অনন্যা · মার্চ ২০১৩
বাবা বললেন, ‘আর যাওয়া হবে না।’
তিনি খবর দেখছিলেন না। ডাইনিং টেবিলে বিলের কাগজ সাজাচ্ছিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি রাজনীতি নিয়ে কথা বলবেন—নাস্তিক, ধর্ম, নিরাপত্তা, এসব। বাবা বললেন, ‘পাড়ায় কথা হচ্ছে। তোমার চাচাকে কে যেন বলেছে তুমি রোজ ওইখানে থাকো।’
আমি প্রথমে হেসে ফেলেছিলাম। ‘পাড়ার মানুষ আমার অ্যাটেনডেন্স নেয়?’
মা রান্নাঘর থেকে বললেন, ‘বাবার সঙ্গে এভাবে কথা বলো না।’
বাবা বললেন, ‘তুমি বুঝছ না।’
এই বাক্যটা বড়রা ব্যবহার করলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়। আমি বললাম, ‘কী বুঝছি না বলেন। আমি পানি দিই। কারও সঙ্গে মারামারি করছি না।’
তিনি বিলের কাগজগুলো একসঙ্গে করলেন। ‘কে কী বলবে সেটা তুমি ঠিক করতে পারবা না।’
আমি বললাম, ‘তাহলে কে কী বলবে সেই অনুযায়ী আমি কোথায় যাব ঠিক হবে?’
মা এসে মাঝখানে দাঁড়ালেন না, কিন্তু তার কথা দুই দিকে গেল। আমাকে বললেন পরীক্ষার কথা ভাবতে, বাবাকে বললেন মেয়েকে আটকে রাখা যায় না। আমরা তিনজন একই ঘরে থেকেও আলাদা আলাদা কথোপকথনে ছিলাম। শেষে বাবা বললেন, ‘আমি নিষেধ করেছি।’
পরদিন আমি গেলাম। লুকিয়ে না। বিকেলে জামা বদলে ব্যাগ নিয়ে দরজা দিয়ে বের হলাম। মা দেখলেন। বাবা অফিস থেকে ফেরেননি। আমি চাইলে মিথিলার বাসার কথা বলতে পারতাম। বলিনি। আমার রাগে সততা এসেছিল।
কিন্তু ফেরার সময় গলির মুখে এসে ওড়না মাথায় তুললাম। আগে কখনো করিনি। কেউ দেখছে কি না চারপাশে তাকালাম। বাসায় ঢুকে মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম; এখন হাত-মুখ ধুয়ে সোজা ঘরে ঢুকি। ফোনের ছবিগুলো লুকানোর প্রয়োজন নেই, তবু আলাদা ফোল্ডারে রাখি। বাবা কী বলেছিলেন তার চেয়ে আমার এইসব কাজ আমাকে বেশি রাগাত।
মিথিলা একদিন বলল, ‘তুই এত ডিফেন্সিভ কেন?’
আমি বললাম, ‘আমি ডিফেন্সিভ না।’ বলার ভঙ্গিতেই প্রমাণ হয়ে গেল আমি ছিলাম।
শাহবাগেও বদল আসছিল। আগে সবাই সবাইকে চিনত মনে হতো; এখন গ্রুপ, পরিচয়, দায়িত্ব। মঞ্চের কাছে যেতে কার্ড লাগে। পানির কার্টন কোথায় যাবে তা নিয়ে দুইজন তর্ক করল। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে বোতল হাতে অপেক্ষা করছিলাম। তারপর যা হয়, কাজ করতে এসে দেখেন কাজটারও মালিক তৈরি হয়েছে। তবু আমি যেতাম। কারণ না গেলে মনে হতো বাবা জিতে গেলেন। গেলে মনে হতো পাড়ার লোককে প্রমাণ করছি। নিজের জন্য যাচ্ছি কি না বুঝতে পারতাম না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সময়সূচি বের হয়েছিল। গ্রুপে সবাই নোট চাইছিল। আমার নোট অসম্পূর্ণ। ক্লাসে বসে শিক্ষক যা বলছেন শুনি, কিন্তু খাতায় স্লোগানের টুকরা লিখে ফেলি। একদিন উত্তরপত্রের মার্জিনে অন্যমনস্ক হয়ে তারিখ লিখেছিলাম—১২ ফেব্রুয়ারি। পরে কেটে দিয়েছি। মিথিলা বলল, ‘আমরা ফেল করলে আন্দোলন আমাদের পরীক্ষা দেবে না।’ আমি হাসলাম। কথাটা কৌতুক হলেও ভেতরে বিঁধেছিল।
লাইব্রেরিতে বসে পড়তে চেষ্টা করতাম। বাইরে থেকে মাইকের শব্দ এলে মনে হতো আমাকে ডাকছে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই, আবার ফিরে আসি। বইয়ের পাতায় যে তত্ত্বগুলো পড়ি—পরিচয়, রাষ্ট্র, জনপরিসর—সেগুলো মোড়ের মানুষের সঙ্গে জোড়া দিতে চাই। পরীক্ষার উত্তরে পরিষ্কার সংজ্ঞা লাগে; রাস্তায় কোনো সংজ্ঞা পরিষ্কার থাকে না। আমি নোটে লিখেছিলাম, ‘বাস্তবতা সিলেবাস মানে না।’ পরে লাইনটি খুব নাটকীয় মনে হওয়ায় কেটে দিয়েছি।
এক শিক্ষক ক্লাসে উপস্থিতি কম দেখে রাগলেন। বললেন, ‘দেশ বাঁচাতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ শেষ কোরো না।’ পেছন থেকে কেউ হাসল। আমি হাত তুলতে চেয়েও তুলিনি। তিনি কি ভুল বলেছেন? আমাদের ভবিষ্যৎ আর দেশের ভবিষ্যৎ আলাদা খাতায় লেখা হয় কেন—প্রশ্ন ছিল, কিন্তু ক্লাসে করলে সবাই আমার দিকে তাকাত। সাহস সব জায়গায় সমান কাজ করে না।
পরীক্ষার আগের রাতে মিথিলা নোট দিতে বাসায় এলো। বাবা তাকে ভালোভাবে বসালেন, চা দিলেন। শাহবাগের কথা তুললেন না। মিথিলা চলে গেলে বললেন, ‘মেয়েটা বুঝদার।’ আমি বুঝলাম তুলনাটি আমার সঙ্গে। রাগ না করে নোট খুললাম। কখনো বিরোধিতা ক্লান্ত হয়ে পড়াশোনায় বসে। বাবা হয়তো সেটাই চেয়েছিলেন।
পরদিন প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে প্রথম পাঁচ মিনিট কিছু মনে পড়েনি। তারপর লিখেছি। হল থেকে বের হয়ে অন্যরা উত্তর মিলাচ্ছিল; আমি ফোন চালু করে মোড়ের খবর দেখলাম। একটি কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে, আমি জানতাম না। নিজের জায়গা থেকে দূরে থাকলে খবরও অন্যদের সঙ্গে একই সময়ে আসে। বিশেষ হওয়ার অনুভূতি চলে যায়। এতে কষ্ট হয়েছিল, স্বীকার করিনি।
মা রাতের খাবারের পর আমার পাশে বসে চুলে তেল দিচ্ছিলেন। ছোটবেলার পর এমন করেন না। বললেন, ‘তোমার বাবা ভয় পায়।’
আমি বললাম, ‘আমি কি পাই না?’
‘তুমি দেখাও না।’
‘উনি রাগ দেখান।’
মা আঙুল দিয়ে চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন, ‘সবাই ভয় একইভাবে দেখায় না।’ এই কথার উত্তর ছিল না। বাবার নিষেধকে প্রথমবার ভয় হিসেবে ভাবলাম। তাঁর রাগ তখনও অন্যায় মনে হলো, কিন্তু তার ভেতরে দুর্বল একজন মানুষ দেখা গেল। তাকে দেখা আমার জন্য সুবিধার ছিল না; শত্রু দুর্বল হলে লড়াই পরিষ্কার থাকে না।
পরদিন বাবা অফিসে যাওয়ার আগে আমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কখন ফিরবা?’
আমি বললাম, ‘জানি না।’
তিনি বললেন, ‘নয়টার মধ্যে চেষ্টা করো।’
এটি নিষেধ নয়, সমঝোতা। আমি চাইলে ধন্যবাদ বলতে পারতাম। বলিনি। সন্ধ্যায় আটটা পঞ্চাশে গলির মুখে পৌঁছে গিয়েছিলাম, তবু দশ মিনিট বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম—যেন ঠিক নয়টায় ঢুকলে তাঁর কথা মেনেছি প্রমাণ না হয়। নিজের স্বাধীনতা দেখাতে মানুষ কত হাস্যকর কাজ করে।
পাড়ার মুদি দোকানে দুইজন আমাকে দেখে কথা থামিয়েছিল। আমি তাদের সামনে দিয়ে মাথা উঁচু করে গেছি। সিঁড়ি উঠতে উঠতে কান গরম। বাসায় ঢুকে মা বললেন, ‘ওড়নাটা ঠিক করো।’ আমি তাঁর উপর চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘সবাই শুধু আমার কাপড় দেখে কেন?’ মা অবাক। তিনি হয়তো শুধু কাঁধ থেকে ঝুলে থাকা ওড়না বোঝাতে চেয়েছিলেন। পরে ক্ষমা চাইতে যাইনি। রান্নাঘরে গিয়ে পানি নিতে গিয়ে দেখি তিনি আমার জন্য ভাত ঢেকে রেখেছেন।
শাহবাগে একটি সন্ধ্যায় একটি পরিচিত আপু বললেন, মেয়েদের রাতে কম থাকতে বলা হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম কে বলেছে। তিনি নাম বলতে পারলেন না। ‘সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ এই শব্দ শুনে বাবার নিষেধের সঙ্গে পার্থক্য খুঁজলাম। ঘরে পুরুষ বলে দেয় নিরাপত্তা; বাইরে সংগঠন। দুই জায়গাতেই আমার ভালোর কথা। কোথাও সিদ্ধান্তে আমি নেই।
আমি সেদিন দশটা পর্যন্ত থাকলাম। প্রতিবাদ হিসেবে না, কোথায় আমার সীমা তা দেখার জন্য। কিন্তু রাত বাড়লে সত্যিই ভয় লাগল। বাস কম, রাস্তার কয়েকটা জায়গা অন্ধকার। একা রিকশায় বসে ফোন শক্ত করে ধরে ছিলাম। বাসায় পৌঁছে বাবাকে কিছু বলিনি। স্বাধীনতার ভয় নিজের কাছে রাখলাম।
দরজায় তাঁকে নীরব দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হলো তিনি কি আমার মুখে সেই ভয় দেখছেন? আমি চাইনি তিনি দেখুন। তাই ‘কিছু বলবেন?’ প্রশ্নটা চ্যালেঞ্জের মতো বের হয়েছিল। তিনি চলে গেলে একবার ডাকতে চেয়েছিলাম। ডাকিনি। বই খুলে বসে রইলাম। একই অনুচ্ছেদ তিনবার পড়েও বুঝিনি।
একদিন চাচা বাসায় এসেছিলেন। আমি ঘরে ছিলাম, বাইরে বাবা ও তাঁর কথা শুনেছি। চাচা বললেন আমাকে সামলাতে। বাবা নিচু গলায় বললেন, ‘ওর বয়স হইছে।’ এই একটি বাক্যে আমি থেমে গেলাম। আমার সামনে তিনি এখনও নিষেধ করেন; ভাইয়ের সামনে স্বীকার করেন আমি বড়। বড় হওয়া হয়তো প্রকাশ্যে দেওয়া যায় না, গোপনে মানতে হয়।
চাচা চলে গেলে আমি বের হয়ে চা নিলাম। বাবা সংবাদপত্র পড়ছিলেন। আমরা কেউ আলোচনা তুলিনি। তাঁর পাশে বসে প্রথমবার ভাবলাম, পাড়ার কথায় তাঁর নিজেরও অপমান হয়। মানুষ বলে তিনি মেয়েকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। আমার স্বাধীনতা তাঁর সামাজিক ব্যর্থতা হিসেবে লেখা হয়। এই ব্যবস্থা অন্যায়, কিন্তু সেই অন্যায়ের আঘাত তাঁর গায়েও লাগে। তাঁকে শত্রু বানালে হিসাব অসম্পূর্ণ।
শাহবাগ থেকে ফেরার পথে আমি মাঝে মাঝে বাবার জন্য চা নিয়ে আসতাম। তিনি ঠান্ডা চা পছন্দ করেন না, তবু খেতেন। এক রাতে কাপ নিয়ে বললেন, ‘ওখানের দোকান?’ আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি দাম জিজ্ঞেস করলেন। ছয় টাকা শুনে বললেন, ‘কম।’ এটাই আমাদের প্রথম শাহবাগ-সংলাপ যেখানে ঝগড়া হয়নি। একটি চায়ের দাম রাজনৈতিক দূরত্বের মাঝখানে ছোট সেতু হলো।
সেদিন রাত দশটায় ঢোকার সময় হাতে চা ছিল না। দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাবা বসার ঘরে ছিলেন। আমি সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা ভেজালাম। পোশাক বদলে পড়ার টেবিলে বসেছি, বই খোলা কিন্তু পড়ছি না। কয়েক মিনিট পরে দরজায় ছায়া পড়ল। বাবা দাঁড়িয়ে।
তিনি ঘরে ঢুকে আমার টেবিলের সামনে চেয়ার টানলেন না। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে বললেন, তাঁর অফিসে আমার ছবি নিয়ে কথা হয়েছে। কে দেখেছে বলেননি। আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি লজ্জা পেয়েছেন কি না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে না বললেন, তারপর যোগ করলেন ভয় পেয়েছেন। তাঁর মুখে ‘ভয়’ শব্দটি আগে শুনিনি। বাবা সাধারণত বলেন পরিস্থিতি ভালো না, মানুষ কী বলবে, পড়াশোনা নষ্ট হবে। ভয়কে তিনি যুক্তির জামা পরান। সেদিন জামাটি খুলে গেল।
আমি বলতে চেয়েছিলাম আমিও ভয় পাই। মিছিলের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার, পুলিশ এগিয়ে এলে, বাস না পেলে, ফোন বন্ধ হলে। কিন্তু বললে মনে হবে তাঁর নিষেধ ঠিক। তাই বললাম, ‘সবাই যায়।’ তিনি বললেন, সবাই আমার মেয়ে না। বাক্যটি মালিকানার মতো শোনাল, আবার অসহায়ও। আমি কোন অর্থে রাগ করব ঠিক করতে পারলাম না।
টেবিলে মিথিলার নোট ছিল। বাবা একটি পাতা তুলে আবার রাখলেন। বললেন পরীক্ষাটা অন্তত দিই। আমি বললাম দেব। তিনি জানতে চাইলেন তার পরে যাব কি না। এই প্রথম তিনি যাওয়ার সম্ভাবনা ধরে প্রশ্ন করলেন। আমি উত্তর দিলাম, ‘দেখব।’ তাঁর ভাষা আমার মুখে ফিরিয়ে দিয়ে ছোট প্রতিশোধ নিলাম। তিনি বুঝেছিলেন; ঠোঁট শক্ত হলো। তবু আর নিষেধ করলেন না।
চলে যাওয়ার আগে বললেন ফোনে চার্জ রাখতে। তাঁর পকেট থেকে ছোট একটি পাওয়ার ব্যাংক বের করে টেবিলে রাখলেন। অফিসের উপহার পেয়েছিলেন। আমি ধন্যবাদ বলিনি। পরদিন ব্যাগে নিয়েছিলাম। যন্ত্রটি ভারী, তবু সারাদিন সঙ্গে রাখলে মনে হতো বাবার উদ্বেগকে বহন করছি—অনুমতি নয়, সংযোগের একটি তার।
আমি ঘুরে বললাম, ‘কিছু বলবেন?’
তিনি বললেন না। আমার ঘর দেখলেন—বিছানার পাশে খালি পানির কার্টন, টেবিলে পরীক্ষার নোট, পতাকার ছোট স্টিকার। মুখে রাগ ছিল না। ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম তিনি আবার নিষেধ করবেন, অথবা বলবেন খেয়ে নাও। কিছুই বললেন না। ঘুরে চলে গেলেন।
আমি খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।