FF.
অধ্যায় ৯ · কাগজ Book page

Chapter 9

অধ্যায় ৯ · কাগজ

Oct 18, 2026 7 min read

সাইফুল · মার্চ ২০১৩

কাগজগুলো কে এনেছিল কেউ বলেনি। ফজরের পরে প্রথম সবক শেষ করে নাশতা খেতে গেলে দেখি বড় ঘরের টেবিলে রাখা। ফটোকপি, কম্পিউটারের লেখা, মোবাইলের স্ক্রিনশট ছাপানো। উপরে হাতে লেখা—সবাই পড়বে।

তালিবরা গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন জোরে পড়ছিল। শাহবাগের লোকদের বিষয়ে লেখা। কে কী বলেছে, কোন ব্লগে কী আছে, কার ছবির পাশে কী দেখা যায়। কিছু শব্দ মুখে উচ্চারণ করতে তারও বাধছিল। উস্তাদ ঘরে ঢুকে কাগজ দেখলেন, কিছু বললেন না। শুধু বললেন, ‘সবকের সময় হইছে।’ কাগজ টেবিলেই থাকল।

পরে সবাই আলোচনা করল। কেউ বলল সব সত্য। কেউ বলল ছবিগুলো পুরোনো। একজন স্মার্টফোনে আরেকটা ছবি দেখাল। আমি পার্থক্য বুঝিনি। দশটা কাগজের মধ্যে নয়টা বানানো আর একটা আসল হলেও কোনটা আসল আলাদা করার বিদ্যা আমার ছিল না। কিন্তু একটি লেখায় এমন কথা ছিল, যেটা পড়ে আমার বুক কেঁপে উঠল। সেই মানুষটির নাম আমি মনে করতে পারছিলাম না; হয়তো বারো ফেব্রুয়ারি তার পাশেই বসেছিলাম, হয়তো সে আমার হাতে কাগজ দিয়েছিল। এই ভাবনাই বেশি লাগল।

আমি বলিনি যে শাহবাগে গিয়েছিলাম। রাশেদ ভাই ছাড়া কেউ জানত না। বললে প্রথমে জিজ্ঞেস করত অনুমতি নিয়েছিলাম কি না। তারপর কার সঙ্গে বসেছি, কী বলেছি। কোনো প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না।

মাদ্রাসার দিন আগের মতো চলল। ফজরের আগে ওঠা, কোরআন তিলাওয়াত, সবক শোনানো, নাশতায় রুটি আর ডাল, দুপুরে ভাত। কিন্তু কাগজগুলো সব জায়গায় গেল। খাবার ঘরে, বারান্দায়, কারও বালিশের নিচে। একটি কাগজের প্রান্তে তেলের দাগ। আরেকটায় লাল কলমে দাগ দেওয়া। কথা উঠলে আমি শুনতাম। মত চাইলে বলতাম, ‘জানি না।’ এতে কয়েকজন বিরক্ত হতো।

আমাদের ঘরে আটজন থাকতাম। কাঠের খাট চারটি, দুই তলা। আমার নিচের খাট জানালার কাছে। ফজরের আগে ঘুম ভাঙানোর জন্য দায়িত্ব পালা করে বদলায়। যে দিন আমার পালা, আমি প্রথমে আবদুল্লাহকে ডাকি; সে সহজে ওঠে। মঈনকে তিনবার ডাকতে হয়। এই ছোট নিয়মগুলোতে ভুল হলে উস্তাদ জানেন। বাইরে দেশের বড় কথা চলছিল, ভেতরে কার পালা, কার সবক মুখস্থ হয়নি—সব আগের মতো ধরা হতো।

কাগজ আসার পর পড়ার সময় মন সরে যেত। উস্তাদ ইবারতের ভুল ধরলে আমি একই জায়গায় আবার ভুল করতাম। তিনি একদিন বই বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাথায় কী?’

আমি তাঁর সামনে কাগজের কথা বলতে পারিনি। বললে তিনি হয়তো নিয়ে নিতেন, হয়তো বুঝিয়ে দিতেন। দুইটার কোনটি চাই তা জানতাম না। কেউ কাগজটি নিয়ে গেলে প্রশ্নও চলে যাবে—এমন মনে হয়েছিল। আবার প্রশ্ন রেখে পড়া নষ্ট করা অপরাধ। আমি মাথা নিচু করে বললাম, ‘ঘুম কম হইছে।’ তিনি বিকেলে বিশ্রাম নিতে বললেন। আমার মিথ্যার জন্য তিনি দয়া করলেন। লজ্জায় সেদিন আরও ঘুম আসেনি।

মুতালাআর সময়ে বইয়ের পাশে সাদা খাতা রাখি। নতুন শব্দ লিখি। সেদিন ‘তাহকিক’ লিখেছিলাম—যাচাই। উস্তাদ বহুবার বলেছেন কোনো বর্ণনা গ্রহণের আগে সূত্র দেখতে হয়। বাইরে যে কাগজগুলো ঘুরছে, তাদের সূত্র কোথায়? এই নিয়ম ধর্মীয় কিতাবের জন্য, না সব কথার জন্য—জিজ্ঞেস করিনি। যদি সব কথার জন্য হয়, এত মানুষের নিশ্চিত মুখ কীভাবে সম্ভব?

এক শুক্রবার খুতবায় শাহবাগের কথা এলো। আমি পেছনে বসেছিলাম। বক্তার গলা উঁচু হলে সবাই নড়ে উঠল। তিনি যাদের কথা বলছিলেন, তাদের মধ্যে আমি একদিন ছিলাম—এই চিন্তা শরীর গরম করল। আমি কি তখন অন্য কেউ ছিলাম? মানুষ জায়গা বদলালে তার পরিচয় বদলায়, না অন্যরা নাম বদলায়? নামাজ শেষে কেউ আমার দিকে আলাদা চোখে তাকায়নি। গোপন থাকা স্বস্তি, আবার ভার।

রাশেদ ভাই পরে দেখা করতে এলে আমি কাগজটি দেখালাম না। তিনি চা খাওয়ালেন। দোকানের টেলিভিশনে খবর চলছিল, শব্দ কম। বললেন, ‘বেশি চিন্তা করিস না।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি চিন্তা করেন না? তিনি হাসলেন, ‘দোকানে চিন্তা কইরা লাভ নাই।’ সবার কাছে কাজ চিন্তার দেয়াল—তার দোকান, আমার সবক, পুলিশের ডিউটি। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে তবু শব্দ আসে।

ফিরে এসে দেখি মঈন আমার বই সরিয়েছে। বুক কেঁপে উঠল। কাগজ দেখেছে কি না জিজ্ঞেস করিনি। সে শুধু বলল, ‘তোর বইয়ের ভাঁজ নষ্ট।’ কাগজটি তখনও ভিতরে। গোপন জিনিস অন্যের হাতে গেলেও যদি সে না দেখে, ভয় থেকে যায়। আমি বইটি সেই রাত থেকে বালিশের নিচে রাখলাম।

আমি বললাম, ‘কিছু না।’

তিনি টেবিলের ফটোকপির দিকে তাকালেন। ‘সব পড়ার দরকার নাই।’

‘কোনটা পড়ব?’ প্রশ্নটি মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল।

উস্তাদ আমার দিকে স্থির চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘যেটা বুঝার যোগ্যতা হইছে।’

আমার যোগ্যতা কতটুকু, তিনি বলেননি। প্রশ্ন করলে বেয়াদবি হতে পারত। বই খুলে আবার পড়লাম।

দুপুরে রান্নাঘরের পাশে পানি তুলতে গিয়ে দুই বড় তালিবকে কথা বলতে শুনেছিলাম। একজন বলল ছবির তারিখ মিলছে না। অন্যজন বলল তারিখ দিয়ে সত্য বদলায় না। তারা আমাকে দেখে চুপ করল। তখন বুঝলাম বড়দের মধ্যেও নিশ্চয়তা সমান নয়। প্রকাশ্যে সবাই একই কথা বললেও রান্নাঘরের পেছনে প্রশ্ন থাকে। এই জ্ঞান আমাকে স্বস্তি দেয়নি; বরং কোথায় দাঁড়াব বুঝতে আরও অসুবিধা হলো।

রাশেদ ভাইকে ফোন করেছিলাম। তিনি দোকানে ছিলেন। বললাম কাগজে যা লেখা সব সত্যি কি না। তিনি একটু থেমে বললেন, ‘আমি কীভাবে জানব?’ ফেব্রুয়ারিতে তিনিই আমাকে বলেছিলেন মানুষ চাইলে পারে। তাঁর অনিশ্চয়তা শুনে রাগ হলো। বললাম, ‘আপনি তো নিয়ে গেছিলেন।’

তিনি বললেন, ‘নিয়ে গেলে সব মানুষের সব কথা জানি?’

তারপর একজন খদ্দের ডাকায় ফোন রেখে দিলেন। আমি তাঁকে বলতে পারিনি আমার মনে হয় কাগজের মানুষের পাশে বসেছিলাম। বসা মানে কি তার কথা নিজের হয়ে যায়? একই মাঠে নামাজ পড়লে? একই বোতল থেকে পানি খেলে?

এক সন্ধ্যায় বাইরে থেকে কয়েকজন বক্তা এসেছিলেন। বড় ঘরে আলোচনা। আমরা পেছনে বসেছিলাম। বক্তা কয়েকটি লেখা পড়ে শুনালেন, কঠিন শব্দের মানে বললেন। সবাই ক্ষুব্ধ হচ্ছিল। আমি শুনছিলাম, কিন্তু বারবার মনে পড়ছিল শাহবাগে অজুর কল দেখিয়ে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেটা। সে কি এসব লিখেছিল? তার মুখের সঙ্গে কোনো নাম জোড়া লাগাতে পারছিলাম না। অচেনা মুখকে অপরাধী ভাবা সহজ হওয়ার কথা, আমার কাছে কঠিন হলো। কারণ একবার সে আমার টুপি তুলেছিল।

আলোচনা শেষে মঈন জিজ্ঞেস করল, ‘এখনও বুঝস নাই?’

আমি বললাম, ‘কী?’

সে বিরক্ত হয়ে চলে গেল। আমি জানতাম কী বুঝতে বলছে। তবু প্রশ্ন করেছিলাম, যেন শব্দটা তার মুখে শুনলে আমার দায়িত্ব কমে।

পরদিন সবকে মন বসেনি। উস্তাদ আরবি বাক্য পড়তে বললে একই জায়গায় দুইবার ভুল করেছি। তিনি বেত তুলেননি, শুধু বললেন মন কোথায়। আমি বলতে পারিনি। শাহবাগে রেখে এসেছি বললে মিথ্যা হতো; কাগজের ভাঁজে আছে বললেও। মন কোনো জায়গায় ছিল না, দুই জায়গার মাঝখানে বারবার রাস্তা পার হচ্ছিল। সেই রাস্তার সিগন্যাল কে নিয়ন্ত্রণ করে জানতাম না।

দুপুরে পোস্ট অফিসের সামনে এক লোক আমার হাতে আরেকটি লিফলেট দিতে চাইল। আমি নিইনি। সে বলল পড়লেই কি ক্ষতি? এই একই প্রশ্ন আমি অন্যকে করতে পারতাম। তার কাগজে কী লেখা ছিল জানলাম না। তখন বুঝলাম না নেওয়াও সিদ্ধান্ত; অজ্ঞ থাকা নিরপেক্ষতা না। তবু ফিরে যাইনি। মানুষের মাথায় যত প্রশ্ন ধরে, হাতে তত কাগজ ধরে না।

রাতে আব্বার সঙ্গে ফোনে কথা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন পড়া কেমন। আমি ভালো বললাম। তারপর জানতে চাইলেন ঢাকায় গোলমাল কি আমাদের কাছে। মাদ্রাসা থেকে কত দূর বললাম। তিনি বললেন উস্তাদের কথা শুনতে। আব্বার কাছে শহরের সব রাস্তার শেষ উস্তাদের কাছে। আমি বলতে চেয়েছিলাম উস্তাদকেও প্রশ্ন করেছি। বলিনি। তাঁর নিশ্চিন্ততা নষ্ট করার অধিকার আমার আছে কি না জানতাম না।

রাতে কাগজটি ছিঁড়তে নিয়ে মাঝখান থেকে ভাঁজ করেছিলাম। কাগজ ছেঁড়ার শব্দ ঘুমন্ত ঘরে বড় শোনাবে মনে হলো। আবার খুললাম। ভাঁজের দাগ পড়ে গেল। দাগের দুই পাশে বাক্যগুলো আলাদা হয়ে গেলেও অর্থ বদলাল না। আমি বইয়ের মধ্যে রেখে দিলাম—লুকানোর জন্য, না বাঁচানোর জন্য, জানতাম না।

মঈন একদিন বলল কাগজগুলো বাইরে বিলি করতে হবে। আমার হাতে দশ কপি দিল। বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে দিতে হবে। আমি কাগজ নিলাম, কিন্তু গেট থেকে বের হয়ে ব্যাগে রাখলাম। কাউকে দিইনি। সন্ধ্যায় ফিরে বললাম শেষ। মিথ্যা দ্বিতীয়বার। প্রথমবার শাহবাগ যাওয়ার জন্য, এবার শাহবাগের বিরুদ্ধে কাগজ না দেওয়ার জন্য। দুই মিথ্যার মাঝখানে আমি কোথায় দাঁড়াই, বুঝিনি।

কাগজগুলো কী করব ভেবে রান্নাঘরের চুলায় পোড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে বাবুর্চি ছিল। বললাম পুরোনো কাগজ। সে বলল রেখে যেতে, চুলা ধরাতে লাগবে। দিলে সে পড়তে পারে। আবার নিয়ে এলাম। রাতে ব্যাগের নিচে দশ কপি। একটি কাগজের ওজন কম, দশটির ওজন কাঁধে টের পাওয়া যায়।

পরদিন শহরে যাওয়ার পথে ডাস্টবিনে ফেলতে চেয়েছি। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী পাশে থাকায় পারিনি। মনে হলো তিনি তুলে পড়বেন। শেষ পর্যন্ত একটি ফটোকপির দোকানের কাগজ কাটার বাক্সে ঢুকিয়ে দিলাম। কাটা টুকরো অন্য কাগজের সঙ্গে মিশে গেল। নয়টি তখনও ব্যাগে। আমি সত্য নষ্ট করেছি, না মিথ্যা—জানতাম না।

দুই দিন পরে মঈন আর হিসাব চায়নি। হয়তো কেউই জানত না আমাকে কয়টি দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্বের খাতা নেই। আমি নয়টি কাগজ ছোট করে ছিঁড়ে আলাদা আলাদা ডাস্টবিনে ফেললাম। শুধু নিজের পড়া প্রথম কপিটি রেখেছি। কেন সেটিকে অন্যদের চেয়ে বেশি বাঁচার অধিকার দিলাম, উত্তর নেই। সম্ভবত আমার সন্দেহ তার সঙ্গে বাঁধা ছিল।

এক রাতে বাতি নিভানোর পরও ঘুম এলো না। পাশের বিছানায় আবদুল্লাহ নাক ডাকছিল। আমি বালিশের নিচ থেকে কাগজটি বের করলাম। জানালার আলোয় পড়া যায় না; বারান্দায় গিয়ে ছোট বাতির নিচে দাঁড়ালাম। দ্বিতীয়বার পড়েও বুঝলাম না সত্য কি না। কাগজ ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা হলো। ছিঁড়লাম না। আমার নাহবেমিরের বই খুলে মাঝের ভাঁজে রেখে দিলাম।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.