FF.
অধ্যায় ৩ · বারো ঘণ্টা Book page

Chapter 3

অধ্যায় ৩ · বারো ঘণ্টা

Oct 18, 2026 7 min read

হাশেম · ৮–১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ডিউটি দেওয়া হয়েছিল সকাল আটটা থেকে রাত আটটা। রিপোর্ট করতে বলা হয়েছিল সাতটায়। ব্যারাক থেকে বের করা হয়েছিল সাড়ে ছয়টায়। ওই হিসাবে বারো ঘণ্টার ডিউটি চৌদ্দ ঘণ্টা হয়, কিন্তু হিসাব করা হয় বারো। এইটা চাকরির নিয়ম।

প্রথম দিন শাহবাগে নামিয়ে দেওয়া হলে মনে হয়েছিল মেলা বসেছে। ফোর্সের লাইন করা হলো রাস্তার এক পাশে। স্যার বললেন, উসকানি না থাকলে কিছু করা হবে না। ব্যারিকেড ধরতে হবে, রাস্তা ফাঁকা রাখতে হবে, উপরের নির্দেশ শুনতে হবে। নির্দেশ তিনটা একসঙ্গে মানা সম্ভব ছিল না, কারণ রাস্তা ফাঁকা ছিল না। তবু দাঁড়ানো হলো।

সকাল আটটায় বুটের ভিতর পা ঠান্ডা ছিল। দশটায় গরম। দুপুরে মোজা ভিজে গেল। পানি কম খেয়েছিলাম। পানি খেলে প্রস্রাব লাগে, প্রস্রাবের জায়গা ছিল দূরে, লাইন ছাড়ার অনুমতি পাওয়া যেত না। দুপুরের খাবারের প্যাকেট এলো দুইটার পরে—ভাত ঠান্ডা, ডাল পলিথিনে, একটা ডিম। ব্যারিকেডের পেছনে দাঁড়িয়ে খাওয়া হলো। ডিমটা পাশের কনস্টেবল জামালকে দিয়েছিলাম। তার ক্ষুধা বেশি না; সে আমার কাছে একশো টাকা পেত। ডিম দিলে টাকা কমে না, কিন্তু মনে থাকে।

মানুষ আমাদের দিকে তাকাত না। প্রথম দিন এইটা ভালো লেগেছিল। সাধারণ ডিউটিতে লোকজন পুলিশের দিকে দেখে—ভয়ে, রাগে, দরকারে। এখানে তারা আমাদের শরীরের ফাঁক দিয়ে মঞ্চ দেখে। কেউ ধাক্কা খেয়ে গায়ে পড়লে বলে, ভাই সরেন। ইউনিফর্ম দেখে ‘স্যার’ও বলে না। আমি ভাবলাম, ভালো। কথা বলতে হবে না।

রাত আটটায় রিলিভ আসার কথা। এলো সাড়ে নয়টায়। ব্যারাকে ফিরতে এগারোটা। বুট না খুলেই ভাত খেয়েছিলাম, কারণ খুললে আবার পরতে ইচ্ছা করত না। পরদিন রিপোর্ট সাতটা। ঘুম কত ঘণ্টা হয়েছিল জানি না।

দ্বিতীয় দিনে বুঝলাম মানুষ তাকায় না বলে মানুষ আমাকে দেখে না। আমি পা বদলে দাঁড়াই, হাঁটু বাঁকাই, ঠোঁট শুকায়—কারও চোখে পড়ে না। একটা ছেলে ব্যারিকেডে পতাকা বাঁধতে এলো। নিষেধ করা হলে শুনল না। আমি হাত ধরে নামিয়ে দিয়েছিলাম। সে বলল, ‘হাত ছাড়েন।’ আমি আরেকটু জোরে ধরলাম। পরে সে চলে গেল। কাজটা দরকারের চেয়ে বেশি জোরে হয়েছিল। তখন বিরক্ত ছিলাম। বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে হাত কত জোরে ধরতে হয়, সেই হিসাব থাকে না।

বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল দুপুরে। ধরা যায়নি। বাবা সাধারণত দিনের বেলা ফোন করেন না; টাকা পৌঁছেছে কি না হয়তো জানতে চেয়েছিলেন। মাসের শেষ সপ্তাহে পাঁচ হাজার পাঠাই। বিকাশ তখন গ্রামে সবাই ব্যবহার করত না; বাজারের দোকানে যার নম্বর ছিল তার কাছে পাঠিয়ে বাবা নিতেন। দোকানদার বিশ টাকা কাটত। বাবা এই বিশ টাকা নিয়েও কথা বলতেন।

দুপুরের প্যাকেট খাবার খাওয়ার সময় জামাল বলছিল তার স্ত্রী অসুস্থ। তিন দিন ছুটি চেয়েছে, এখনও সই হয়নি। আমি বললাম অসুস্থ হইলে হাসপাতালে নিক, তার যাওয়া লাগবে কেন। কথাটা বলেই বুঝেছিলাম শক্ত শোনাল। জামাল আর কথা বলেনি। তার বাড়ি নরসিংদী; বাসে দুই ঘণ্টা। আমার বাড়ি কুড়িগ্রাম, ছুটি এক দিনের হলে যাওয়া যায় না। অন্যের বাড়ি কাছে বলে তার দরকার কম—এমন কোনো নিয়ম নেই। তবু বলেছিলাম। ক্লান্ত থাকলে অন্যের সুবিধা চোখে লাগে।

আমার নিজের ছুটির আবেদন পকেটে ছিল। ধান কাটার সময় বাড়িতে যেতে বাবা আগেই বলেছেন। আবেদন জমা দিলে স্যার জিজ্ঞেস করবেন এই পরিস্থিতিতে কেন। উত্তর দিতে হবে ধান। ঢাকার এত লোক রাস্তায়, আমার বাড়ির জমিতে পাকা ধান—দুইটার মধ্যে কোনটা জরুরি, স্যার ঠিক করবেন। তাই কাগজ জমা দিইনি। পকেটে ভাঁজ হয়ে নরম হচ্ছিল।

ভিড়ের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে মনে হতো তারা ইচ্ছা করে এসেছে। কেউ বাধ্য করেনি। গান করছে, বসে আছে, রাতেও থাকবে। তাদের পা ব্যথা করলে চলে যেতে পারবে। এই স্বাধীনতার উপর রাগ হতো। পরে দেখি এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়াতে পারছেন না; দুইজন ধরে তুলল। একটি মেয়ের চোখে পানি, তবু যাচ্ছে না। তখন মনে হলো সবাই পারলেও যায় না। কোন নির্দেশ তাদের আটকে রাখে জানি না। আমাদের নির্দেশ কাগজে বা ওয়্যারলেসে আসে। তাদেরটা কোথা থেকে আসে?

দ্বিতীয় দিনের শেষে ব্যারাকে ফেরার আগে আমাদের গাড়ি চলছিল না। সামনে জনতা। জানালার বাইরে একজন ছোট পতাকা বিক্রি করছিল। সে পুলিশের গাড়ির কাছে এসে বলল, ‘স্যার, একটা নেন।’ ভেতর থেকে কেউ হাসল। পতাকা কিনলে কোথায় রাখব ভেবে দেখলাম—ব্যারাকের খাটে? বাড়ি পাঠাব? শেষ পর্যন্ত নিলাম না। ছেলেটা পরের গাড়ির কাছে গেল।

গাড়ির ভিতর ঘাম আর ভেজা মোজার গন্ধ। জানালা খোলা যায় না পুরো; বাইরে মানুষের হাত। একজন গাড়ির গায়ে তাল দিয়ে স্লোগান ধরেছিল। ভেতরের কয়েকজন একই তালে আঙুল নেড়েছিল, কেউ গলা মেলায়নি। আমি হাত স্থির রেখেছি। ডিউটির পরে ইউনিফর্মে থাকা সময়টাও ডিউটি—এই শিক্ষা প্রশিক্ষণে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শরীর তখন ঘুম চায়, পেট খাবার চায়; রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হওয়ার শক্তি থাকে না।

ব্যারাকে ফিরে খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল। রান্নাঘরের লোক ঠান্ডা ভাত আর আলুভর্তা দিল। জামাল বলল ডিমটা ফেরত দেবে। আমি বললাম লাগবে না। সে নিজের প্লেটের অর্ধেক ভর্তা আমার দিকে ঠেলে দিল। দুপুরে তার সঙ্গে শক্ত কথা বলেছি, রাতে আমরা একই প্লেট থেকে মরিচ নিলাম। ক্লান্তির পরে ঝগড়া রাখার জায়গা থাকে না।

ঘুমাতে গিয়ে নিচের খাটের স্প্রিং পিঠে লাগছিল। পাশের লোক ফোনে সন্তানের সঙ্গে কথা বলছে। আমি বাবার মিসকল দেখলাম, ফেরত দিইনি। এখন করলে তিনি জিজ্ঞেস করবেন খেয়েছি কি না, তারপর টাকা। মিথ্যা বলতে হবে ভালো আছি। সকাল হলে বলা সহজ। রাত মানুষকে সত্যের দিকে ঠেলে, তাই রাতে বাড়ি ফোন করা ভালো না।

তৃতীয় দিনের সকালেই পায়ের চামড়া জ্বালাচ্ছিল। মোজার ভেতর তুলা গুঁজেছিলাম। মেডিকেলের এক সহকারী বলেছিল শুকনো রাখতে। বারো ঘণ্টার বুটে কীভাবে শুকনো রাখব বলেনি। রোলকলে খুঁড়িয়ে দাঁড়ালে স্যার দেখবেন বলে দুই পায়ে সমান ভর দিয়েছি। শৃঙ্খলা কখনো সোজা সারি, কখনো ব্যথা লুকানো।

মেয়েটি পানি দিতে আসার আগে এক লোক আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছিল। বলল পুলিশ আর জনতা একসঙ্গে। আমি না বললাম। সে দূর থেকে তবু ছবি তুলল। সেই ছবি কোথাও গেছে কি না জানি না। ছবিতে আমার পায়ের ব্যথা থাকবে না, শুধু ইউনিফর্ম। মানুষ প্রমাণ বানাতে পুরো শরীর নেয়, ভেতরের খবর নয়।

রাতে মোজা খুলে পা টিপছিলাম। জামাল তার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল নিচু গলায়। সে বলল, ছুটি না হলে শুক্রবার যাবে, যা হয় হবে। আমি তাকে বললাম, ‘চাকরি রাখতে চাইলে মাথা গরম করিস না।’ সে উত্তর দিল, ‘চাকরি রাখলেই সব রাখা যায়?’

আমি কোনো কথা পাইনি। চাকরি ছাড়া আর কী রাখা যায়, সেই হিসাব আমাদের শেখানো হয়নি।

তৃতীয় দিনে ভিড়ের শব্দ আর আলাদা লাগছিল না। স্লোগান উঠলে কানের ভিতর চাপ পড়ে, থামলে হঠাৎ ফাঁকা। দুপুরের পর একটা মেয়ে পানির বোতল নিয়ে এলো। বয়স কম, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। সে প্রথমে আমার পাশের লোককে দিল। সে নিল। আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘আপনি নেবেন?’

আমি বললাম, ‘লাগবে না।’

লাগত। সকাল থেকে অর্ধেক বোতল পানি খেয়েছিলাম। কিন্তু নিলে প্রস্রাব লাগবে। আর সে যেভাবে দিল, মনে হলো দয়া করছে। দয়া নেওয়ার ডিউটি দেওয়া হয়নি।

মেয়েটা বলল, ‘রাখেন, পরে খাবেন।’

আমি আবার বললাম, ‘কইছি তো লাগবে না।’ গলা বেশি শক্ত হয়েছিল। সে এক সেকেন্ড তাকিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। আমি পরে ভাবলাম বোতলটা নিলে হতো। তারপর ভাবলাম, না নিলেই ভালো।

সন্ধ্যার পরে পায়ের ব্যথা এমন হয়েছিল যে ব্যারিকেডে ভর দিয়ে দাঁড়াচ্ছিলাম। স্যার একবার তাকালে সোজা হয়ে যাই। পাশে জামাল বলল, ‘বসবি?’ আমি বললাম, ‘তুই বস।’ দুজনের কেউ বসার অনুমতি পাবে না জেনেও এই কথায় বন্ধুত্ব দেখানো হয়। সে পকেট থেকে ব্যথার ওষুধ দিল। পানি কম বলে খাইনি। ট্যাবলেটটি পকেটে রইল, পরে গুঁড়া হয়ে গেছে।

একজন মাঝবয়সী লোক আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিলেন। তাঁর গলার শিরা ফুলে উঠেছিল। হঠাৎ মাথা ঘুরে বসে পড়লে ভিড়ের লোক পানি দিল। আমি ব্যারিকেডের ওপাশ থেকে দেখেছি। তাকে সাহায্য করতে এগোতে হয়নি; মানুষ ছিল। আমার পা যদি তখন ভেঙেও যেত, ফোর্সের কেউ ধরত—এই নিশ্চয়তা ছিল। দুই পক্ষের যত্ন আলাদা বৃত্তে। বৃত্তের মাঝখানে ব্যারিকেড।

রাত নয়টার দিকে খাবারের খালি প্যাকেট তুলতে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক এল। একজন আমার পায়ের কাছে ঝুঁকে প্যাকেট নিতে গিয়ে বলল, ‘ভাই, আপনার বুটে রক্ত?’ আমি দ্রুত পা সরিয়ে বললাম কাদা। আলো কম ছিল। সে বিশ্বাস করেছে কি না জানি না। অচেনা মানুষ প্রথম দেখে ফেলেছিল যা সহকর্মীদের থেকে লুকিয়েছি। লজ্জা না স্বস্তি, বোঝা যায়নি।

সেদিন রিলিভ এলো দশটার পরে। ব্যারাকে ফিরে পা আর নিজের মনে হচ্ছিল না। করিডরে বসে ফিতা খুলতে সময় লাগল। ডান বুট টান দিয়ে খুলে দেখি মোজা গোড়ালির কাছে কালচে। আঙুল দিয়ে ছুঁতেই ভেজা। মোজা নামালে চামড়া উঠে গেছে, রক্ত জমে আছে।

জামাল বলল, ‘কী হইছে?’

আমি পা সরিয়ে বললাম, ‘কিছু না।’

দেখালে মেডিকেলে পাঠাতে পারত। মেডিকেলে গেলে ছুটি চাইতে হতো। ছুটি চাইলে কেন, কত দিন, বাড়ি যাব কি না—কথা হতো। ছুটি জমা ছিল এগারো দিন। ঈদের আগে নিতে চেয়েছিলাম। একটা মোজার রক্তের জন্য ওই হিসাব নষ্ট করার দরকার ছিল না। মোজাটা বালতির তলায় রেখে দিলাম। কাউকে দেখানো হলো না।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.