FF.
অধ্যায় ১১ · গ্রামের ফোন Book page

Chapter 11

অধ্যায় ১১ · গ্রামের ফোন

Oct 18, 2026 7 min read

হাশেম · মার্চ ২০১৩

বাবা ফোন করেছিলেন রাতের খাবারের পরে। ব্যারাকে তখন টেলিভিশনে খবর চলছিল। একজন চ্যানেল বদলাচ্ছিল, আরেকজন গালি দিচ্ছিল। ফোন কানে নিয়ে বারান্দায় যাওয়া হলো।

বাবা প্রথমে মায়ের হাঁটুর কথা বললেন। তারপর গরুর খাবারের দাম। শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই কোন পক্ষের ডিউটি করিস?’

প্রশ্নটা বুঝতে সময় লেগেছিল। বললাম, ‘কীসের পক্ষ?’

ফোন আসার আগে রাতের ভাত খাওয়া হয়েছিল। ব্যারাকের ডাইনিংয়ে মাছের টুকরা ছোট। রেশন থেকে চাল-ডাল পাওয়া যায়, রান্নার চাঁদা আলাদা। মাসের মাঝামাঝি চাঁদা বাড়ানোর কথা উঠলে সবাই তর্ক করে। সেদিনও করছিল। একজন বলল ডিউটি ভাতা কবে হবে, আরেকজন বলল কাগজ গেছে। আমাদের অনেক টাকার কাগজ কোথাও যায়; টাকা ফিরতে সময় লাগে। গ্রামের বাড়িতে কিন্তু চালের দোকানি অপেক্ষা করে না।

বাবার নম্বর স্ক্রিনে দেখে প্রথমে ধরতে ইচ্ছা হয়নি। তিনি ফোন করলে প্রথমে শরীরের খবর, পরে টাকা, শেষে জমির কথা। আমার নিজের খবরের জন্য জায়গা কম। তবু না ধরলে আবার করবেন। করিডরে গিয়ে ধরেছিলাম। বাইরে বাতাসে রান্নার ধোঁয়া। দূরে আরেক ব্যারাক থেকে হাসির শব্দ।

‘ওই যে ঢাকাত। লোকে কয় পুলিশ এক পক্ষ হইয়া গেছে।’

আমি বললাম, ‘আমারে যেখানে দেয়, ওইখানে ডিউটি করি।’

বাবা বললেন, শুক্রবার মসজিদের বারান্দায় কথা উঠেছে। গ্রামের লোক জানে তার ছেলে ঢাকায় পুলিশ। কেউ জিজ্ঞেস করেছে আমি শাহবাগের লোক পাহারা দিই, না তাদের সরাই। বাবা উত্তর দিতে পারেননি। এখন আমার কাছে উত্তর চান।

গ্রামের লোকের মুখগুলো মনে পড়ল। বাজারের রহিম চাচা, মসজিদের মোয়াজ্জিন, স্কুলের মাস্টার। চাকরি পাওয়ার পরে বাড়ি গেলে তারা আমার বেল্ট দেখে, বেতন জিজ্ঞেস করে, থানায় পরিচিত কেউ আছে কি না জানতে চায়। তাদের কাছে আমি পুলিশ, কিন্তু ব্যারাকে আমি কেবল কনস্টেবল নম্বর। দুই জায়গার মাঝখানে যে মানুষটি থাকে তার নাম কেউ জিজ্ঞেস করে না।

বাবা বললেন, ‘হুজুর কইছে, অন্যায় দেখলে চুপ থাকা যায় না।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন অন্যায়?’

তিনি বিরক্ত হলেন। ‘তুই ঢাকাত থাকিস, তুই জানবি।’

আমি ঢাকায় থেকেও কত কম জানি বলতে পারলাম না। ডিউটির জায়গায় দাঁড়ালে সামনে মাথা দেখা যায়, মাইকের অর্ধেক কথা শোনা যায়। খবর দেখতে গেলে এক চ্যানেল এক কথা, আরেকটা আরেক। স্যারদের সামনে মত দেওয়া যায় না। ব্যারাকে মত দিলে ঝগড়া। না বললে গ্রামের মানুষ ধরে নেয় আমি সব জানি।

বাবা জানতে চাইলেন আমি লাঠি মেরেছি কি না। প্রশ্নটা আচমকা। বললাম, ‘কাউরে মারি নাই।’ তখন পর্যন্ত সত্যি। প্রশিক্ষণে মানুষ নয়, বস্তায় লাঠি চালানো শিখেছি। ডিউটিতে এক ছেলের হাত বেশি জোরে ধরেছিলাম—এটা কি মারার মধ্যে পড়ে? বাবাকে বলিনি।

তিনি বললেন, ‘পুলিশের বদনাম হইলে আমাদেরও কথা শুনতে হয়।’

আমার রাগ হলো। আমার পায়ের ক্ষত, ঘুমহীন রাত, ঠান্ডা ভাত তাদের বদনামে যোগ হয় না। ইউনিফর্মের কাজ আমার, সম্মান-অপমান গ্রামের সবার। বললাম, ‘আপনে তাদের কন আমি আপনার কাম করি না। সরকারের করি।’ বলেই বুঝলাম কথাটা বাবাকে আঘাত করবে।

ওপাশে কাশি শোনা গেল। মা হয়তো কাছে ছিলেন। বাবা নিচু গলায় বললেন, ‘সরকার তো বদলায়।’

আমি বললাম, ‘চাকরি বদলায় না।’ কথাটা পুরো সত্য না। বদলি হয়, সাসপেন্ড হয়, চাকরি যায়। তবু তখন সত্য মনে হয়েছিল।

ফোনের পরে খাটে ফিরে দেখি জামাল ঘুমের ভান করছে। সে সব শুনেছে কি না জানি না। একটু পরে বলল, ‘বাড়ির লোক ভাবে আমরা ইচ্ছামতো সব করি।’

আমি বললাম, ‘তোর ছুটি হইছে?’

‘দুই দিন।’

তার স্ত্রী হাসপাতালে গেছে। সে ভোরে রওনা দেবে। আমার মনে হলো তার ভাগ্য ভালো। সঙ্গে সঙ্গে নিজের উপর রাগ হলো। কারও স্ত্রী অসুস্থ হওয়া ভাগ্য না। আমরা অন্যের ছাড়পত্র দেখি, কারণ নিজেরটা পাই না।

পরদিন ডিউটির আগে বুট পালিশ করছিলাম। ফোনের কথাগুলো মাথায়। পালিশে চামড়া কালো ও সমান হয়; পুরোনো আঁচড় পুরো ঢাকে না। ইউনিফর্ম পরলে ব্যক্তিগত চিন্তার উপরও তেমন একটা রং পড়ে। রোলকলে নাম ডাকলে ‘উপস্থিত’ বলেছি। কোন পক্ষের—কেউ জিজ্ঞেস করেনি।

ডিউটিতে এক বৃদ্ধ আমাকে কাছে ডেকে রাস্তা জানতে চাইলেন। আমি পথ দেখালাম। তিনি বললেন, ‘বাবা, তোমরা কষ্ট করো।’ কথাটা শুনে ভালো লাগার কথা। বদলে সন্দেহ হলো—তিনি কোন পক্ষের? সঙ্গে সঙ্গে নিজের এই ভাবনায় ভয় পেলাম। বাবার প্রশ্ন আমার চোখের ভেতর ঢুকে গেছে।

আমি বোঝাতে পারলাম না ডিউটির কোনো নিজের পক্ষ নেই। সকালে রোলকলে নাম ডাকা হয়, গাড়িতে তোলা হয়, জায়গা বলা হয়। ব্যারিকেড ধরতে বলা হলে ধরা হয়। সরতে বললে সরা হয়। সামনে যারা থাকে তাদের নাম জানা লাগে না। উপরের নির্দেশ নিচে আসে; নিচের লোক নির্দেশের ব্যাখ্যা পায় না।

বাবা আবার বললেন, ‘তোর নিজের বুঝ নাই?’

রাগ হয়েছিল। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকার পরে গ্রামের উঠানে বসে পক্ষ বোঝা সহজ মনে হয়েছিল। বললাম, ‘আমি চাকরি করি।’

ওপাশে কিছুক্ষণ শব্দ ছিল না। তারপর বাবা বললেন, ‘আচ্ছা।’ তাঁর আচ্ছা সাইরেনের চেয়ে খারাপ লাগল।

ফোন রাখার আগে বাবা ছোট বোন রুবির কথা তুলেছিলেন। কলেজে ফরম পূরণের টাকা লাগবে। গত মাসে যা পাঠিয়েছি তা থেকে হবে না। আমি হিসাব করলাম পরের বেতন আসতে নয় দিন। জামালের কাছে একশো পাওনা, ক্যান্টিনে বাকি তিনশো, পকেটে সাতশোর মতো। বললাম ব্যবস্থা করব। বাবা জিজ্ঞেস করলেন কবে। ‘দেখি’ বললে তিনি চুপ। গ্রামের ফরমের শেষ তারিখ ডিউটির রোস্টার মানে না।

রুবি ফোন নিল। বলল, ‘ভাই, না পারলে সমস্যা নাই।’ এই কথা শুনলেই সমস্যা বড় হয়। সে কোনো দিন সরাসরি টাকা চায় না। আমি বললাম পড়া বন্ধ করলে বাড়ি এসে কান ধরে নিয়ে যাব। সে হাসল। অনেক দিন তার হাসি শুনিনি। তারপর জিজ্ঞেস করল শাহবাগে মেয়েরা সত্যিই রাত থাকে কি না। বললাম থাকে। সে বলল, ‘আমিও ঢাকা পড়তে যামু।’ কী উত্তর দেব বুঝলাম না। যে ভিড়ের জন্য বাবা প্রশ্ন করছেন, সেই ভিড় রুবির কাছে শহরের দরজা।

আমি তাকে পড়াশোনা করতে বললাম। পুলিশে ঢুকতে চাইলে কী করতে হয় জিজ্ঞেস করল। বললাম আগে উচ্চতা লাগবে। সে রাগ করে ফোন বাবাকে দিল। আমাদের পরিবারের প্রতিটি স্বপ্নে টাকার আগে শরীরের মাপ, পরীক্ষার ফি, পরিচিত লোক—কিছু না কিছু দাঁড়ায়। শাহবাগের মানুষ দাবি করলে মাইক পায়। রুবির দাবি ফোনের ওপাশে ছোট হয়ে আসে।

ফোন রাখার পরে বারান্দায় বসে ছিলাম। বাক্যটা মাথায় চলছিল—আমি চাকরি করি। এই চাকরির জন্য প্রশিক্ষণের মাঠে দৌড়ানো হয়েছে, গালি শোনা হয়েছে, প্রথম পোস্টিংয়ে তিন রাত ঘুম হয়নি। মাস শেষে বেতন আসে। ২০০৯ সালের স্কেলে বেসিক খুব বেশি ছিল না; ঢাকা ভাতা, রেশন মিলিয়ে চলে। নিজের খরচ কেটে পাঁচ হাজারের বেশি বাড়ি পাঠাই। বেতনের অর্ধেকেরও বেশি। ছোট বোনের কলেজ, মায়ের ওষুধ, চালের বাকি—সব ওই টাকা থেকে।

পরদিন ক্যান্টিনের বাকি আরও বাড়ালাম। সহকর্মী শফিকের কাছ থেকে এক হাজার নিলাম। সে কোনো প্রশ্ন করেনি, শুধু বলল বেতনের দিন। বিকাশের দোকানে যেতে ডিউটির পরে অনুমতি লাগল। রাত সাড়ে দশটায় টাকা পাঠালাম। দোকানি চার্জ বেশি নিল। তর্ক করার শক্তি ছিল না। বাবাকে বার্তা দিলাম। উত্তর এলো—‘পাইছি।’ কোনো ধন্যবাদ নেই। আমাদের ঘরে টাকা ভালোবাসার ভাষা, কিন্তু বাক্য ছোট।

ডিউটিতে দাঁড়িয়ে দেখলাম আমার বেতনের চেয়ে দামি ক্যামেরা নিয়ে মানুষ ছবি তুলছে। ঈর্ষা হয়নি বলা মিথ্যা। আবার একজন বৃদ্ধের ছেঁড়া জুতা দেখে মনে হলো ভিড়েও আমার মতো হিসাব আছে। ইউনিফর্ম শ্রেণি ঢাকে, মুছে না। বুট সরকারি, মোজা নিজের; ক্ষতও নিজের।

এই কথাগুলো বাবাকে বললে তিনি হয়তো চুপ করতেন। বলিনি। টাকা পাঠানোর কথা বলে নিজের কথা ঠিক প্রমাণ করতে ইচ্ছা হয়নি। মাস শেষে আগের মতো বাজারের বিকাশ দোকানে পাঠানো হবে। বাবা বিশ টাকা কাটার কথা বলবেন। আমি শুনব।

বেতনের দিন লাইনে দাঁড়িয়ে সই করার সময় মনে হয়েছিল কাগজে সংখ্যাটি আমার, হাতে পাওয়ার আগেই কতজনের। রেশন থেকে চাল নিলে ঢাকায় নিজের খাওয়া চলে, কিন্তু বাড়িতে নগদ লাগে। মা ওষুধ বাকিতে নেন না; দোকানি আগেরবার বলেছেন। ভাই জমিতে কাজ করে, তবু তার সন্তানের জ্বর হলে ফোন আমার কাছে। আমি বড় ছেলে না, তবু সরকারি চাকরি আছে বলে পরিবারের কাছে বড় পকেট। পকেটের ভিতরটা তারা দেখে না।

শফিককে ধার ফেরত দেওয়ার কথা বললে সে বলল আগামী মাসে। তার নিজেরও বাড়ি আছে, তবু সময় দিল। আমি ধন্যবাদ দিইনি; আমরা একই ব্যারাকে ধন্যবাদ কম বলি। বদলে তার রাতের শিফটে এক ঘণ্টা আগে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সে বুঝেছে। সহকর্মীর ঋণ টাকা দিয়ে শেষ হয় না; রোস্টারের ফাঁকে শরীর দিয়ে শোধ হয়।

সেদিন ডিউটিতে একটি মেয়ে ব্যারিকেডের ওপাশ থেকে বলেছিল, ‘ভাই, আপনাদের কষ্ট হয় না?’ প্রশ্নটি শুনে রাগ হলো। কষ্ট দেখে কী হবে? বললাম, ‘পেছনে যান।’ সে পেছাল। আমার উত্তরটি নিয়মের, তার প্রশ্নটি ব্যক্তিগত। ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত উত্তর দিলে লাইন নরম হয়—এই শিক্ষা পেয়েছি। কিন্তু রাতে মোজা খোলার সময় মনে পড়ল কেউ অন্তত জিজ্ঞেস করেছিল। বাড়িতে বাবা জিজ্ঞেস করেন টাকা কবে, মা বলেন খেয়েছিস কি না। কষ্টের প্রশ্ন খুব কম।

পরের ফোনে বাবা বললেন টাকা পেয়েছেন, রুবির ফরম হয়েছে। তাঁর গলায় স্বস্তি ছিল। তারপর আবার শাহবাগের কথা তুললেন না। টাকা পৌঁছালে কিছু প্রশ্ন নিজেরাই বন্ধ হয়। আমি ভেবেছিলাম এবার বলব পায়ের ক্ষত শুকায়নি, ছুটি হয়নি, রাতে ঘুম কম। কিছুই বলিনি। বললাম, ‘ধান কেমন?’ তিনি আবহাওয়ার কথা বলতে শুরু করলেন। আমাদের কথাবার্তার নিরাপদ জায়গা হলো ফসল—যে বিষয়ে দুইজনেই উদ্বিগ্ন, কিন্তু কেউ কারও বিরুদ্ধে না।

ভেতর থেকে জামাল ডাকল, পরদিন রিপোর্ট ছয়টায়। ফোন পকেটে রেখে উঠে পড়লাম।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.