মজনু · মার্চ ২০১৩
দোকানে আগে মানুষ চা খাইত আর যাইত। বইয়ের দাম নিয়া কথা কইত, কবিতা কইত, সরকাররে গালি দিত—সবই ছিল, কিন্তু এক কাপ শেষ হইলে উঠত। মার্চে সবাই মত নিয়া আসত। চা ঠান্ডা হইত, মত শেষ হইত না।
একদিন দুপুরে দুই খদ্দের লাগল। একজন নিয়মিত, নাম রফিক; প্রকাশনীর কাজ করে, বাকি দেয় মাস শেষে। আরেকজন নতুন, দাড়ি আছে, পাঞ্জাবি পরা। কথা শুরু হইছিল ‘নাস্তিক’ শব্দ নিয়া। কে আগে কী বলছে জানি না। আমি চা বানাইতেছিলাম। হঠাৎ দেখি রফিক কাপ নামাইয়া দাঁড়াইছে। দাড়িওয়ালা লোকও দাঁড়াইল।
রফিক বলল, ‘প্রমাণ দেখান।’
লোকটা বলল, ‘চোখ থাকলে প্রমাণ লাগে না।’
তারপর গলার আওয়াজ বাড়ল। দোকানের সামনে লোক জমল। আমার কাচের কাপ দুইজনের হাতের কাছে। হাতাহাতি লাগলে আগে কাপ ভাঙবে। আমি কাউন্টার থিকা বাইর হইয়া দুইজনের মাঝখানে দাঁড়াইলাম। বললাম, ‘মারামারি বাইরে করেন। কাপের দাম পঁচিশ টাকা।’
রফিক আমারে বলল, ‘মজনু, তুমি বুঝতেছ না ব্যাপারটা।’
আমি বললাম, ‘বুঝলে কাপের দাম কমব?’
লোকজন হাসল। রাগ একটু নামল। দুইজনরে নতুন চা দিলাম। আগেরটা ঠান্ডা ছিল, কিন্তু নতুনটার দামও নিলাম। রফিকের খাতায় বারো টাকা যোগ। দাড়িওয়ালা লোক নগদ দিল। দুই পক্ষের টাকা একই বাক্সে রাখলে কোনো শব্দ হয় না।
খদ্দেররা আমার মত জানতে চায়। আমি বলি, ‘চা কেমন হইছে?’ কেউ বলে কথা ঘুরাই। আমি বলি, ‘কথা সোজা করলে দুধ আসব?’ ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি বেশি ছিল। মার্চে কমছে, কিন্তু আগের বছরের মার্চের চেয়ে এখনও বেশি। আমার মত এইখান পর্যন্ত। দোকান চললে ভালো। রাস্তা বন্ধ থাকলে মাল আনতে কষ্ট। লোক থাকলে বিক্রি। এই দুইটা একসঙ্গে চলে।
কথাবার্তা বদলানোর আগে খদ্দেরের চেহারা দিয়া বাকি দেওয়ার ক্ষমতা বুঝতাম। এখন চেহারা দিয়া পক্ষ বুঝতে বলে। দাড়ি থাকলে এক রকম, কপালে পতাকা থাকলে আরেক রকম—এমনভাবে লোকজন তাকায়। আমি এই হিসাব ধরি না। দাড়িওয়ালাও বাকি মারে, পতাকাওয়ালাও মারে। নগদ দিলে ভালো লোক, সময়মতো শোধ দিলে আরও ভালো। এই নীতিতে ভুল কম।
মার্চে চিনি আর দুধের দাম দুইবার বাড়ল। পাইকার বলল রাস্তাঘাটের অবস্থা, গাড়ি আসে না। কোন রাস্তা বন্ধ ছিল জিজ্ঞেস করলে ঠিক কইতে পারে না। বড় ঘটনার নাম দিয়া ছোট দাম বাড়ানো সহজ। আমি তিন দিন চায়ের দাম ছয় টাকাই রাখলাম। চিনি একটু কম দিছি। নিয়মিতরা ধরল। একজন বলল আন্দোলনের সুযোগে লাভ করতেছি। আমি তাকে পাইকারের রসিদ দেখাইলাম। সে রসিদ দেখেও বিশ্বাস করল না। মানুষের মত যখন আগে তৈরি থাকে, কাগজ পরে আসে।
শেষে সাত টাকা করার কথা লিখে টিনে লাগাইলাম। সকালে তিনজন আপত্তি করল, দুপুরে সবাই দিল। যে রফিক প্রমাণ চাইছিল, সে সাত টাকার বদলে দশ দিল আর খুচরা নিল না। দাড়িওয়ালা লোক পরের সপ্তাহে এসে ঠিক সাত টাকা গুনে দিল। পক্ষ আলাদা, বাড়তি তিন টাকার সিদ্ধান্তও আলাদা। ক্যাশবাক্সে শেষে অঙ্কই থাকে। আমি খাতায় নতুন দাম লিখে পুরোনোটার উপর দাগ টানলাম। দাগের নিচের ছয় টাকা তবু দেখা যায়—পুরোনো দাম পুরো মুছে না।
এক বৃষ্টির দিনে দোকানের চাল ফুটো হয়ে পানি পড়ল। খদ্দেররা কাপ সরিয়ে তর্ক চালাইছে। আমি বালতি বসালাম। পানি ফোঁটা ফোঁটা জমে। একজন বলল দেশের ছাদও ফুটো; আরেকজন বলল আগে নিজের দোকান ঠিক করেন। আমি দ্বিতীয়জনের কথাই ঠিক ধরলাম। টিন বদলাতে বারোশো লাগবে। দেশের ছাদ ঠিক করার লোক অনেক, আমার দোকানের টিনের টাকা আমারই। তবু প্রথমজনের কথা মাথায় রইল, কারণ সে বাকি শোধ করছিল। টাকা দিলে মানুষের কথা বেশি মনে থাকে—এইটা ভালো অভ্যাস না, কিন্তু ব্যবসা এমন।
বাচ্চু একদিন জানতে চাইল দোকানের নাম বদলে ‘প্রজন্ম চা ঘর’ রাখব কি না। নাকি বিক্রি বাড়বে। আমি জিজ্ঞেস করলাম সাইনবোর্ডের টাকা কে দেবে। সে বলল পরে দেখা যাবে। ‘পরে’ দিয়া যারা পরিকল্পনা করে, তাদের দোকান থাকে না। আমি নাম বদলাই নাই। এই দোকান যখন কিনছি, আগের মালিকের দেওয়া নামও রাখি নাই; শুধু লিখছি ‘মজনু টি স্টল’। নিজের নাম তুলতে ষোলো বছর লাগছে। নব্বই দিনের নাম লাগাইয়া সেইটা ঢাকব ক্যান?
এক দুপুরে দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এলো। একজন আরেকজনকে বলল, ‘এখানে আর আগের এনার্জি নাই।’ এনার্জির বাংলা কী জিজ্ঞেস করতে পারতাম। করি নাই। তারা দুই কাপ চা নিয়ে এক কাপের দাম দিল। মনে করিয়ে দিলে বলল ভুল হয়েছে। আগের এনার্জি থাকলে কি টাকা দুইটা দিত? জানি না। তাদের একজন খাতায় নিজের নাম দেখে বলল, ‘আমার এত বাকি?’ আমি পাতার তারিখ দেখালাম। সে অর্ধেক শোধ করল, অর্ধেক পরে। আন্দোলন কমলেও বাকি কমে না।
দোকানের সামনে পোস্টার লাগাতে এসে এক ছেলে অনুমতি চাইল না। আঠা দিয়ে দোকানের টিনে লাগিয়ে দিল। পোস্টারে কারও মুখ, নিচে বড় কথা। আমি বললাম, ‘এইখানে লাগাইছেন ক্যান?’ সে বলল, ‘সবার দেখার জন্য।’ আমি বললাম, ‘আমার দোকান সবাইর?’ সে বিরক্ত। রাতে পোস্টার খুলতে গিয়ে কাগজের অর্ধেক টিনে রইল। পানি দিলে রং গড়িয়ে দোকানের নাম নষ্ট করল। পরদিন ছেলে এলে পরিষ্কার করতে বললাম। সে আর এলো না। বড় কথার আঠা দোকানিকেই ঘষে তুলতে হয়।
রফিক একদিন একা এসে বলল, ‘সেদিন বেশি হয়ে গেছে।’ আমি ভাবলাম টাকার কথা। সে দাড়িওয়ালা লোকের সঙ্গে ঝগড়া বোঝাল। বললাম, ‘চা খাইবেন?’ সে বলল, ‘তুমি সবকিছুর উত্তর চা দিয়ে দাও।’ আমি বললাম, ‘আমার কাছে আর কী আছে?’ কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার পরে নিজেই থামলাম। দোকান আছে, মিরপুরে বাসা, বউ, তিন ছেলেমেয়ে। তবু খদ্দেরের সামনে আমার যা দেওয়ার, চা-ই। মত দিলে সে আরেক মত চাইবে; চা দিলে কাপ শেষ হয়।
মাঝে মাঝে পুলিশ আসে। আগের ‘পুলিশ—১২’ এখনও শোধ হয় নাই। নতুন যারা নেয় তাদের নগদ চাই কি না ভাবি। একদিন একজন নিজেই বলল, ‘আগেরটা আমার না।’ আমি বললাম, ‘পুলিশই তো।’ সে হেসে ছয় টাকা দিল। খাতায় পুরোনো বাকি রইল। ইউনিফর্ম এক, পকেট আলাদা। আন্দোলনের পক্ষগুলাও হয়তো এমন; বাইরে এক নাম, ভিতরে অনেক পকেট। এই কথা কাউরে বলি নাই।
বউ দোকানে এসেছিল এক বিকেলে, ছোট মেয়েকে ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে। ভিড় কম দেখে বলল, ‘এত লোক কই?’ আমি বললাম, ‘কাজ আছে মানুষের।’ সে ক্যাশবাক্সের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল বিক্রি কমছে কি না। আমি বললাম, চলে। বউ বুঝে গেল। সংসারে ‘চলে’ মানে ভালো না, বন্ধও না। সে বড় ছেলের কোচিংয়ের কথা তুলল। দোকানের সামনে খদ্দের থাকায় আমি না করতে পারলাম না। বললাম, ‘দেখা যাক।’ সে জানে এইটার মানে অর্ধেক রাজি।
সন্ধ্যার পরে এক বৃদ্ধ কবি এলেন, নব্বইয়ের সময় থেকে চিনি। তিনি চা হাতে বললেন, ‘মজনু, ইতিহাস দেখলা।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইতিহাসের বাকি কে দেয়?’ তিনি হাসলেন, তারপর কাশলেন। বললেন, ‘তুমিই লিখে রাখো।’ আমি খাতা দেখালাম। তিনি নিজের পুরোনো নাম খুঁজে পেলেন, পাশে দাগ। বললেন, ‘দেখো, আমি শোধ করি।’ আমি বললাম, ‘দুই মাস পরে।’ তিনি আবার হাসলেন। ইতিহাসের মানুষও সময়মতো টাকা দেয় না।
বড় ছেলের স্কুল থেকে নোটিশ আসছে। পরীক্ষার কোচিং লাগবে। বউ বলল মাসে আটশো। আমি বললাম, ক্লাসে কী শেখায়? ছেলে ফোনে কইল সবাই কোচিং করে। ‘সবাই’ নামের খদ্দের আমার দোকানেও আসে; তার বাকি সবচেয়ে বেশি। শেষে ছয়শোতে এক মাস দেখার কথা হইল।
মার্চের এক শুক্রবার দোকান তাড়াতাড়ি খুলে বসছিলাম। বড় ছেলে সঙ্গে আসছে। স্কুল বন্ধ। তাকে ক্যাশ ধরতে দিলাম না; চিনি মাপতে দিলাম। এক কাপের জন্য কত চামচ, শেখাইলাম। সে দুইবার বেশি দিল। বললাম, ‘এইভাবে দোকান করলে মাসে এক বস্তা চিনি নাই।’ সে বলল, ‘মানুষ মিষ্টি চা পছন্দ করে।’ আমি বললাম, ‘মানুষ পছন্দের দাম দেয় না।’ ছেলেটা মুখ বাঁকাল।
দুপুরে সেই বৃদ্ধ কবি এসে ছেলেকে জিজ্ঞেস করল কী হতে চায়। সে বলল ইঞ্জিনিয়ার। কবি বলল, ‘বাবার দোকান নেবে না?’ ছেলে সঙ্গে সঙ্গে না। আমি কাপ ধুইতেছিলাম, হাত থামাই নাই। দোকান কিনতে আমার ষোলো বছর গেছে; সে এক শব্দে ফিরায় দিল। রাগ হওয়ার কথা, আবার ভালোও লাগল। আমি চাই সে অঙ্ক শিখুক, দোকানের হিসাব না। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার হইতে কোচিং লাগে, গাইড লাগে—সব দোকানের টাকা।
ছেলে খাতার পাতা উল্টাইয়া নাম পড়ছিল। জিজ্ঞেস করল এত লোকের বাকি দিই কেন। বললাম চেনা মানুষ। সে বলল, ‘যারা দেয় না তারা চেনা কেমনে?’ কথার উত্তর ছিল না। চিনা মানে শুধু টাকা ফেরত না; প্রতিদিন দেখা, অসুখে খবর, দোকান বন্ধ থাকলে ফোন। আবার কেউ বহু বছর পরে আসে, এক কাপের টাকা রেখে যায়—তাকেও চিনি।
ওই লোকটা আর আসে না।
দোকানে তখন আরেক তর্ক। একজন বলতেছে আন্দোলন দখল হইছে, আরেকজন বলতেছে আন্দোলনের শত্রু চিহ্নিত। দুইজনকেই চা দিলাম। রাতে হিসাবের সময় মনে হইল আমি কোন পক্ষে। প্রশ্নটা যদি খদ্দের করত, পাল্টা প্রশ্ন করতাম। নিজেরে কী বলব?
উত্তর খাতাতেই ছিল। দুই পক্ষই খাতায় আছে। দুই পক্ষেরই বাকি আছে।