FF.
অধ্যায় ৭ · সতেরো তারিখ Book page

Chapter 7

অধ্যায় ৭ · সতেরো তারিখ

Oct 18, 2026 7 min read

ফরিদা · ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

খবরটি আমি বাসে পেয়েছিলাম। অফিস থেকে বের হতে দেরি হয়েছিল; হিসাবের মাসিক বিবরণীতে দুটি অঙ্ক মিলছিল না। বাংলামোটর পেরোনোর সময় রুবিনা ফোন করল। তার গলা উত্তেজিত। সংসদে সংশোধনী পাস হয়েছে—রাষ্ট্রপক্ষও দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে, এবং সংশোধনটি আগের মামলায় প্রযোজ্য হবে।

আমি ফোন কানে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়েছিলাম। বাসের কাচে ধুলো। পাশে দাঁড়ানো লোকের ব্যাগ বারবার কাঁধে লাগছিল। রুবিনা বলল, ‘শুনছ? এই জন্যই তোরা দাঁড়াইছিলি।’

‘তোরা’ শব্দটি শুনে থেমেছিলাম। রুবিনা দুই দিন গিয়েছে, তারপর মেয়ের জ্বর। তবু সে আমাকে একটি দলের মধ্যে রেখে কথা বলল। আমি কি সত্যিই তাদের একজন? মঞ্চের কেউ আমাকে চেনে না। আমি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা দাঁড়াই, কখনো ফুল নিয়ে, কখনো খালি হাতে। সদস্য হওয়ার কোনো ফরম পূরণ করিনি। তবু বাসের ভিড়ে সেই বহুবচন আমাকে আশ্রয় দিল। পরে আবার ভয় হলো—দলভুক্ত হলে তার সব কথার দায়ও কি আমার?

আইনটির ভাষা ফোনে পুরো বোঝা যায়নি। বাসায় ফিরে ইন্টারনেটে খুঁজলাম। ধারা, উপধারা, আপিলের সময়সীমা। অফিসের নথির ভাষায় অভ্যস্ত বলে পড়তে পারলাম, কিন্তু একই বাক্য দুবার পড়তে হলো। সংশোধনী ভূতাপেক্ষ—এই শব্দটি আমাকে থামাল। আইন সামনে হাঁটে, আজ তাকে পেছনে পাঠানো হয়েছে। পেছনে গেলে সে কত দূর যেতে পারে? ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১৯৭১ পর্যন্ত নয়। আমার বাবার দরজার সকাল তার নাগালের বাইরে।

আমি কাগজে দুটি তারিখ লিখেছিলাম: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। মাঝখানে বিয়াল্লিশ বছরের রেখা। তারপর নিজের জন্মতারিখ লিখলাম রেখার কাছে। কাগজটি দেখে মনে হলো স্কুলের সময়রেখা। ইতিহাসকে সোজা দাগে আঁকা যায়, জীবন তাতে বেঁকে থাকে। মায়ের চুল পেকে গেছে, আমার চাকরি হয়েছে, সরকার এসেছে গেছে—রেখায় এসব নেই।

সন্ধ্যায় শাহবাগে যাওয়ার বাসে একজন ছাত্র আইনটির সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলছিল। তার যুক্তি শুনে অস্বস্তি হলো। আজ আনন্দের দিন, সে কেন প্রশ্ন করছে? পরক্ষণে নিজের উপর বিরক্ত হলাম। কাগজ বদলানোর দাবিই তো প্রশ্ন থেকে এসেছে; বদলালেই প্রশ্ন নিষিদ্ধ হবে কেন? আনন্দও মানুষকে অনুগত করতে চায়। আমি তার সব কথা মানিনি, কিন্তু শুনেছি।

মোড়ে পৌঁছে দেখি কেউ মিষ্টি বিলাচ্ছে। একটি টুকরা হাতে দিয়েছিল। আমি খেতে পারিনি; কাগজে মুড়িয়ে ব্যাগে রেখেছি। রাতে ব্যাগ খুললে মিষ্টি গলে নথির কপিতে লেগেছিল। আনন্দেরও দাগ পড়ে, পরিষ্কার করা কঠিন।

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, শুনছি।’

সে হয়তো আরও কিছু বলেছিল। কল কেটে যাওয়ার পর আমি নামিনি। শাহবাগ তখন সামনে, চাইলে নেমে যেতে পারতাম। বরং বাসায় গেলাম। চাবি দিয়ে দরজা খুললাম। মা দুপুরের রান্না ঢেকে রেখেছিলেন। তিনি নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি রান্নাঘরে পানি বসিয়ে চা বানালাম—দুধ ছাড়া, অল্প চিনি। কাপ নিয়ে বসার ঘরে বসলাম। টেলিভিশন চালাইনি।

একটি আইন বদলেছে। কাগজে কয়েকটি শব্দ যোগ হয়েছে, কয়েকটি অধিকার অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে। আমার বাবাকে যে সকালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন কোনো কাগজ আমাদের দরজা রক্ষা করেনি। স্বাধীনতার পরে মা যত আবেদন লিখেছেন, প্রতিটির শেষে ছিল ‘বিনীত নিবেদন’। রাষ্ট্রের কাছে মানুষ নিজের শোকও বিনীতভাবে জমা দেয়। আজ রাষ্ট্রের আরেকটি কাগজ বদলেছে। আমি আনন্দিত কি না বোঝার চেষ্টা করলাম।

অফিসে খবর আসার আগের ঘণ্টাগুলো স্বাভাবিক ছিল। আমি বেতন বিবরণীর অঙ্ক মিলিয়েছি, চিঠির খসড়া ঠিক করেছি, দুপুরে রুবিনার সঙ্গে ভাত খেয়েছি। সে বলেছিল আজ সংসদে কিছু হতে পারে। আমি মাথা নেড়ে ফাইল খুলেছি। অপেক্ষা দেখানো যায় না; কাজের নিচে চাপা রাখা যায়। তিনটার পরে টেবিলের ফোন বেজে উঠলেই বুক কেঁপেছে, অথচ বেশির ভাগ কল ছিল হিসাব শাখা থেকে।

আমাদের দপ্তরে পুরোনো নথির গন্ধ আছে—ধুলো, স্যাঁতসেঁতে কাগজ, কার্বনের কালি। একদিন রেকর্ডরুমে দাঁড়িয়ে ভেবেছিলাম বাবার চাকরির ফাইলও কোনো ঘরে এমন পড়ে ছিল কি না। তাঁর অনুপস্থিতি কি কোনো কর্মকর্তা লাল কলমে নোট করেছিলেন: কর্মস্থলে অনুপস্থিত? যুদ্ধের ভেতরেও হাজিরা খাতা থাকে। কে ফিরল, কে ফিরল না—কেউ না কেউ দাগ দেয়। আমাদের পরিবারের খাতায় দাগটি কখনো চূড়ান্ত হয়নি।

খবরটি আসার পরে রুবিনা বলেছিল, ‘চল, আজ তাড়াতাড়ি বের হই।’ কিন্তু মাসিক বিবরণীর দুটি অঙ্ক মিলছিল না। আমি বলেছিলাম, ‘এটা শেষ করি।’ সে হেসে বলেছিল, ‘তুমি সব সময় অঙ্ক মিলাও।’ কথাটা সত্য। অঙ্ক মিললে জগতের অন্তত ছোট একটি জায়গা ঠিক থাকে। সেদিন আইন বদলাল, অথচ আমি দশ হাজার টাকার ব্যবধান খুঁজে বের করছিলাম। শেষ পর্যন্ত দেখি একটি ভাউচার দুইবার যোগ হয়েছে। ভুল কেটে সই করলাম। তখন পাঁচটা পার।

বাসে ফোন রাখার পর পাশের নারী জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হইছে আপা?’ হয়তো আমার মুখ দেখে। আমি বললাম, ‘আইন পাস হয়েছে।’ তিনি কোন আইন জানতে চাইলেন। সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করলাম। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে বলতেই তিনি বললেন, ‘ভালো হইছে।’ তারপর কন্ডাক্টরের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্কে গেলেন। তাঁর ভালো হওয়া এত সহজ দেখে ঈর্ষা হয়েছিল। আমার কাছে খবরটি বিয়াল্লিশ বছরের করিডর পেরিয়ে এসেছে; তাঁর কাছে এক বাসস্টপের। কিন্তু তাঁর আনন্দ কম সত্যি ছিল না।

বাসা ফিরে চা বানাতে গিয়ে চিনি দিতে ভুলেছিলাম। প্রথম চুমুকে টের পেলাম, তবু আর দিইনি। জানালার নিচে বাচ্চারা খেলছিল। একজন আউট হয়েছে কি না নিয়ে চিৎকার। পৃথিবীর এই অমনোযোগ আমাকে আহতও করল, স্বস্তিও দিল। একটি আইন বদলালে সব জানালা খুলে যায় না।

মায়ের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম তিনি ঘুমাচ্ছেন। তাঁর মাথার পাশে ওষুধের কৌটা। তাঁকে জাগিয়ে খবর দিতে ইচ্ছা হলো। তারপর মনে পড়ল তিনি জেগেও হয়তো বলবেন, ‘চা খাইছিস?’ তাঁর কাছে বাবার ঘটনা আইন নয়, দৈনন্দিন অনুপস্থিতি। বাজারের ভারী ব্যাগ একা তোলা, সন্তানের স্কুলের ফরমে পিতার পেশা লেখা, রাতের দরজায় শব্দ হলে চমকে ওঠা। আমার খবর সেই জীবনকে ফেরত দেবে না।

তবু সন্ধ্যায় বের হওয়ার আগে তাঁর ঘরে গিয়ে বলেছিলাম, ‘আমি যাচ্ছি।’

মা চোখ না খুলে বললেন, ‘দেরি করিস না।’

আমি জানতাম দেরি হবে। মানুষ কখনো অনুমতি নেয় না, কেবল খবর দিয়ে যায়।

চা ঠান্ডা হয়ে গেল। মা ঘুম থেকে উঠে বললেন, ‘আজ যাবি না?’

আমি বললাম, ‘যাব।’

‘তাইলে বসে আছিস কেন?’

উত্তর ছিল না। আমি কাপ ধুয়ে শাড়ি বদলাইনি, কেবল চাদর নিয়ে বের হলাম।

সন্ধ্যায় মোড়ে আলো জ্বলছিল। মানুষ খবর জানে। কেউ একে অন্যকে অভিনন্দন দিচ্ছে, কেউ বলছে কাজ শেষ হয়নি। আমি কাঠের ছবির কাঠামোর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবার ছবি তখনও সেখানে নেই। ভিড়ের মধ্যে একজন জাতীয় সংগীত ধরল। আমি গাইতে পারিনি।

মিষ্টির কাগজটি ব্যাগে রেখে কাঠামোর দিকে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন তরুণ নিজের দাদার ছবি লাগাচ্ছিল। আঠা শুকাচ্ছিল না। আমি কোণা ধরে সাহায্য করলাম। সে বলল, ‘আপনার কেউ?’ প্রশ্নটি আমাকে অপ্রস্তুত করল। বললাম, ‘আছে।’ ছবিহীন মানুষকেও আছে বলা যায়। সে জায়গা করে দিতে চাইল। আমি বললাম আজ সঙ্গে আনিনি। সে জানত না আমার কাছে আনার মতো ছবি নেই।

মঞ্চে আইন পরিবর্তনের কথা বারবার বলা হচ্ছিল। প্রতিবার হাততালি। আমি প্রথমবার দিয়েছি, পরে হাত নামিয়ে রেখেছি। একই সুখ কতবার প্রকাশ করতে হয়? আবার মনে হলো যারা নতুন এসে শুনছে, তাদের প্রথমবার। জনতার সময় ব্যক্তির সময়ের মতো না; ঘোষণা পুনরাবৃত্ত হয়, অনুভূতি হয় না।

আমার পাশে এক নারী ফোনে কারও সঙ্গে ঝগড়া করছিলেন—আজ ফিরবেন না। ফোন রেখে তিনি আমাকে বললেন, ‘বাসার মানুষ বুঝে না।’ আমি মাথা নেড়েছিলাম। আমার মা বুঝতে চান কি না জানি না। তিনি টিভি বদলে দেন। হয়তো বোঝার মূল্য তাঁর জন্য বেশি। যে যুদ্ধ তাঁকে সব নিয়েছে, তার বিচার নিয়ে আবার বাঁচা সহজ নয়।

আলোয় কাঠের ফাঁকা অংশ দেখছিলাম। বাবার নাম লিখে লাগাতে পারতাম। ব্যাগে কলম ও কাগজ ছিল। বের করিনি। আইন বদলানোর দিনে তাঁর অনুপস্থিতিকে আরেকটি কাগজে নামাতে ভয় হলো। যদি কাগজটি পড়ে যায়? যদি কেউ নামের বানান ভুল পড়ে? মানুষকে প্রকাশ্যে আনার সঙ্গেও দায় আছে।

চোখে পানি আসার আগে কোনো সতর্কতা ছিল না। আমি মুখ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, পারিনি। কাঁদতে শুরু করলাম—শব্দ ছাড়া, দাঁড়িয়ে। আশপাশে এত মানুষ, অথচ কেউ জিজ্ঞেস করল না কেন। এই না-জিজ্ঞেস করা আমার জন্য দয়া ছিল। কেউ জানলে হয়তো আমাকে শহিদ পরিবারের নারী বলে সামনে বসাত, মাইকে কথা বলতে বলত। আমি কোনো কথা প্রস্তুত করিনি। আমি কেবল হিসাব করেছিলাম: বিয়াল্লিশ বছর। আমার বয়স একচল্লিশ। বাবার অনুপস্থিতি আমার চেয়ে পাঁচ মাস বড়। আর আজ প্রথমবার কোনো কাগজে কিছু বদলাল।

রাতে বাসায় ফিরে মাকে ফোন করলাম—তিনি তখন পাশের বাসায় গিয়েছিলেন। বললাম, ‘মা, আইনটা বদলাইছে।’

মা বললেন, ‘কী হইছে?’

তিনি টেলিভিশন দেখেননি। আমি ব্যাখ্যা করতে গেলাম। রাষ্ট্রপক্ষ, আপিল, ভূতাপেক্ষ—শব্দগুলো বললাম। মাঝপথে আমার বাক্য থেমে গেল। মা ওপাশ থেকে বললেন, ‘হ্যালো? ফরিদা?’

আমি বললাম, ‘কিছু না, মা। তুমি আসো।’

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.