কাঠামোয় নাম লিখেও দেওয়া যায়। মা বললেন, ‘নাম তো কাগজে অনেকবার লিখছস।’ তাঁর ক্লান্তি আমাকে থামাল। যে মানুষ অপেক্ষা করেছে, সে স্মরণ করার নতুন পদ্ধতিতে আগ্রহ হারাতে পারে। আমি অপেক্ষা উত্তরাধিকার পেয়েছি, ক্লান্তি এখনও পুরো পাইনি।

বাসে যাওয়ার সময় ব্যাগে খালি খাম রেখেছিলাম—ছবি পেলে আনার জন্য। কাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ব্যাগ ছুঁয়েছি। ভিতরে কিছু নেই। তবু খামের কাগজের শব্দে মনে হচ্ছিল একটি মুখ সঙ্গে আছে। মানুষ অনুপস্থিতিকে বহন করার জন্য বস্তু বানায়; কখনো ফাইল, কখনো খালি খাম।

এগারো তারিখ কাঠের কাঠামোটির সামনে আবার গেলাম। নতুন ছবি লেগেছে। কিছু রঙিন, কিছু সাদা-কালো। একজন তরুণ আঠা দিয়ে কাগজ ঠিক করছিল। আমি বললাম, ‘ছবি দিতে হলে কার কাছে দিতে হয়?’

সে মুখ না তুলেই বলল, ‘আমার কাছেই দেন, আপা।’

‘পুরোনো ছবি। খুব পরিষ্কার নয়।’

‘সমস্যা নাই।’

আমি ব্যাগের ভেতর হাত দিলাম, যেন ছবিটি সঙ্গে আছে। ছিল না। সে আরেকটি কাগজে আঠা লাগাতে লাগাতে বলল, ‘নাম লিখে দিলেও হবে।’

বাবার নাম আমি প্রতিদিন লিখি। ব্যাংকের ফরমে, পরিচয়পত্রে, চাকরির নথিতে। মৃত না নিখোঁজ—কোন ঘরে চিহ্ন দেব, সেই দ্বিধা এখন আর হয় না; প্রয়োজনমতো দিই। কিন্তু এই কাঠামোর সামনে নাম লিখে দিলে তা কোন ঘরে যাবে, জানতাম না।

আমি সরে দাঁড়িয়ে সব মুখ আবার দেখলাম। ওখানে জায়গা ছিল না বললে ভুল হবে। কাগজের ফাঁকে ফাঁকে সাদা কাঠ দেখা যাচ্ছিল। চাইলে একটি ছোট ছবি লাগানো যায়। তবু বাবার জায়গাটা খুঁজে পেলাম না, কারণ জায়গাটা ছিল না।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.