FF.
অধ্যায় ৬ · তিন মিনিট Book page

Chapter 6

অধ্যায় ৬ · তিন মিনিট

Oct 18, 2026 7 min read

অনন্যা · ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

চারটার আগে থেকেই সবাই বলছিল, তিন মিনিট। ফোনে মেসেজ, মাইকে ঘোষণা, পাশে বসা অচেনা লোকও মনে করিয়ে দিচ্ছিল—ঠিক চারটায় দাঁড়াবেন। আমি তখন পানির বোতল নিয়ে মঞ্চের পেছন দিক থেকে ফিরছিলাম। পলিথিনে আর ছয়টা ছিল। ভিড়ের মাঝখানে আটকে গেলাম। সামনে যাওয়া যায় না, পেছনেও না।

চারটা বাজল কি না ঘড়ি দেখে বুঝিনি। শব্দ হঠাৎ থেমে গেল। একটু আগেও এত আওয়াজ ছিল যে নিজের কথা শুনতে কানে হাত দিতে হচ্ছিল; তারপর এমন চুপ যে দূরের গাড়ির হর্ন আলাদা শোনা গেল। আমার হাতে বোতল, ডান কাঁধে ব্যাগ, চুল মুখে লেগে আছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং নড়তে পারছি না। নড়তে নিষেধ কেউ করেনি। তবু মনে হচ্ছিল আঙুল সরালেও সবাই শুনে ফেলবে।

আমার সামনে একটা শিশু বাবার কাঁধে বসেছিল। সে প্রথমে চারপাশ দেখে, তারপর বাবার কান ধরে কিছু বলতে গেল। বাবা আঙুল ঠোঁটে দিলেন। শিশুটি চুপ করল। বাঁ পাশে পুলিশের সারি। তাদের একজনের চোখ সোজা সামনে, কিন্তু পলক পড়ছিল। একটি পতাকা বাতাস না থাকায় ঝুলে ছিল। তিন মিনিটের ভেতর এইসব জিনিস কেন এত স্পষ্ট হয়েছিল জানি না।

সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বাবা বলেছিলেন, ‘আজ শহর বন্ধ করবে নাকি?’ আমি বলেছিলাম, ‘তিন মিনিট শুধু।’ তিনি সংবাদপত্র নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। ‘তিন মিনিটে কী হয়?’ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিইনি। তখন আমার কাছেও ছিল না। মা ব্যাগে একটি আপেল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। পানি দিতে যাব শুনে বললেন, নিজের পানি যেন খাই। মায়েরা সব আন্দোলনের মাঝেও সন্তানের প্রস্রাব, খাবার আর ফেরার সময় নিয়ে ভাবে। আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। এখন শিশুটির বাবা ঠোঁটে আঙুল রাখলে মায়ের আপেলটার কথা মনে পড়ল। ব্যাগে চাপ খেয়ে নরম হয়ে আছে।

নীরবতার আগে আমাদের পানির দলে বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। কার্টন কোথায় রাখা হবে তা নিয়ে দুইজন তর্ক করছিল। একজন বলছিল মঞ্চের পেছনে, আরেকজন সামনে। আমি পাঁচবার জিজ্ঞেস করেও সিদ্ধান্ত পাইনি। শেষে নিজের মতো করে অর্ধেক বোতল একদিকে, অর্ধেক আরেকদিকে দিয়েছিলাম। কেউ আমাকে থামায়নি। কাজের মধ্যে তখনও প্রথম দিনের স্বাধীনতা ছিল, তবে সঙ্গে দায়িত্বের ভয়ও এসেছে—ভুল জায়গায় দিলে যে মানুষটি পানি পাবে না, তার মুখ আমি দেখব না। অদেখা ভুলের কোনো সাক্ষী থাকে না।

চারটার দশ মিনিট আগে মাইকে সবাইকে প্রস্তুত হতে বলা হলো। কিছু মানুষ বসা থেকে উঠল, কেউ রাস্তায় জায়গা করে নিল। দোকানিরা হাত থামাল। পাশের ভবনের জানালায় মুখ। আমি মিথিলাকে খুঁজছিলাম। সে মঞ্চের অন্য পাশে। ফোনে লিখল, ‘যেখানে আছ থাক।’ এই বাক্য তখন আদেশের মতো ভালো লাগল। আমার কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।

ঘড়ির কাঁটা দেখার জন্য ফোন বের করেছিলাম, নেটওয়ার্কে সময় এক মিনিট পিছিয়ে না এগিয়ে—কেউ বলল। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা নিজের ঘড়ি মিলিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ মনে হলো এক শহরের সব ঘড়ি কি একসঙ্গে ঠিক হতে পারে? যার ঘড়ি ভুল, তার নীরবতা কি কম হবে? তারপর ঘোষণার গলা এলো, আর প্রশ্নগুলো থেমে গেল।

চুপের মধ্যে নিজের শরীরের শব্দ প্রথম শুনলাম। শ্বাস, গলা শুকানোর ঘর্ষণ, কবজিতে নাড়ি। আমার ডান পায়ের নিচে কাগজের কাপ চাপা ছিল; ওজন সরালে খসখস করবে বলে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েক সেকেন্ড পর পেশি টনটন করছিল। আমি ভেবেছিলাম দেশ নিয়ে ভাবা মানে বিশাল কোনো কথা। অথচ তখন দেশ মানে একটি কাপের উপর পা রেখে শব্দ না করা।

এক মিনিট পার হয়েছে কি না বোঝা যায়নি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তিন মিনিট তুচ্ছ—একটি বিজ্ঞাপন বিরতি, লিফটের অপেক্ষা। সেখানে তিন মিনিট এত বড় হলো যে তার মধ্যে বাবা, মা, স্কুলের পতাকা, বইয়ের মুখস্থ অনুচ্ছেদ, শিশুটির হাত—সব ঢুকে গেল। আমি কোনো শহিদের মুখ কল্পনা করতে পারিনি। বরং দাদুর আলমারিতে রাখা সাদা-কালো ছবির কথা এল, যেখানে আমি কাউকে চিনি না। স্মৃতি না থাকলেও মানুষ কি উত্তরাধিকার পায়? প্রশ্নটির ভাষা তখন এমন গোছানো ছিল না। বুকের মধ্যে শুধু ভার হয়েছিল।

নীরবতার দ্বিতীয় মিনিটে—পরে ধরে নিয়েছি দ্বিতীয়—মায়ের মুখ মনে পড়ল। তিনি এখন বাসায় হয়তো ডাল বসিয়েছেন। বাবা অফিসে। তাদের কেউ আমার এই মুহূর্ত জানে না। বাড়ি ফিরে বোঝাতে গেলে শব্দ লাগবে, অথচ এই অভিজ্ঞতা শব্দ না থাকার। আমি কি বলব, ‘সবাই চুপ ছিল’? বাবা হয়তো আবার জিজ্ঞেস করবেন তাতে কী হলো। উত্তর তখনও জানি না, তবু প্রশ্নটি আর আগের মতো নেই।

আমার বাঁ হাতের পলিথিন ধীরে ধীরে নিচে নামছিল। আঙুলের শক্তি কমে গেছে। একজন অচেনা হাত নিচ থেকে বোঝা ঠেকিয়ে দিল। আমরা একে অন্যের দিকে তাকাইনি। তিন মিনিট শেষে হাতটি সরে গেল। সে কে জানি না। তার সাহায্য ছাড়া বোতল পড়ে যেত। ইতিহাসের বড় ছবিতে এমন একটি হাত থাকবে না, কিন্তু আমার তিন মিনিট তার চাপ ছাড়া অসম্পূর্ণ।

মনে হলো যারা এখানে নেই তাদের নীরবতা কে মাপবে? রিকশাওয়ালা যিনি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন, হাসপাতালে নার্স, রান্নাঘরে মা—তারা কি বাইরে? আমি প্রথমবার অংশ হওয়ার আনন্দ পেয়েছিলাম; এখন অংশের সীমা দেখে অস্বস্তি হলো। কোনো চত্বর পুরো দেশ নয়। তবু একটি চত্বর মানুষকে নিজের অবস্থান জিজ্ঞেস করতে পারে।

নীরবতার শেষ দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ দূর থেকে কাছে আসছিল। কেউ পথ ছাড়েনি, কারণ গাড়িটা অন্য রাস্তায়। তবু সাইরেনের শব্দ আমাদের ভেতর দিয়ে গেল। মনে হয়েছিল এই নীরবতারও বাইরে একটি শহর আছে—রোগী, বাজার, রান্না, পরীক্ষার প্রস্তুতি। তিন মিনিট শেষে আমরা সেই শহরেই ফিরব। ফিরে গিয়ে কী করব, সেটাই হয়তো আসল।

আমি ইতিহাসের ছাত্রী নই। পরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন এলে মুখস্থ পয়েন্ট লিখেছি। বাবা মার্চ এলে পতাকা টাঙান, মা ছাব্বিশে মার্চ খিচুড়ি রান্না করেন—দেশ বলতে আমার কাছে এমন কিছু অভ্যাস ছিল, পরিবারের নিয়মের মতো। আমি কখনো ভাবিনি আমি তার ভিতরে আছি। দেশ ছিল মানচিত্র, জাতীয় সংগীত, ক্রিকেট জিতলে চিৎকার। ওই তিন মিনিটে প্রথমবার মনে হলো, এই অস্বস্তি, এই ঘাম, আমার হাতের ছয়টা বোতল, সামনে শিশুটির নীরবতা—সব মিলিয়েও দেশ হয়। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেশকে দেখছি না। আমার পায়ের নিচের ধুলোও তার মধ্যে, আমিও।

এই বোঝাটা রাজনৈতিক ছিল না। কোন দল কী বলল, কোন ধারায় কী শাস্তি—এসব তখনও পুরো বুঝতাম না। বরং মনে হয়েছিল এত দিন একটি বাড়িতে থেকেছি অথচ জানতাম না সেটি আমার বাড়ি। ঊনিশ বছর বয়সে এই বোধের নাম আমি জানতাম না। পরে অনেক লেখা পড়েছি, বন্ধুদের কথা শুনেছি, কিন্তু ওই মুহূর্তের জন্য ঠিক শব্দ পাইনি।

মাঝখানে কারও ফোন বেজে উঠেছিল। মানুষটি সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল। কেউ বিরক্ত হয়ে তাকাল না। দূরে একটা কাক ডাকল। আমার হাত ব্যথা করছিল; পলিথিন নামাইনি। মনে হচ্ছিল তিন মিনিট শেষ হলে আমি আর আগের জায়গায় ফিরতে পারব না, যদিও জায়গাটা একই থাকবে।

আমার পাশের মেয়েটি চোখ বন্ধ করে ছিল। তার গালে রঙের পতাকা। চোখের কোণ দিয়ে পানি নামছিল কি না বুঝিনি। তাকে দেখে আমারও চোখ বন্ধ করতে ইচ্ছা হলো, করিনি। এত মানুষ চুপ—এই দৃশ্য না দেখলে পরে মনে থাকবে কীভাবে? আবার মনে হলো চোখ খোলা রাখলেই কি দেখা হয়? আমি চারপাশের মুখ দেখছি, তাদের ভিতরের কথা না। প্রত্যেকে নিজের তিন মিনিটে একা। একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একা থাকা সম্ভব, সেদিন শিখলাম।

রাস্তার পাশে যে পুলিশ সারি ছিল, তাদের একজন বারবার ভর বদলাচ্ছিল। বুটে নিশ্চয় ব্যথা। প্রথম দিকে পুলিশকে দৃশ্যের অংশ মনে হতো—ব্যারিকেডের মতো। ওই নীরবতায় মানুষটির অস্বস্তি চোখে পড়ল। আমি পানির বোতল দিতে চেয়েছিলাম। নড়তে পারিনি। নীরবতা শেষ হলে তাকে খুঁজিনি। আমাদের আবিষ্কারগুলোও তিন মিনিটের; শব্দ ফিরলে হারায়।

দূরের একটি ভবনের ছাদে কয়েকজন শ্রমিক দাঁড়িয়েছিল। তারা কাজ থামিয়ে নিচে দেখছিল। একজনের হাতে রড। তিনি কি আমাদের সঙ্গে নীরব ছিলেন, না শুধু দেখছিলেন? কারও উপস্থিতির উদ্দেশ্য বাইরে থেকে জানা যায় না। আমিও প্রথম দিন দেখতে এসেছিলাম, পরে কাজ করেছি। হয়তো দেখা দিয়েই অংশ নেওয়া শুরু হয়।

মনে পড়ল স্কুলে জাতীয় সংগীতের সময় আমি একবার বান্ধবীর সঙ্গে হাসছিলাম। শিক্ষিকা সারির সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তখন নীরব বা স্থির থাকার অর্থ ছিল শাস্তি এড়ানো। আজ কেউ দেখছে না আমি নড়ছি কি না; তবু নড়তে পারছি না। বাইরের নিয়ম ভেতরে ঢুকলে তার ওজন বদলে যায়।

শেষ কয়েক সেকেন্ডে অপেক্ষা অসহ্য হলো। সবাই কি একই মুহূর্তে জানবে শেষ? কেউ আগে চিৎকার করলে? নীরবতারও নেতৃত্ব লাগে। মাইকের মানুষটির শ্বাস শোনা গেল, তারপর শব্দ। এত দিন মাইককে কেবল আওয়াজের যন্ত্র ভাবতাম; সেদিন বুঝলাম কখন চুপ থাকবে সেটাও তার ক্ষমতা।

তারপর মাইক চালু হলো। প্রথমে ফিডব্যাকের তীক্ষ্ণ শব্দ, তারপর একটি গলা। সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান উঠল, ঢেউয়ের মতো কাছে এলো। আমার পাশের নারী দুই হাত তুললেন। পলিথিনের বোতল কারও হাতে দিয়ে দিলাম—কে নিল দেখিনি। দুই হাত মুঠো করলাম। গলা থেকে শব্দ বের হলো এবার, ধার করা নয়, নিজের।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.