ফরিদা · মার্চ–এপ্রিল ২০১৩
ছবিটি খুঁজে পেতে মায়ের আলমারি খুলতে হয়েছিল। মা চাবি বালিশের নিচে রাখেন, যদিও আমরা দুজন ছাড়া বাসায় কেউ থাকে না। পুরোনো দলিলগুলো একটি নীল প্লাস্টিকের ফাইলে। বাবার চাকরির নিয়োগপত্র, বিয়ের কাবিননামার অনুলিপি, থানায় করা সাধারণ ডায়েরির নম্বর, বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো আবেদন। একটি আবেদনের প্রথম পাতায় ছবি স্ট্যাপল করা। মরিচা কাগজে ছড়িয়ে বাদামি বৃত্ত হয়েছে।
মা বললেন, ‘এইটা নিয়া কী করবি?’
আমি বললাম, ‘বড় করাব।’
তিনি ছবির দিকে না তাকিয়ে ফাইল গুছালেন। ‘মানুষটা ওইরকম ছিল না।’
‘কীরকম?’
‘এত শুকনা না।’
ছবিতে মুখ বোঝা যায় না, তবু মা ওজনের ভুল ধরলেন। আমি আর প্রশ্ন করিনি।
নীলক্ষেতের একটি দোকানে স্ক্যান করালাম। ছেলেটি কাগজটি স্ক্যানারের কাচে রাখার সময় স্ট্যাপল খুলতে চাইল। আমি বললাম, সাবধানে। সে বিরক্ত হলো। কম্পিউটারের পর্দায় ছবি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেঙে গেল—কালো, ধূসর ও সাদা বর্গক্ষেত্র। ছেলেটি বলল, ‘রেজল্যুশন নাই, আপা। এর চেয়ে ভালো হবে না।’
দোকানে যাওয়ার আগে তিন দিন কাগজটি ব্যাগে নিয়ে ঘুরেছি। অফিসে বসে মনে হয়েছে দুপুরে যাব, দুপুর হলে জরুরি কাজ এসেছে। নীলক্ষেতে ছবি বড় করানো কঠিন কাজ নয়। কঠিন ছিল এমন একটি মুখ হাতে নেওয়া, যার সঙ্গে নিজের কোনো স্মৃতি নেই। আমি বাবার ছবি নষ্ট হলে শোক পাব কি না জানতাম না। আবার ছবিটি পরিষ্কার হয়ে গেলে যে মানুষ বের হবেন, তাঁকে চিনতে পারব কি না সেই ভয় ছিল।
মা প্রথম দিন ছবিটি দিতে চাননি। বলেছিলেন, ‘ওই কাগজ হারাইলে আর নাই।’ আমি মোবাইলে ছবি তুলে রাখার কথা বললাম। তিনি বুঝলেন না কপি আর মূলের পার্থক্য কোথায়। তাঁর কাছে যে কাগজে বাবার হাত লেগে থাকতে পারে সেটিই মানুষটির নিকটতম অংশ। আসলে আবেদনটি স্বাধীনতার পরে মামা লিখেছিলেন; বাবার হাত লাগেনি। তবু তথ্য দিয়ে বিশ্বাস সরানো যায় না।
স্ক্যানারের কাচে রাখার সময় আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পর্দায় প্রথমে পুরো আবেদন উঠল। ‘মাননীয় মহোদয়’ দিয়ে শুরু, শেষে মায়ের কাঁপা স্বাক্ষর। ছবির চারপাশে কাটার রেখা বসালে মনে হলো বাবাকে আবার নথি থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে। ছেলেটি কাজের অভ্যাসে দ্রুত করছিল। তাকে ধীর হতে বললে সে বলল, ‘আপা, ফাইল সেভ হইছে।’ মানুষের নিশ্চয়তা এখন সেভ হওয়া দিয়ে মাপা যায়। ১৯৭১-এ কিছুই সেভ হয়নি।
সে একটি সফটওয়্যারে আলোর মাত্রা বাড়াল, দাগ সরাল। প্রতিবার মুখ একটু বদলে গেল। এক সংস্করণে চোখ কালো, আরেকটায় গাল উজ্জ্বল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনটা আসলের কাছাকাছি?’
ছেলেটি কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আপনি চিনবেন।’
আমি বললাম, ‘চিনি না।’
সে প্রথমবার আমার দিকে ভালো করে তাকাল। তারপর আগের সংস্করণে ফিরে গেল। আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
প্রিন্টের অপেক্ষায় পাশে বসা এক যুবক চাকরির আবেদন ছাপাচ্ছিল। তার ছবিও পাসপোর্ট সাইজ। সে টাই ঠিক করে তোলা ছবির চার কপি নিল। জীবনের শুরুতে আর শেষে রাষ্ট্র মুখকে ছোট একটি আয়তনে চায়—চাকরিতে ঢোকার জন্য, নিখোঁজের প্রমাণে। মাঝখানের মানুষটি কোথায় থাকে?
দুইশো টাকা দেওয়ার সময় মনে হয়েছিল দামটি বাবার ছবির, না ছেলেটির দশ মিনিটের কাজের? দরাদরি করলে কাগজটির অসম্মান হবে—এমন অযৌক্তিক ভাবনা এলো। তাই চুপ করে দিলাম। দোকান থেকে বের হয়ে প্লাস্টিক ফোল্ডার কিনলাম, আরও ত্রিশ টাকা। বৃষ্টি না থাকলেও কাগজ বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
ছবি লাগানোর দিন মোড়ে এক নারী আমাকে থামিয়ে জানতে চাইলেন মানুষটি কে। নাম বললাম। তিনি নিজের ভাইয়ের কথা বললেন—যুদ্ধে মারা গেছেন, কবর আছে। তাঁর কথায় ঈর্ষা অনুভব করেছিলাম। কবর থাকা কী বিরাট সম্পদ, তা বলা যায় না। তিনি আমার হাত ধরলেন। আমি হাত সরাইনি, কিন্তু নিজের গল্প পুরো বলিনি। শোকের মধ্যেও মানুষ তুলনা করে; আমি করছিলাম বলে লজ্জা হলো।
বাবার ছবিটি কোণায় লাগানোর পরে একটু দূরে গিয়ে দেখলাম। অন্য মুখের পাশে ধূসর আকৃতিটি আরও অস্পষ্ট। কেউ না জানলে চোখ পড়বে না। আমার ইচ্ছা হলো নিচের নাম বড় করে লিখি। সঙ্গে কলম ছিল। লিখলাম না। দৃশ্যমান হওয়ার জন্য চিৎকার করলে বাবার স্বভাবের বিরুদ্ধে হবে কি না জানি না; তাঁর স্বভাব সম্পর্কে আমি শুধু মায়ের কয়েকটি বাক্য জানি।
বাসায় ফিরে মা জিজ্ঞেস করলেন কাগজ কোথায়। মূল আবেদনটি ফিরিয়ে দিলাম। বড় করা ছবির কথা বলতেই তিনি দেখতে চাইলেন না। বললেন, ‘রাস্তায় লাগাইছিস?’ তাঁর গলায় অভিযোগ। আমি বললাম, ‘অনেকের ছবি আছে।’
মা বললেন, ‘অনেকের লগে তোমার বাবারে রাখার দরকার কী?’
আমি উত্তর দিতে পারিনি। এত দিন বাবার জায়গা না পাওয়ায় কষ্ট, এখন জায়গা দিলে মা প্রশ্ন করেন কেন। হয়তো তিনি অনুপস্থিত মানুষটিকে পরিবারের ভিতরে একা রাখতে চেয়েছেন। জনতার স্মৃতিতে দিলে তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার কমে যায়। আমরা সেই রাতে একই টেবিলে খেয়েছি, কথা হয়নি।
আমি বললাম, ‘যতটা হয়।’
সে কাজ করল। প্রিন্ট, স্ক্যান, ঠিক করা—দুইশো টাকা নিল। দাম বেশি মনে হয়েছিল, তর্ক করিনি। হাতে যে কাগজ পেলাম সেখানে একজন মানুষের বদলে ধোঁয়াটে আকৃতি। চোখ অনুমান করা যায়, ঠোঁট নয়। নিচে আমি পরিষ্কার অক্ষরে নাম লিখলাম: মোহাম্মদ আবদুল কাদের। নিয়ে যাওয়ার তারিখ: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১।
কাঠের কাঠামোয় আগের চেয়ে ছবি কম। কিছু খুলে গেছে, কিছু নতুন। কোণার দিকে জায়গা পেলাম। সঙ্গে আঠা ছিল না। দায়িত্বে থাকা তরুণ টেপ দিল। সে নাম পড়ল, বলল, ‘বুদ্ধিজীবী?’
আমি বললাম, ‘হিসাব সহকারী।’
সে এক মুহূর্ত থেমে টেপ কাটল। ‘কোথা থেকে নিছিল?’
‘নাখালপাড়া।’
সে মাথা নেড়ে ছবি লাগিয়ে দিল। আমি চাইলে বাবার গল্প বলতে পারতাম। সে হয়তো শুনত। বলিনি। ছবির নিচের ডান কোণা একটু উঠে ছিল; আঙুল দিয়ে চেপে দিলাম।
ছবি লাগানোর পরের দিন অফিসে গিয়ে অকারণে হালকা লেগেছিল। কাউকে বলিনি। দুপুরে রুবিনা জানতে চাইল কাজ হয়েছে কি না। মোবাইলে ছবি দেখালাম—কাঠামোর কোণায় ছোট ধূসর মুখ। সে পর্দা বড় করে বলল, ‘বোঝা যায় না।’ আমি বললাম, ‘যতটা ছিল।’ রুবিনা ক্ষমা চাওয়ার মতো আমার হাত ছুঁল। সত্য বলা কখনো অশোভন হয়ে যায়; সে বুঝেছিল।
সেদিন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির তালিকা করতে গিয়ে বাবার নাম মনে হচ্ছিল। উপস্থিত, অনুপস্থিত—দুটি ঘর। নিখোঁজের জন্য কোনো ঘর নেই। একজন ছাত্র টানা তিন দিন আসেনি; নিয়ম অনুযায়ী ফোন করলাম। তার মা বললেন জ্বর। কথাটি লিখে রাখলাম। বাবার অনুপস্থিতির পাশে কেউ কারণ লিখে রাখেনি। উনিশশো একাত্তরের একটি তারিখ, তারপর ফাঁকা। সেই ফাঁকা জায়গা বিয়াল্লিশ বছর ধরে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে দীর্ঘ নথি।
বিকেলে মা ফোন করে বাজার থেকে হলুদ আনতে বলেছিলেন। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরে তাঁর বিরক্ত মুখ দেখে আবার বের হলাম। দোকানের পথে ভাবছিলাম শোক মানুষকে সাধারণ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় না। মা বাবাকে হারিয়েও বাজার করেছেন, ভাত রেঁধেছেন, আমার চুল বেঁধেছেন। আমি তাঁর সেই ধারাবাহিকতাকে আগে কঠোরতা ভেবেছি। এখন বুঝি, কাজ বন্ধ করলে অপেক্ষা আরও বড় হয়ে ওঠে। তিনি হয়তো রান্নার হাঁড়ি দিয়ে অপেক্ষার মাপ ছোট রেখেছিলেন।
হলুদ কিনে ফেরার সময় এক প্রতিবেশী খালা বললেন টেলিভিশনে আমাকে দেখেছেন কি না। আমি তো ক্যামেরার সামনে যাইনি। তিনি বললেন সব মেয়েকেই একই রকম লাগছিল। কথাটি শুনে আপত্তি হলো, কিন্তু বললাম না। ভিড় ব্যক্তিকে শক্তি দেয়, আবার মুখ মুছেও দেয়। বাবার ছবিটি সেখানে নিয়ে যাওয়ার কারণ ছিল মুখ ফিরিয়ে দেওয়া। অথচ দূর থেকে সব মুখ আবার এক হয়ে যায়।
রাতে নীল ফাইল খুলে মূল ছবির পেছনের দাগ দেখলাম। আর্দ্রতায় কাগজ বাঁকা। সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের খাম কিনতে হবে ঠিক করলাম। এত বছর পরে হঠাৎ যত্ন বেড়েছে দেখে নিজের উপর সন্দেহ হলো—আমি কি বাবাকে ভালোবাসছি, না নিজের অংশগ্রহণকে? উত্তর পাইনি। ছবিটি নতুন খামে রাখলাম। মানুষকে বাঁচাতে না পারলে কাগজ বাঁচানো সান্ত্বনা মনে হতে পারে—কিন্তু তা নয়; ছোট একটি কাজ, যার ফল চোখে দেখা যায়।
অফিসের কাজ করতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল বাবার ছবি এখন বাইরে। রোদ লাগছে, ধুলো পড়ছে, মানুষ দেখছে। এত বছর নীল ফাইলের মধ্যে নিরাপদ ছিল। আমি কি তাকে অযথা প্রকাশ্যে এনে দিয়েছি? কাজ শেষে সরাসরি গিয়ে দেখলাম কাগজ ঠিক আছে। নিচের কোণ একটু উঠেছিল। টেপ চেপে দিলাম। পাশের একটি ছবি আংশিক তার উপর চলে এসেছে; সেটিও সরালাম। মৃত ও নিখোঁজদের মাঝেও জায়গার দ্বন্দ্ব আছে। কাঠ ছোট, মুখ অনেক।
সেদিন এক তরুণ ছবি তুলে অনলাইনে দেওয়ার অনুমতি চাইল। আমি বললাম, ‘আমার অনুমতি কেন?’ সে বলল আপনি লাগিয়েছেন। বাবার ছবির অধিকার কার—মা, আমি, রাষ্ট্র, না যে কাঠামো বানিয়েছে? উত্তর না পেয়ে বললাম দিতে পারেন। পরে লিংক পাঠাতে বলেছিলাম। সে কাগজে ঠিকানা লিখে নিল, কোনো লিংক আসেনি। হয়তো ছবি ওঠেনি, হয়তো হাজার ছবির মধ্যে হারিয়েছে।
দ্বিতীয় দিন বিকেলে মেঘ দেখে প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকার কথা ভাবলাম। অন্য ছবিগুলোও তো ভিজবে। কেবল বাবারটা ঢাকলে কেমন দেখায়? সবার জন্য বড় প্লাস্টিক কোথায় পাব জানতাম না। দায়িত্বে থাকা কাউকে খুঁজে পাইনি। ‘কাল দেখি’ বলে চলে গেলাম। জীবনের অনেক ক্ষতি এই দুই শব্দের মধ্যে হয়।
তিন দিন পরে বৃষ্টি হলো। অফিস থেকে বের হওয়ার সময়ও পড়ছিল। বাস থেকে নেমে ছাতা খুললাম। মোড়ে লোক কম। কাঠামোর সামনে পানি জমেছে। বাবার কাগজ ভিজে নরম, কালির রেখা ছড়িয়ে গেছে। নামের ‘কাদের’ এখনও পড়া যায়, মুখ আর নেই। ধূসর কালি নিচে নেমে এসেছে, যেন ছবিটি নিজেই কাঁদার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে—এই তুলনাটি মাথায় এসেই আমার বিরক্তি লাগল। কাগজ কাঁদে না। পানি পড়লে কালি ছড়ায়।
আমার ছাতা থেকে পানি গড়িয়ে ছবির উপর পড়ছিল। এক ধাপ পেছালাম। আঙুল দিয়ে কাগজ ছোঁয়া যায়, কিন্তু ভিজে গেলে ছিঁড়ে যাবে। পাশে আরেকটি ছবির রং গলে বাবার কাগজে এসেছে। মুখগুলো বৃষ্টিতে পরস্পরের মধ্যে মিশছে। ইতিহাস আলাদা আলাদা নাম চায়; পানি তা মানে না। এই ভাবনাও সাহিত্যিক মনে হলো, তবু সরাতে পারলাম না।
বাসায় ফিরে মা আমার ভেজা শাড়ি দেখে বললেন কোথায় গিয়েছিলাম। বললাম ছবিটি নষ্ট হয়েছে। তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মূল কাগজ আছে তো?’ বললাম আছে। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তাঁর কাছে প্রতিলিপির মৃত্যু মৃত্যু নয়। আমার কাছে কেন ছিল, বোঝাতে পারিনি।
আমি হাত বাড়িয়ে খুলতে পারতাম। টেপ ভিজে আলগা। মা বলেছিলেন মানুষটা ওইরকম ছিল না। এখন কোনো রকমই নেই। তবু খুলে নিলাম না। ভেজা কাগজটি কাঠের সঙ্গে লেগে থাকল।