অনন্যা · ৭–৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
আমরা গিয়েছিলাম দেখতে। এই কথাটা পরে কাউকে বললে তারা বিশ্বাস করত না, কারণ দুই দিনের মধ্যে আমার ফেসবুকের সব ছবি শাহবাগ, গলায় স্লোগান দিতে দিতে গলা ভেঙে গেছে, আর বাসার বারান্দায় ধোয়া বোতল শুকাচ্ছে। কিন্তু সাত তারিখ বিকেল পাঁচটায় আমি আর মিথিলা স্রেফ দেখতে গিয়েছিলাম। ক্লাস শেষে টিএসসিতে ফুচকা খাব, তারপর আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বাসায় ফিরব—প্ল্যান এই ছিল।
শাহবাগের কাছে এসে রিকশা থেমে গেল। সামনে মানুষ, পেছনে মানুষ। সবাই যেন কোথাও যাচ্ছে, অথচ কেউ জায়গাটা ছাড়ছে না। মিথিলা বলল, ‘এটা কি সেফ?’
আমি বললাম, ‘এত মানুষের মধ্যে আনসেফ কীভাবে হবে?’
এখন ভাবলে বাক্যটা বোকা শোনায়। তখন খুব ঠিক মনে হয়েছিল। আমরা চারুকলার পাশ দিয়ে ঢুকলাম। কেউ কপালে পতাকা এঁকে দিচ্ছিল। কেউ কাগজ বিলাচ্ছিল। মঞ্চের শব্দ বাতাসে ভাঙছিল, পুরো কথা শোনা যাচ্ছিল না। আশ্চর্য হলো, না শুনেও সবাই কখন চিৎকার করতে হবে বুঝে যাচ্ছিল। আমি বুঝছিলাম না। প্রথম দুইবার ঠোঁট নড়িয়েছিলাম, শব্দ বের হয়নি। তৃতীয়বার অন্যদের সঙ্গে বললাম। নিজের গলা নিজেরই অপরিচিত লাগল।
ছয়টার দিকে মিথিলা বলল তার পানি লাগবে। ফুটপাতের একটা দোকানে গিয়ে দেখি বোতল নেই। আরেক দোকানে আছে, দাম বেশি। কিনলাম। ফেরার পথে এক আপু বললেন, ‘এই বোতলগুলো ওইদিকে দিয়ে আসবেন?’
তার পায়ের কাছে বড় পলিথিনে পানি। তিনি আমাকে চিনতেন না। আমিও তাকে চিনতাম না। কেন আমাকে বললেন জানি না। আমার হাতে তখন নিজের বোতল, ব্যাগ, ফোন। তবু বললাম, ‘কোথায়?’
তিনি আঙুল তুলে দেখালেন। ‘ওই যে, বসা মানুষগুলোর পেছনে। যার লাগবে দেবেন।’
পলিথিন তুলতেই হাতের আঙুলে টান পড়ল। অন্তত পঞ্চাশটা ছোট বোতল ছিল। মিথিলা বলল, ‘তুই সিরিয়াস?’
আমি বললাম, ‘পাঁচ মিনিট।’
পাঁচ মিনিট তিন ঘণ্টা হয়ে গেল। আমি প্রথমে বোতল দিচ্ছিলাম যারা হাত তুলছিল তাদের। তারপর দেখি সামনের সারিতে বসা মানুষ উঠতে পারছে না, তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। আমি এক পা, এক পা করে মানুষের ফাঁক দিয়ে গেলাম। কেউ পথ করে দিল, কেউ আমার ব্যাগ ধরে রাখল যেন পড়ে না যাই। একটা ছোট ছেলে দুটো বোতল চাইলে আমি একটা দিলাম। সে বলল অন্যটা মায়ের জন্য। তখন দ্বিতীয়টা দিলাম এবং নিজেকে খুব খারাপ লাগল—আমি কেন ধরে নিয়েছিলাম সে বাড়তি নিচ্ছে?
পলিথিন খালি হলে ফিরে এসে দেখি ওই আপু নেই। তার জায়গায় দুজন ছেলে কার্টন খুলছে। আমি পলিথিনটা রেখে চলে যেতে পারতাম। যাইনি। কার্টন থেকে বোতল তুলে আবার ভরলাম। কেউ আমাকে দায়িত্ব দেয়নি। কেউ বলেনি থাকো। আমি নিজেই থাকলাম, আর কেউ আপত্তি করল না। জীবনে এর আগে আমি যা করেছি, প্রতিটা কাজের আগে কেউ বলেছে—পড়তে বসো, পরীক্ষা দাও, ফরম জমা দাও, বাসায় ফিরো। এখানে কেউ কিছু বলেনি। আর তখন যা হয়, আপনার মনে হয় আপনি এত দিন নিজের জীবনটা অন্য কারও ক্লাস রুটিন ধরে চালিয়েছেন।
কার্টন খুলতে গিয়ে আঙুল কেটে গিয়েছিল। খুব ছোট কাটা, তবু রক্ত দেখে পাশের ছেলে টিস্যু দিল। বলল, ‘আপু, আপনি একটু বসেন।’ আমি বসিনি। যেন বসলে প্রমাণ হবে কাজটা আমার নয়। বোতলের ঢাকনায় রক্ত না লাগে বলে পলিথিনের হাতল অন্য হাতে নিলাম। ডান হাত ব্যথা হলে বাঁ হাতে, বাঁ হাত ব্যথা হলে আবার ডান। দায়িত্ব আসলে কেউ দেয় না; কখন থামতে পারছেন না, তখন বুঝতে পারেন নিয়েছেন।
এক বৃদ্ধ বোতল নিয়ে দাম দিতে চাইলেন। আমি বললাম ফ্রি। তিনি বিশ্বাস করলেন না। পাঁচ টাকার নোট হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। শেষে পাশের বাক্সে টাকা রেখে গেলেন। ওই বাক্স কার, জানতাম না। রাতে মনে হয়েছিল তাঁর পাঁচ টাকা কোথায় গেছে? ভালো কাজেও হিসাবের ফাঁক থাকে। প্রথম দিনের উত্তেজনায় আমরা তা নিয়ে ভাবিনি।
বাসায় ফোন করেছিলাম আটটার একটু আগে। মা প্রথমবার ধরেনি। দ্বিতীয়বার ধরে বলল, ‘কোথায়?’
আমি বললাম, ‘মিথিলার সঙ্গে আছি।’ সত্যি বললাম, কিন্তু পুরোটা না। মা বলল সাড়ে আটটার মধ্যে ফিরতে। আমি নয়টার পরে ফিরলাম। বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে ছিলেন। কিছু বললেন না, শুধু ঘড়ি দেখলেন। ওই নীরবতা তখন গুরুত্ব দিইনি।
পরদিন শুক্রবার আমরা দুপুরেই গেলাম। এবার দেখতে না, পানি দিতে। আমি বাসা থেকে পুরোনো দুইটা শপিং ব্যাগ নিয়েছিলাম। মিথিলা রঙিন মার্কার এনেছিল। কাগজে লিখলাম ‘পানি’—যেন বোতল দেখে মানুষ বুঝবে না। আমাদের খুব অফিসিয়াল লাগছিল।
সন্ধ্যার আগে ভিড় এমন হলো যে মানুষের মাথা ছাড়া কিছু দেখা যায় না। মিথিলা পাঁচ হাত দূরে ছিল, তারপর নেই। ফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিল না, কলও যাচ্ছিল না। আমি প্রথম দশ মিনিট মজা পেয়েছিলাম। তারপর বুঝলাম, আমি কাউকে চিনি না, বের হওয়ার রাস্তা জানি না, আর যদি পড়ে যাই কেউ ইচ্ছা করলেও তুলতে পারবে না। বুকের ভেতর ধুপধুপ করছিল। সামনে বসা একজন নারী আমার মুখ দেখে বললেন, ‘মা, ভয় পাইছ?’
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘না।’
তিনি জায়গা করে দিলেন। আমি বসে পড়লাম। তার বয়স মায়ের কাছাকাছি। হাতে কাঁচের চুড়ি, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। তিনি আমাকে একটা কমলা দিলেন। আমি পানি দিতে এসেছি, উল্টো তার কমলা নিলাম। আমরা নাম বলিনি। দশ মিনিট পরে তিনি উঠে কোথায় চলে গেলেন।
মিথিলাকে দুই ঘণ্টা পর পেলাম চারুকলার গেটের কাছে। আমাকে দেখে সে গালি দিল, তারপর জড়িয়ে ধরল। আমি হাসছিলাম, কিন্তু হাত কাঁপছিল। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। মা দরজা খুলে প্রথমে আমার মুখ, তারপর জামা, তারপর খালি ব্যাগ দেখল। বলল, ‘খেয়েছ?’
তার আগে ওই দুই ঘণ্টায় আমি ভিড়ের ভেতর দিয়ে তিনবার বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। প্রথমবার একটি মিছিল এসে পথ বন্ধ করল। দ্বিতীয়বার দেখি সামনে বসা মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছে, তাদের মাঝখানে ঢুকে পড়লে আর ফিরে আসা যায় না। তৃতীয়বার একজন স্বেচ্ছাসেবক দড়ি ধরে পথ করছিল। আমি বললাম আমার বন্ধুকে খুঁজছি। সে জিজ্ঞেস করল বন্ধুর নাম, যেন মাইক দিয়ে ডাকবে। আমি নাম বলিনি। তখন মনে হচ্ছিল মিথিলার নাম বললে আমি স্বীকার করব তাকে হারিয়েছি।
ফোনে বারবার কল দিয়েছি। স্ক্রিনে ‘কল ফেলড’। ব্যাটারি কমে বারো শতাংশ। বাসায় ফোন দিতে হবে বলে ফোন বন্ধ করে রেখেছিলাম পাঁচ মিনিট। ওই পাঁচ মিনিটে মনে হলো যদি মিথিলা আমাকে খোঁজে? আবার চালু করলাম। সঙ্গে সঙ্গে বাবার মেসেজ—‘কোথায়?’ শুধু একটি শব্দ। আমার উত্তর দিতে ভয় হচ্ছিল। মিথ্যা লিখলে ধরা পড়ব, সত্যি লিখলে নিতে আসবেন, অথচ তিনি গাড়ি নিয়ে কোথা পর্যন্ত আসতে পারবেন জানি না। শেষ পর্যন্ত লিখলাম, ‘রওনা দিচ্ছি।’ তখনও দিইনি।
আমি চারুকলার দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে মানুষের মুখ পড়ছিলাম। সবাই কারও সঙ্গে এসেছে, কারও হাত ধরে আছে—এমন মনে হচ্ছিল, যদিও নিশ্চয়ই আমার মতো আরও অনেকেই একা ছিল। একজন বৃদ্ধ তাঁর স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাঁটছিলেন। পায়ের নিচে মোম, কাগজ, ধুলো। একটি মেয়ে নিজের ওড়নার কোণা ছিঁড়ে আরেকজনের কাটা আঙুলে বেঁধে দিল। দুজনের কেউ নাম জানতে চাইল না। এসব দেখে সাহস হওয়ার কথা; আমার বরং কান্না পাচ্ছিল। কারণ অচেনা মানুষের যত্ন আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমি যে একজনকে চিনি তাকেই খুঁজে পাচ্ছি না।
এক সময় একটি পানির কার্টন রাস্তার মাঝখানে উল্টে গেল। বোতল গড়িয়ে মানুষের পায়ের নিচে। আমি আর দুইজন ঝুঁকে তুললাম। কেউ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘মাথা নিচু কইরেন না, ধাক্কা লাগবে।’ সে নিজে নিচু হয়ে শেষ বোতলটা তুলল। আমাকে দিল। সেই বোতল আমি খাইনি; ব্যাগে রেখেছিলাম মিথিলার জন্য। পরে তাকে পেয়ে দেখি তার হাতে পানি আছে, আমারটা গরম। তবু বোতলটা ফেলে দিইনি। বাসায় নিয়ে এসেছিলাম।
মিথিলাকে পাওয়ার পরে আমরা ঝগড়া করলাম। সে বলল, ‘তুই ফোন অফ করেছিলি কেন?’
আমি বললাম, ‘তোর ফোনই তো বন্ধ।’
‘ব্যাটারি শেষ।’
‘আমারও হচ্ছিল।’
দুজনেই জানতাম এই ঝগড়ার অর্থ রাগ নয়। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম, মাঝে মাঝে হাত ধরে। রাস্তায় বাস পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাংলামোটর গিয়ে উঠলাম। মিথিলা তার মাকে ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি ঠিক আছি।’ আমার মা ফোন ধরলে আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘আর দশ মিনিট।’
বাসায় ঢোকার পর বাবা ঘড়ি দেখলেও কিছু বলেননি। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বুঝলাম জামার কাঁধে কারও হাতের লাল রং লেগে আছে। আমি ব্যাগ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করলাম। মা হয়তো দেখেছিল। খেতে বসতে বলল। পেটে তখন ব্যথা, কিন্তু ক্ষুধা বুঝিনি। ‘খেয়েছি’ বলে বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকালাম।
ব্যাগ খুলে গরম পানির বোতলটি বের করলাম। মিথিলার জন্য রাখা, সে খায়নি। বোতলের গায়ে চাপ পড়ে মাঝখান বসে গেছে। ফেলে দিতে গিয়ে থামলাম। আমার ঘরে খালি বোতল রাখার কোনো কারণ নেই। তবু টেবিলের নিচে রাখলাম। পরে পানি ভরে কলেজে নিয়ে যাব—নিজেকে এই ব্যবহারিক কারণ দিলাম। পরদিন নতুন বোতল নিয়েছি, পুরোনোটি সেখানেই ছিল।
মা বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলছিল বেশি সময় লাগছে। আমি কল ছেড়ে রেখেছিলাম, যেন পানির শব্দে কান্না শুনতে না পায়। আসলে তখনও কাঁদিনি। আয়নায় নিজের মুখ দেখে অপরাধীর মতো লাগছিল—বন্ধুকে হারিয়েছি, বাবাকে মিথ্যা বলেছি, খাবার নিয়ে মিথ্যা বলছি। তারপর মনে হলো কাউকে হারাইনি, সবাই বাসায় ফিরেছে। ভয় শেষ হলে তার জন্য লজ্জা শুরু হয় কেন?
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ভাত খেতে বসেছিলাম। মা কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ডাল ঠান্ডা, মাছের ঝোলের উপর সর। আমি সব খেয়েছি। বাবা পাশের ঘরে টেলিভিশনের শব্দ কমিয়ে খবর দেখছিলেন। পর্দার আলো দরজার নিচ দিয়ে আসছিল। একই ঘটনার ছবি তিনি দেখছেন, আমি তার ভেতর থেকে ফিরে ভাত খাচ্ছি। আমাদের কেউ অন্যজনকে নিজের দেখা বলতে পারিনি।
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ মিথ্যা।
বাথরুমে হাত ধুতে গিয়ে দেখি দুই তালুর মাঝখান দিয়ে লাল রেখা। পলিথিনের হাতল চামড়ায় বসে গিয়েছিল। পানি লাগলে জ্বলছিল। আমি তোয়ালে দিয়ে হাত মুছে বিছানায় বসে ফোনে দুই তালুর ছবি তুললাম। ছবিতে দাগটা বাস্তবের চেয়ে হালকা দেখা যাচ্ছিল। আরেকটা তুললাম, ফ্ল্যাশ দিয়ে। ভালো এলো।
মিথিলাকে পাঠাতে গিয়ে থামলাম। ফেসবুকে পোস্ট করলেও সবাই বুঝত আমি কী করেছি। অনেক লাইক হতো। আমি ছবিটা কাউকে পাঠালাম না।