মজনু · ১৫–১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
পনেরো তারিখ শুক্রবার আছিল। দোকান খুলছি সকাল আটটায়। দুপুরের আগেই বুঝলাম দিনটা আলাদা যাবে। বইয়ের দোকান বন্ধ, কিন্তু মানুষ বন্ধ না। চা, পানি, সিগারেট—যা আছে যায়। বাচ্চুর লগে আরেকটা ছেলে রাখলাম, নাম রুবেল। দিনমজুরি দুইশো বলছিলাম, সে আড়াইশো চাইছে। শেষে আড়াইশোতেই নিলাম। দরকারের সময় মানুষের দাম বাড়ে। মালেরও বাড়ে।
দুপুরে একবার দুধ আনতে গিয়া দেখি দোকানি আগের দামে দিবে না। বলল, সাপ্লাই কম। আমি জানি তার ঘরে মাল আছে। তর্ক করি নাই। বিশ টাকা বেশি দিলাম, পরে চায়ের কাপ সাত টাকা করলাম। দুইজন জিজ্ঞেস করল দাম বাড়ল কেন। বললাম, দুধের দাম বাড়ছে। তারা দিল। আন্দোলনে মানুষ স্লোগানের হিসাব করে, দোকানি দুধের।
সারা দিনে কত কাপ গেছে ঠিক ধরতে পারি নাই। কাগজের কাপের বান্ডিল হিসাবে সাতশোর উপরে। কাচের কাপ ধোয়া চলছিল আলাদা। সন্ধ্যায় বউ ফোন দিয়া বলল বড় ছেলের স্কুলের বেতন দিতে হবে। ক্লাস সিক্সে উঠছে, নতুন গাইড চায়। আমি বললাম, গাইড কিনলে কি মাস্টার পড়ায় না? বউ রাগ করল। শেষে বললাম শনিবার টাকা দিব। ওই দিন লাভ হইছে, তবু কথা না কইরা টাকা দিলে সংসারে নিয়ম থাকে না।
রাত সাড়ে দশটার দিকে দোকানের সামনে একজন ফোনে খবর শুনল। প্রথমে সে চুপ। তারপর পাশে দাঁড়ানো লোককে বলল, রাজীবরে মাইরা ফেলছে। নামটা তখন আমার জানা ছিল না। কে রাজীব, জিজ্ঞেস করার আগেই দশজন জানল। কেউ ফোন করতেছে, কেউ ফোন ধরতে পারতেছে না। এক মিনিটে খবর দোকানের এই মাথা থিকা ওই মাথায় গেল।
ভিড়টা প্রথমবার একে অন্যের দিকে তাকাইল। এত দিন সবাই মঞ্চের দিকে তাকাইত, ফোনের দিকে তাকাইত, ক্যামেরার দিকে তাকাইত। ওই রাতে মানুষ পাশের মানুষের মুখ দেখল। একজন কাপ হাতে নিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, চা খায় নাই। আরেকজন কাঁদতেছে। একজন বলল দোকান বন্ধ করেন। আমি বললাম, কেন? সে উত্তর দিল না।
আমি দোকান বন্ধ করি নাই। গরম পানি লাগবে, চা লাগবে, সিগারেট লাগবে। দুঃখেও মানুষ খায়। বরং রাত বাড়ল। পুলিশও চা নিল। দুইজন টাকা দিল না; ইউনিফর্মের লোকের কাছে দাম চাইলে পরে ঝামেলা হতে পারে। খাতায় লিখলাম ‘পুলিশ—১২’। নাম জানি না। এই টাকা কোনো দিন উঠবে না জানি, তবু লিখলাম। না লিখলে হিসাব মিলে না।
খবর ছড়ানোর পর বাচ্চু কাজ থামাইয়া দাঁড়াইছিল। আমি ধমক দিলাম, ‘কাপ ধো।’ সে বলল, ‘মানুষ মাইরা ফেলছে।’ যেন কাপ ধুইলে মানুষটার অপমান হবে। আমি বললাম, ‘কাপ না ধুইলে কাল চা কীসে দিবি?’ সে চুপচাপ কাজে ফিরল। পরে বুঝলাম তার বয়স সতেরো; মৃত্যু আর পরদিনের কাপ একসঙ্গে ধরার বয়স হয়তো এখনও হয় নাই। আমার হইছে। দোকানদার হইলে হয়।
একজন তরুণ কাউন্টারে মোবাইল রাখল। স্ক্রিনে মৃত মানুষের ছবি। দেখতে চাই নাই, তবু চোখ পড়ল। মুখের পাশে রক্ত। সে বলল, ‘দেখেন।’ আমি বললাম, ‘সরান।’ সে রাগ করল, ‘আপনাদের কিছু যায় আসে না?’ আমি বললাম, ‘আমার দোকানে মানুষ চা খায়, এই ছবি রাখলে খাইতে পারবে?’ কথাটা ব্যবসার ছিল। সে ফোন তুলে নিল, কিন্তু যাওয়ার সময় বলল, ‘এই জন্যই দেশ এমন।’ দেশ কেমন, তার দায় আমার চায়ের দোকানে দিয়া গেল।
লোকটা যাওয়ার পর ছবিটা চোখে থাকল। গরম কেটলি তুলতে গিয়ে হাত পুড়াইলাম। বাচ্চু বলল পানি ঢালেন। আমি তারে ধমক দিলাম, নিজের হাত নিজে জানি। আসলে রাগ ছিল ওই ছেলের উপর, ছবির উপর, নিজের চোখের উপর। দোকানদার সব দেখে গেলে দোকান চালাইতে পারে না। কিছু জিনিস না দেখার নিয়ম বানাইতে হয়। নিয়ম ভাঙলে হাত কাঁপে।
রাত এগারোটার দিকে একদল তরুণ চুপচাপ বসেছিল। কেউ চা চাইল না। আমি নিজে পাঁচ কাপ বানাইয়া দিলাম। একজন বলল টাকা পরে। বললাম লাগব না। তারপরই মনে হলো কেন লাগবে না? মৃত মানুষটা কি আমার চায়ের দাম দিছে? কিন্তু মুখে আর কথা ফেরত নেওয়া যায় না। পাঁচ কাপ খরচ খাতায় লিখলাম ‘নিজ’। দান লিখি নাই; দান করলে মানুষের নাম লাগে, হিসাবেরও।
একজন খদ্দের বলল দোকানের সামনে কালো কাপড় টাঙাতে। আমি বললাম টাঙাইলে নাম ঢাকা পড়বে। সে বলল এক দিনের জন্য। রাজি হইলাম না। রাতে ঝাঁপ নামানোর পরে দেখলাম বাচ্চু ছোট কালো ফিতা হাতলে বেঁধেছে। খুলে ফেলতে গিয়েও রাখলাম। দোকানের নাম ঢাকা পড়ে নাই। সবকিছুরই জায়গা মাপমতো হলে চলে।
সকালে বাজারে গেলে দুধওয়ালা খবর জিজ্ঞেস করল। সে শাহবাগে যায় নাই, তবু সব জানে। বলল আজ মাল বেশি লাগবে। আমার আগে সে হিসাব করছে। আমরা দুজন মানুষটার মৃত্যুর উপর কত দুধ বিক্রি হবে ভাবছি—এইটা মুখে বললে খারাপ শোনায়। না বললেও অঙ্কটা সত্য। সত্য সব সময় ভালো মানুষ বানায় না।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মালের হিসাব ভাঙল। যে ক্যান দুধ সকালে এক দিন যাওয়ার কথা, সন্ধ্যায় শেষ। পাশের দোকান থেকে চিনি ধার নিলাম তিন কেজি। ধার লিখে রাখলাম সিগারেটের খালি কার্টনের গায়ে; খাতায় জায়গা নাই। রুবেল ভুল করে তিন কাপের টাকা নিজের পকেটে রেখেছিল। ধরার পর বলল খেয়াল করেনি। আমি তার মজুরি থেকে আঠারো টাকা কাটলাম। এই রাতেও চুরি চুরি, হিসাব হিসাব। মৃত্যু মানুষের স্বভাব বদলায় না।
এক সময় কয়েকজন এসে দোকানের আলো কমাতে বলল। তারা মোমবাতি জ্বালাবে। আমি বললাম আলো কমালে চিনি আর লবণ আলাদা করব কীভাবে। শেষ পর্যন্ত সামনের একটা বাতি বন্ধ করলাম, ভেতরেরটা রাখলাম। বাইরে মোমবাতির রেখা তৈরি হলো। আমার দোকানের অর্ধেক অন্ধকার, অর্ধেক আলো। লোকজন ছবি তুলল। ছবিতে হয়তো দোকানের নামও গেছে, ভাবলাম। পরে নিজের এই ভাবনায় লজ্জা হয় নাই; ব্যবসার লোক বিজ্ঞাপন দেখবেই।
বউ আবার ফোন করেছিল। আমি ধরতেই পেছনের শব্দ শুনে বলল, ‘এখনও দোকানে?’
‘লোক আছে।’
‘খবর শুনছ?’
‘শুনছি।’
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি আইসো।’ সাধারণত সে বলে বাজার আনো, টাকা দিও, ছেলের খাতা। ওই রাতে শুধু ফিরতে বলল। তখন প্রথম মনে হলো ঘটনা দোকানের বাইরে না; মিরপুরের ঘরেও পৌঁছেছে।
বড় ছেলে ফোন নিয়ে জিজ্ঞেস করল কাল স্কুলে কালো ব্যাজ পরতে হবে কি না। আমি জানতাম না। বললাম মাস্টার যা বলে। সে বলল, ‘তুমি জানো না?’ ছেলেদের কাছে বাবার সব জানার কথা। আমি বললাম, ‘দোকানে আছি, খবরের অফিসে না।’ সে ফোন মাকে দিল। পরে মনে হয়েছিল একটু ভালো করে বলা যেত। কিন্তু সামনে বারো কাপের অর্ডার ছিল।
জানাজার দিন সকালে বাচ্চু স্বেচ্ছায় আগে এসেছে। গত রাতের অর্ধেক মজুরি কাটার কথা আমি তুলিনি। সে কালো কাপড়ের ছোট টুকরা জামায় লাগিয়েছে। রুবেলও লাগাতে চাইল। সেফটিপিন ছিল না; দোকানের হিসাবের কাগজ আটকানোর ক্লিপ দিয়ে লাগাল। কাজ করতে গিয়ে বারবার খুলে পড়ছিল। আমি বললাম, খুলে রাখ। সে রাখেনি। কাপ ধোয়ার সময় কাপড় ভিজে বুকে লেগে ছিল।
সকাল বাড়ার আগেই দুধ শেষ হইতে বসছে। পাইকারকে ফোন দিলে বলল রাস্তা আটকানো, ভ্যান ঢুকবে না। আমি বাচ্চুরে পায়ে পাঠাইলাম হাতিরপুলের দিকে। সে বলল এই ভিড়ে যাবে কেমনে। বললাম, দুধ ছাড়া চা বানাব কেমনে। সে গেল। ফিরতে এক ঘণ্টা লাগল, দামও বেশি। ক্যান হাতে ভিড় ঠেইলা আসতে গিয়ে অর্ধেক ছলকাইছে। প্রথমে অর্ধেকের দাম তার মজুরি থিকা কাটার কথা মাথায় আসছিল। তারপর কালো কাপড়টা দেখে বলি নাই। মানুষ শোক করলে দুধের হিসাব ভুলে যাই না; শুধু কখন বলব, সেইটা পিছায়।
এক বুড়ি দোকানের কোণায় বসে ছিলেন। চা চান নাই, পানি চাইলেন। গ্লাস দিছি। তিনি দুই চুমুক খেয়ে বাকি পানি হাতে ঢেলে মুখ মুছলেন। বললেন ছেলেকে খুঁজতেছেন। ছেলের বয়স জিজ্ঞেস করলে বললেন পঁয়ত্রিশ। আমি ভেবেছিলাম হারানো বাচ্চা। বড় মানুষও মায়ের কাছে ভিড়ে হারায়। বাচ্চুকে বললাম পাশের মাইকে খবর দিতে। বুড়ি বললেন লাগবে না, ফোন পেয়েছেন। তবু আরও দশ মিনিট বসে ছিলেন। আমি চেয়ার চাই নাই; খদ্দের দাঁড়াইছিল। কাউরে উঠতেও বলি নাই। দোকানের একটা চেয়ার সেদিন টাকার বাইরে ছিল।
দুপুরের দিকে কাপে কাপে লিপস্টিক, ধুলো, চায়ের দাগ জমতেছিল। ধোয়ার পানি কালো। রুবেল ভুল করে একজনের ব্যবহৃত কাপ আরেকজনরে দিয়ে ফেলল। লোকটা চিৎকার করল। আমি নতুন কাপ দিয়া ক্ষমা চাইলাম। এত মানুষের শোকেও পরিষ্কার কাপ লাগে, ঠিক খুচরা লাগে, গরম চা লাগে। বড় ঘটনা ছোট প্রয়োজন বাতিল করে না। বরং মানুষ বেশি জোরে ছোট জিনিস চায়, কারণ ওইগুলা হাতে ধরা যায়।
বিকালে দোকানের টিনে একটি কাগজ লাগানো হলো—মৃত ছেলেটির মুখ। লাগানো ছেলেদের একজন আমার কাছ থেকে আঠা চাইল। আঠা ছিল না; ময়দা আর পানি মিশিয়ে দিলাম। তারা টাকা দিতে গেলে নিই নাই। পরে কাগজের কোণা খুলে বাতাসে উড়ছিল। নিজে উঠে চেপে দিয়েছি। এই কাজের দাম খাতায় ধরার জায়গা ছিল না।
মরদেহ আনার আগে ভিড়ের চাপ সামলাতে আমরা দোকানের সামনে দড়ি টানলাম। মানুষ বলল পথ ছাড়েন, আবার চা চাইল। এক নারী দুই কাপ নিয়ে টাকা দিতে গিয়ে কাঁদছিলেন। আমি তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি। পরে ভাবলাম নেওয়া ঠিক হয়েছে কি না। না নিলে কি তার শোক বড় হতো? ছয় টাকা নিলে ছোট? উত্তর পাই নাই। ক্যাশবাক্সে সব টাকা একই রকম ভাঁজ হয়ে থাকে।
রাত একটার দিকে ঝাঁপ নামাই। বাচ্চু বলল, কাল জানাজা হবে। সকালে তাড়াতাড়ি খুলতে বললাম। সে চোখ লাল কইরা তাকাল, ঘুমে না কান্নায় বুঝি নাই।
পরদিন মানুষ আরও বেশি। মরদেহ যখন আনা হইল, দোকান থেকে দেখা যায় নাই। শব্দ শুনছি। চায়ের লাইন তখনও। একজন কাপ নিয়া বলল, পরে টাকা দেবে। তার নাম জিজ্ঞেস করলে রাগ কইরা বলল, এই সময়েও টাকা? আমি বললাম, সময় যাই হোক, চিনি নগদে কিনি। সে টাকা ছুড়ে দিল। আমি তুললাম। রাগ আমারও হইছিল, কিন্তু ছয় টাকা মাটিতে রাখা যায় না।
রাতে হিসাব বসে হাত ব্যথা। জীবনের সবচেয়ে বেশি বিক্রি। সংখ্যাটা লিখলাম। লাভের অঙ্কও। খুশি হওয়ার কথা। দোকান যখন ২০০৩-এ কিস্তিতে নিছি, এমন দিন চাইছি—বিক্রি থামবে না, লোক লাইনে থাকবে। ওই দিন আসছে। কিন্তু খাতায় সংখ্যাটা লেখার পরে হাত থাইমা গেল। অনেকক্ষণ তাকাইয়া থাকলাম। তারপর খাতা বন্ধ করলাম।